সংবাদদাতা, কাটোয়া: হাতে কাটারি নিয়ে ঘোরাচ্ছেন দিলীপ ঘোষ। অগ্রদ্বীপে গোপীনাথের মেলায় এই দৃশ্য দেখে অনেকেই চমকে গেলেন। অনেকে নিরাপদ দূরত্বে সরেও গেলেন। মেলায় গিয়ে পছন্দ করে কাটারি কিনে তা নাচাতে নাচাতে দিলীপ বললেন, ‘এক কাটারিতে সব কাজ হয়ে যাবে, বুঝতে পারবেন।’ পদ্মনেতার এহেন মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। সামনেই রামনবমী। এর আগে রামনবমীতে বিজেপির নেতাকর্মীদের হাতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে দেখা গিয়েছে। তাই রামনবমীর আগে দিলীপ ঘোষের কাটারি কেনা ও পরবর্তী মন্তব্য যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ।
বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বরাবরই বিতর্কিত চরিত্র। কখনও লাঠি, কখনও গদা হাতে নিয়ে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন। কখনও নিজের এলাকায় গিয়ে মেজাজ হারিয়ে কটূকথা বলে সমালোচিত হয়েছেন। অগ্রদ্বীপে গোপীনাথের মেলায় এসেও নিজের চরিত্র হারালেন না দিলীপ। রামনবমীর আগে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মেলায় দিলীপ ঘোষ পুজো দিয়েই কিনে ফেললেন কাটারি। সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে মন্তব্য করলেন, ‘কাজে লাগবে’ বলে। দিলীপবাবুর মন্তব্যে তাঁর দলের কর্মীরা উৎসাহিত হয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে ধ্বনি দিতে থাকেন। কাটারি গৃহস্থালীর সামগ্রী হলেও অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মেলায় দেড়শ টাকা দিয়ে সেই কাটারি কিনে দিলীপের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ফের রাজ্য রাজনীতিতে তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে ফেলেছে। পূর্ব বর্ধমান জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা কাটোয়ার বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, উনি বরাবরই উস্কানিমূলক মন্তব্যে করে থাকেন। এটা বাংলার মানুষ এখন বুঝে গিয়েছেন। বিজেপি মানেই যে মারদাঙ্গাতে উস্কানি দেওয়া তা সবাই বুঝতে পারছেন। কেউ বিজেপির চক্রান্তে পা দেবেন না।
এদিন থেকে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যশালী গোপীনাথ মেলা। মেলায় এবার লক্ষাধিক ভক্তের ভিড় হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে অসংখ্য সিসি ক্যামেরায় নজরদারি চালাচ্ছে পুলিস প্রশাসন। ভাগীরথী ফেরিঘাটেও পর্যাপ্ত নৌকো ও ভেসেল রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিন দুপুর নাগাদ অগ্রদ্বীপে আসেন দিলীপ। প্রথম যান বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য কৃষ্ণ ঘোষের বাড়িতে। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে গোপীনাথ মন্দিরে এসে পুজো দেন। মেলায় দলীয় শিবিরে কিছুক্ষণ বসে কর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগ সারেন। তারপর ফের কৃষ্ণ ঘোষের বাড়িতে ফিরে যান। যাওয়ার সময়ে মেলার একটি দোকানের সামনে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়েন। ওই দোকানে লোহার কাটারি, রামদা, হাতা, খুন্তি, কুড়ুল এইসব গৃহস্থালির জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছিল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই দেখেশুনে একটি ধারালো কাটারি কিনে ফেলেন। কাটারি কেনার কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। কয়েকজন তৃণমূল নেতাকে বলতে শোনা যায়, দিলীপবাবু হয়তো মারদাঙ্গা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমরা ওদের প্ররোচনায় পা দেব না। কুকথায় দিলীপের জুড়ি মেলা ভার। যার জন্য রাজ্য বিজেপিকে বিড়ম্বনাতেও পড়তে হয়েছে বার বার। তারপরেও তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে বন্ধ হয়নি।।
কাটোয়ার অগ্রদ্বীপে গোপীনাথের মেলা ঐতিহাসিক। চৈত্রের কৃষ্ণা একাদশীতে এই মেলা হয়। জনশ্রুতি, ভগবান গোপীনাথ নিজের হাতে নাকি ভক্ত গোবিন্দ ঘোষের পিণ্ডদান করেন। বৈষ্ণব সাহিত্য মতে, গোবিন্দ ঘোষের মৃত ছেলের নাম গোপীনাথ। মহাপ্রভু চৈতন্যদেব তাঁর এই পরম ভক্তের শোক কাটাতে নিজের হাতে অগ্রদ্বীপে পাথরের কৃষ্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম দেন, গোপীনাথ। মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন গোবিন্দ দাস। শোনা যায় মহাপ্রভু অগ্রদ্বীপ ছাড়ার আগে গোবিন্দ দাসকে বলে যান, তাঁর মৃত্যুর পর পারলৌকিক কাজ করবেন ভগবান গোপীনাথই। সেই থেকে আজও অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ মেলায় ভক্তের শ্রাদ্ধবাসরের আয়োজন করেন স্বয়ং ভগবান। • কাটোয়ায় দিলীপ ঘোষ। -নিজস্ব চিত্র