Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিপন্নকে সাহস জোগাবে

বিপন্নকে সাহস জোগাবে
  • ১২ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

২৫ ফেব্রুয়ারি একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট এইরকম: প্রায় ১ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকার ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ জালিয়াতিতে জড়িত অভিযোগে সাইবারাবাদ সাইবার ক্রাইম পুলিস তামিলনাড়ুর নামাক্কাল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হায়দরাবাদের এক অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার এই জালিয়াতির শিকার। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এক প্রতারক তাঁকে ফোনে বলে, ‘আপনার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের হয়েছে!’ এরপর মুম্বই সাইবার ক্রাইম অফিসারের ছদ্মবেশধারী আর এক জালিয়াতকে যুক্ত করা হয় হোয়াটসঅ্যাপে। চলে মানসিক চাপসৃষ্টি এবং হুমকি। আধার তথ্য শেয়ার করতেও বাধ্য করা হয় ওই ইঞ্জিনিয়ারকে এবং তাঁকে ‘আর্থিক অপরাধী’ সাব্যস্ত করে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বস্তুত সাফ করে দেওয়া হয়। বিশদ তদন্তে প্রকাশ, ওই জালিয়াতির পুরো টাকাটা দুষ্কৃতীরা পরে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেয়। যেমন গোকুল মারুথাচালা মূর্তি নামে একজনের একটি অ্যাকাউন্টে ৯ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা জমা হয়। পরে রাহুল নামে তার এক স্যাঙাত ওই টাকা তুলে নেয়। গোকুলের পাসবই, এটিএম কার্ড ও স্বাক্ষরিত চেক জাফর এবং শারুখ নামে দু’জনকে দেওয়া ছিল। পরে তারাই সেগুলি পৌঁছে দেয় রাহুলের কাছে। আইন প্রয়োগকারী বিভাগের কর্মকর্তার ভুয়ো পরিচয়ে তারা একত্রে একটি বড় নেটওয়ার্ক চালাত। তার জন্য তাদের হাতিয়ার ছিল হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রাম গ্রুপ। এই ধরনের জালিয়াতি অবশ্য প্রথম নয়। প্রায় প্রতিদিনই হয়ে চলেছে দেশের নানা প্রান্তে। তাই পুলিস সতর্ক করে চলেছে নানাভাবে। যাবতীয় অজানা ফোন থেকে হুমকির ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে তারা। জোর দিয়ে আরও বলেছে যে, বৈধ কর্তৃপক্ষ কখনোই ফোনে টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য দাবি করবে না। যেকোনও আইনি হুমকি সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই যাচাই করা সম্ভব। ১৯৩০ নম্বরে ফোন করে অথবা www.cybercrime.gov.in ওয়েবসাইটে গিয়েই যাচাই কিংবা রিপোর্ট করা যাবে। সরকার তার জন্য লাগাতার উৎসাহ দিচ্ছে।

Advertisement

কিন্তু তাও সবার চেতনা যে হচ্ছে না, তার প্রমাণ মিলেছে মঙ্গলবার প্রকাশিত খবরেও। কখনও সিবিআই অফিসার, আবার কখনও মুম্বই পুলিসের ক্রাইম ব্রাঞ্চের শীর্ষ কর্তা পরিচয়ে প্রতারকদের ফোন পেয়েছিলেন সরশুনার বাসিন্দা এক ব্যবসায়ী যুবক। বলা হয় তাঁর পার্সেল এসেছে এবং তাতে রয়েছে মাদক! ওইসঙ্গে বেশকিছু বেআইনি আর্থিক লেনদেনও হয়েছে তাঁর নামে। একাধিক অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত নথি। এজন্য তাঁকে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। ভীত কম্পিত গলায় ওই যুবক বলতে থাকেন, ‘কীভাবে এটা হল বুঝতে পারছি না!’ আর নথি কীভাবে বাইরে গেল, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। ঘাবড়ে গিয়ে ওই যুবক জানতে চান, ‘এজন্য কী করতে হবে?’ তাঁর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিবিআই অফিসার পরিচয় দিয়েও একজন ফোন করে। সে জানায়, মুম্বই পুলিসের পাশাপাশি সিবিআইও তদন্ত শুরু করেছে। তাঁকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করা হল! ভয় পেয়ে টানা তিনদিন তিনি স্বেচ্ছাবন্দিও ছিলেন নিজের বাড়িতে। এমনকী নকল ঝামেলা এড়াতে মোট ৭০ লক্ষ টাকা মিটিয়েছেন তিনি। তার মধ্যে ৪০ লক্ষ টাকা ঋণ পর্যন্ত করেছেন ওই যুবক! বিপুল অঙ্কের ধারদেনা করে প্রতারকদের দাবি মেটানোর নজির কলকাতায় সম্ভবত এই প্রথম।
আর এরই মধ্যে মিলেছে একটি স্বস্তির খবরও, বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানা ৩০ জন প্রতারিত ব্যক্তিকে ২ কোটি টাকা ফেরাতে সক্ষম হয়েছে। ট্রেনের টিকিট ক্যানসেল করার জন্য গুগল ঘেঁটে নম্বর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতারকদের ফাঁদে পড়েছিলেন কেউ। ভুয়ো ফোন কলের ট্র্যাপে পড়ে ব্যাঙ্কের কেওয়াইসি আপডেট করতে গিয়েছিলেন কেউ কেউ। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চাকরি করার আশায় কেউ-বা যোগাযোগ করেছিলেন টেলিগ্রাম গ্রুপে। তাঁরা সকলেই প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে খুইয়েছিলেন কয়েক লক্ষ টাকা। তবে সময়মতো পুলিসের দ্বারস্থ হয়ে পেয়েছেন সুরাহাও। ৩০ জন প্রতারিত ব্যক্তিকে সোমবার মোট ২ কোটি টাকা ফেরাবার ব্যবস্থা করেছে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানা। এই প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত বিপন্ন ব্যক্তিদের বিশেষ সাহস জোগাবে। প্রতারিতদের বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। তবে কিছু তরুণ-তরুণীও রয়েছেন এই দলে! সব মিলিয়ে এটা পরিষ্কার যে প্রযুক্তির অস্পষ্টতার ভিতরে প্রতারণার ফাঁদ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করারও সুযোগ। তার জন্য গ্রাহকের সচেতনতা হল সবচেয়ে বড় শক্তি। অযথা প্রলোভন এড়াতে হবে। আর অজানা ব্যক্তির ছলনা এবং হুমকিও অগ্রাহ্য করা দরকার মনের জোরে। তারপরও বিপদ ঘটে গেলে তা দ্রুত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের গোচরে আনতে হবে। এ নিয়ে বিপন্ন ব্যক্তির ‘একান্ত গবেষণায়’ কোনও কাজ হবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ