নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ঠিক উৎসবের মরশুমের গোড়াতেই ইউপিআই লেনদেনে বিক্রেতা তথা ব্যবসায়ীদের উপর আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বণিকমহল। ক্ষুদ্র, মাঝারি ব্যবসায়ীদের এক্ষেত্রে সমস্যা সবথেকে বেশি হবে বলে মনে করছে বণিকসভাগুলি। ২ হাজার টাকার বেশি লেনদেনে ০.৪ শতাংশ এমডিআর যেহেতু ক্রেতা নয়, বিক্রেতাকে মেটাতে হবে— তাই নরেন্দ্র মোদির সাধের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ আবার নগদ লেনদেনের দিকেই মুখ ফেরাবে বলে বাণিজ্য সংগঠনগুলির আশঙ্কা। দুর্গাপুজো তো আছেই, লক্ষ্মীপুজো, দীপাবলি, ছটপুজো সব উৎসবের কেনাকাটায় প্রভাব পড়বে। ক্ষিপ্ত পেট্রল পাম্প ডিলাররাও। তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য ২ হাজারের বেশি লেনদেনে মেটাতে হবে ৫ টাকা। এরপরই বুধবার ইউপিআই পেমেন্ট বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ডিলারদের সংগঠন ফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া পেট্রলিয়াম ট্রেডার্স। সরব হয়েছেন রাহুল গান্ধীও। এক্স হ্যান্ডলে ভিডিয়ো পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘মোদিজি, ইউপিআই ট্যাক্স প্রত্যাহার করুন এখনই।’ এ নিয়ে আমেরিকার চাপের সামনে মোদি সরকার নতজানু হয়েছে বলেও কটাক্ষ তাঁর। যদিও সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্র।
২০১৬ সালে আচমকা নোটবাতিল করে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রতি ভারতবাসীকে উৎসাহ দিয়েছিল মোদি সরকার। সেবছর ইউপিআই লেনদেন হয়েছিল ৭ কোটি টাকার। আর ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে তা পৌঁছেছে ৩১৪ লক্ষ কোটিতে। রাস্তায় ফলবিক্রেতা থেকে মাসকাবারি মুদিবাজার, সর্বত্র ইউপিআই এখন চ্যাম্পিয়ন। আর ঠিক সেখানেই সবথেকে বেশি আঘাত আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। রিটেলার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া বলেছে, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) আগে থেকেই চলছে সামান্য লাভের মার্জিনে। এই নতুন নিয়মের জেরে ক্রয়-বিক্রয়ের মার্জিন আরও কমবে। তাই তারা আরও বেশি নগদ লেনদেনে যাবে। একই কথা প্রযোজ্য বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিক্রেতার ক্ষেত্রেও। তারা যদি এরপর ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অস্বীকার করে, আমাদের কিছু করার নেই।’ ক্লোদিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন, হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশন, ট্রেডিং ফেডারেশন সকল সংগঠনই একই শঙ্কা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই সংগঠনগুলির বক্তব্য, ব্যবসা-মন্দার বাজারে সরকারের থেকে আরও বেশি সুযোগ সুবিধার আশা করছিলাম, উলটে নতুন বোঝা চাপছে। এমনকি বণিকসভাগুলিরও সাবধানবাণী, এর প্রভাব কিন্তু সরকারের জিএসটি সংগ্রহেও পড়বে। কারণ, ডিজিটাল পেমেন্ট যেভাবে সহজে জিএসটি ইনভয়েস এবং জিএসটি প্রদানের ব্যবস্থা করেছিল, সেই ব্যবস্থা ব্যাহত হবে। মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আবার প্রতিটি দোকানে ক্যাশ কাউন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কর্মীও নিতে হবে নতুন করে। পেট্রল ডিলারদের আবার বক্তব্য, তাঁরা তেল সংস্থাগুলির থেকে নির্দিষ্ট দামে তেল কেনেন এবং বেঁধে দেওয়া দরে বিক্রি করেন। বিনিময়ে কমিশন পান। ডিলারশিপ চালানোর খরচের হিসাব পেশ করলে, সেই টাকা মিটিয়ে দেয় সংস্থাগুলি। যদি অনলাইন পেমেন্টে এমডিআর বাবদ বাড়তি খরচ করতে হয়, তা কে মেটাবে? তেল সংস্থাগুলি? যদি না মেটায়, তাহলে তাঁরা অনলাইন পেমেন্ট নেবেন না।
কিন্তু সরকার হঠাৎ এমন পদক্ষেপ নিল কেন? ন্যাশনাল পেমেন্ট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বলেছে, যেভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট বিপুল বেড়েছে, সেই পরিকাঠামোকে সুস্থিতি দিতে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হয়। সার্ভার রক্ষণ, টেকনিক্যাল সাপোর্ট, সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি খাতে ব্যাংকগুলির প্রচুর ব্যয় হয়। সেই ক্ষতি পূরণ করতে খুবই সামান্য এমডিআর বলবৎ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মহল এই যুক্তি মানছে না। তাহলে কি আবার নগদ হাতে রাখার তাগিদ বাড়তে চলেছে? নগদের চাহিদা বৃদ্ধি মানেই, রিজার্ভ ব্যাংককে আরও বেশি টাকা বাজারে আনতে হবে। সুতরাং ১০ বছর পর ফের শিকড়ে ফেরা!