সৌমিত্র দাস, রামনগর: কাঁথির শৌলা ব্রিজ থেকে শুরু হয়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী ঝাঁ-চকচকে মেরিনড্রাইভ রাস্তা মন্দারমণি, তাজপুর হয়ে সোজা সৈকতশহর দীঘা চলে গিয়েছে। রাস্তার পাশে পথবাতির আলো। সর্বত্রই উন্নয়নের ছোঁয়া। এভাবেই গত কয়েকবছরে আমূল বদলে গিয়েছে রামনগর বিধানসভার হাল-হকিকত। মূলত পর্যটন এবং সমুদ্রে মৎস্য-আহরণ নির্ভর এই এলাকায় পান ও ধানচাষও প্রচুর হয়। উন্নয়নের ডালি সামনে রেখেই রামনগর ফের দখলে রাখতে চায় তৃণমূল। সেইমতোই চলছে প্রচার। মন্দারমণি সংলগ্ন কালিন্দী পঞ্চায়েতের অরকবনিয়া মৌজা। সমুদ্রে মৎস্যশিকার এবং সব্জিচাষ করে বাসিন্দারা জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রামের বুক চিরে চলে গিয়েছে মেরিনড্রাইভ রাস্তা। বাঁশে বেঁধে ঘাসফুলের পতাকা টাঙাচ্ছিলেন শেখ সেলিম, শেখ রাজা সহ কয়েকজন। এবার কার পাল্লা ভারী জানতে চাইলে অদূরে থাকা পোস্টারে তৃণমূল সরকারের আমলে বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের তালিকার দিকে আঙুল দেখালেন তাঁরা। বললেন, বর্তমান আমলে স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথী, যুবশ্রী, কৃষকবন্ধু, পথশ্রীতে রাস্তা থেকে সবই পেয়েছি। তাই তৃণমূলই শেষ কথা। বিজেপি সরকার কিছুই করেনি। যখন মেরিনড্রাইভ রাস্তা আর ব্রিজ ছিল না তখন ২২কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে চাউলখোলা হয়ে মহকুমা শহর কাঁথিতে যেতে হত। এখন শৌলা হয়ে দ্রুত কাঁথি পৌঁছনো যায়। রাস্তা-ব্রিজ তৈরি হওয়ায় প্রচুর হোটেল-লজ, দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলে গিয়েছে।
২০১১সাল থেকেই ভোটে নেমে জিতে আসছেন অখিল গিরি। এবারও তিনি প্রার্থী। গত বিধানসভা নির্বাচনে ১২হাজার ৫১৭ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন অখিলবাবু। তবে ২০২৩সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি রামনগরে থাবা বসায় বিজেপি। রামনগর বিধানসভার পাঁচটি পঞ্চায়েত দখল করে বিজেপি। বেশকিছু পঞ্চায়েত সমিতির আসনও গেরুয়া শিবিরের দখলে আসে। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে রামনগরে সাড়ে ন’হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। এবার ভোটে রামনগর থেকে ভূমিপুত্র প্রার্থীর দাবি তোলে দলের একটি গোষ্ঠী। অখিলের বাড়ি আদতে কাঁথির মহিষাগোট এলাকায়। তাই ‘বহিরাগত’ নয়, ভূমিপুত্র কাউকে প্রার্থী করা হোক-সেই দাবি ছিল। বস্তুত, অখিল শিবিরের সঙ্গে জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তম বারিকের শিবিরের কোন্দল সর্বজনবিদিত। উত্তম শিবিরের নেতারা ভোটের আগে থেকেই রামনগরে ভূমিপুত্র প্রার্থীর দাবিতে সওয়াল করেছেন। তবে প্রার্থী ঘোষণার সময় দেখা যায়, রাজ্য নেতৃত্ব অখিলেই ভরসা রেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে দলের বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে মীমাংসায় বসেছেন অখিল। অখিলবাবু বলেন, ভুল বোঝাবুঝি থেকে মনোমালিন্য হয়েছিল। সমস্যা মিটিয়ে সবাই মিলে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছি।
অখিলের প্রচারে উঠে আসছে, জগন্নাথ মন্দির তৈরির কথা। দীঘা সহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের সামগ্রিক উন্নয়ন, রাজ্য সরকারের জনমুখী প্রকল্পগুলির কথা। তবে অপ্রাপ্তি, বঞ্চনার ছবিও রয়েছে। রামনগরের পানের দেশজোড়া খ্যাতি রয়েছে। পান মান্ডি তৈরি হলেও উপযুক্ত বিপণন ব্যবস্থা নেই। রামনগরে প্রস্তাবিত বাইপাস রাস্তা হয়নি। রামনগর পুরসভা হয়নি। তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়িত হয়নি। বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর মণ্ডল রামনগরের রাও হাইস্কুলের শিক্ষক। কাঁথি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন। চন্দ্রশেখর বলেন, রামনগরের জনগণ বুঝেছেন, ১৫বছরে রামনগরে প্রকৃত অর্থে কোনও উন্নয়ন হয়নি। তাই তাঁরা বিজেপিকে আঁকড়ে ধরেছেন। রামনগরবাসী এবার দীর্ঘদিনের জগদ্দল পাথর সরাবেন। সিপিএম প্রার্থী অশোককুমার মাইতি বলেন, তৃণমূল-বিজেপি দু’দলই সমান। কোথাও উন্নয়ন হয়নি। কেবল নেতাদের উন্নয়ন হয়েছে। আমরা প্রতিটি পরিবারের জন্য স্থায়ী কাজ, শূন্যপদ পূরণ, শিল্পের পুনরুদ্ধার, ফসলের ন্যায্য দাম প্রভৃতি ইস্যুতে প্রচার করছি।
দীঘায় তৃণমূলের প্রচার।-নিজস্ব চিত্র