Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একযাত্রায় পৃথক ফল

ভারত স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। কিন্তু প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতার গ্লানিমুক্তির আনন্দ বাঙালি পায়নি। কারণ ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতালাভের জন্য দেশভাগের শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল।

একযাত্রায় পৃথক ফল
  • ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারত স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। কিন্তু প্রায় দুশো বছরের পরাধীনতার গ্লানিমুক্তির আনন্দ বাঙালি পায়নি। কারণ ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতালাভের জন্য দেশভাগের শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। দেশভাগের বলি হয়েছিল দুটিমাত্র প্রদেশ—বাংলা এবং পাঞ্জাব। তবে দেশভাগের কারণে সর্বাধিক ক্ষতি হয়েছিল বাংলার, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির। লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্ববঙ্গের ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে হয়েছিল খুবই কম মানুষকে (মূলত কিছু মুসলিম ধর্মাবলম্বী)। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের উপর পূর্ণ আস্থা ছাড়েনি। অন্যদিকে, পাকিস্তান গর্বিত ছিল তার ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ পরিচয় নিয়ে। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, পাকিস্তানের দাবি আদায়ের জন্য পূর্ববঙ্গের বরিশালে এবং এপারে কলকাতায় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধিয়েছিল মুসলিম লিগের সমর্থক একদল দুষ্কৃতী। মহাত্মা গান্ধী হস্তক্ষেপ করেও সেই দাঙ্গা থামাতে পারেননি, বাংলাসহ দেশভাগ রুখতেও ব্যর্থ হন তিনি। 

Advertisement

দেশভাগের পর খণ্ডিত পাঞ্জাব এদেশে ‘পাঞ্জাব’ নামই গ্রহণ করে। অন্যদিকে, ভারতভুক্ত খণ্ডিত বাংলার নাম দেওয়া হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’। এপারের রাজ্যটি ‘বাংলা’ নাম পায়নি অনেকের দাবি সত্ত্বেও। বস্তুত দেশভাগের দগদগে স্মৃতি ও যন্ত্রণাই বয়ে বেড়াচ্ছে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি। আমরা জানি, দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ কিন্তু স্বনামে পরিচিত হয়নি, ওই ভূখণ্ড ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম নিয়েছিল পাকিস্তানের একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে। যদিও পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নার স্বপ্ন চুরমার হতে সিকি শতকও লাগেনি, তার আগেই ভাষা আন্দোলনের তীব্রতায় দু-টুকরো হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র হিসেবে। অর্থাৎ সরকারিভাবে ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে কোনো ভূখণ্ড এই জগতে আর নেই। ওই ভূখণ্ড বরং দুবার নাম পালটেছে। অথচ এপার বাংলার পরিচয় রয়ে গিয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামে। বাঙালিদের অনেকেই মনে করেন, এরাজ্যের এমন নাম রাখার আর কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে যখন ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে কিছু নেই, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামক একটি পরিচয় বয়ে বেড়ানো বাহুল্যই। এই নামের মধ্যে দুঃখ খেদ বিষাদ তিক্ততার স্মৃতিই বেশি। দুঃখসহ এত নেতি বয়ে বেড়াবার সার্থকতা কী? দুঃখবিলাসেরও কিছু উদ্দেশ্য থাকে কতিপয় মানুষের মধ্যে, এখানে সেটাও অনুপস্থিত। তবুও কেন পশ্চিমবঙ্গ নামটি বয়ে বেড়ানো? যথেষ্ট অযৌক্তিক নয় কি? এই সূত্রেই রাজ্যের নাম পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা অনেকদিনের। বিকল্প নাম নিয়ে নানা সময়ে সাধারণ মানুষ থেকে বিদ্বজ্জন ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ প্রভৃতির মতামত নেওয়া হয়েছে। এই ব্যাপারে নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বেশিরভাগ ভোট পড়ে ‘বাংলা’ নামের পক্ষে। তার ভিত্তিতে রাজ্যের নাম বদলের জন্য নবান্ন থেকে নিয়মমাফিক দাবি পেশ করা হয়েছে কেন্দ্রের কাছে। গত ১৫ বছরে দিল্লিতে প্রস্তাব গিয়েছে মোট তিনবার। আটবছর আগে রাজ্য বিধানসভাতেও সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবু ‘বাংলা’ নামটিকে মোদি সরকার এখনো অনুমোদন করেনি। তা বিশ বাঁও জলেই বলা যায়। 
শুধু বিষাদের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো নয়, বাস্তব একাধিক অসুবিধার কথাও দিল্লির কাছে তুলে ধরেন বাংলার জননেত্রী। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ নামের মধ্যে ‘বাংলা’ শব্দটি আছে, এমন অজুহাতেই মোদি সরকার আমাদের ন্যায্য দাবি বারবার খারিজ করে দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, নাম পরিবর্তনের এটাই প্রথম দাবি বা প্রস্তাব নয়। স্বাধীনতার পর একাধিক রাজ্য নাম পালটে নিয়েছে এবং কয়েকটি নতুন রাজ্যও তৈরি হয়েছে। নতুন নাম পরিচয় নিয়েছে একাধিক বড়ো শহরও। এমনকি, কেরল রাজ্যের নাম বদলে সদ্য সদ্য সায় দিয়েছে মোদি সরকার। দক্ষিণে পিনারাই বিজয়নের রাজ্য নতুন নাম নিচ্ছে ‘কেরলম’। তাঁদের মাত্র তিনবছরের দাবিকেই মান্যতা দেওয়া হল। সেখানে বাংলার বহুদিনের দাবি আটকে রাখা একযাত্রায় পৃথক ফল বইকি। বাংলা ধারাবাহিক বঞ্চনার শিকার। রাজ্যের পছন্দের নাম নামঞ্জুর তাতেই একটি সংযোজন। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এইভাবে অবদমন করে মোদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থাকেই অগ্রাহ্য করছে। এটা বাংলাকে অবজ্ঞা, বাংলার মানুষের অপমানও বটে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ