Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধনকুবের বৃদ্ধির যন্ত্র

ধনকুবের বৃদ্ধির যন্ত্র
  • ৭ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারত নিঃসন্দেহে এগচ্ছে। বিশ্বের সেরা ধনকুবেরদের তালিকায় ভারতের জয়জয়কার! সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতীয় ধনকুবেরের সংখ্যাবৃদ্ধির চিত্রটি ঈর্ষণীয়। সম্পদ বৃদ্ধির নিরিখে ভারতের স্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের পরেই। দেশের ১৯১ জন বিলিওনেয়ারের হাতেই রয়েছে ০.৯৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ—ভারতীয় মুদ্রামানে ৮২ লক্ষ কোটি টাকার অধিক। বুধবার গ্লোবাল রিয়েল এস্টেট কনসালটেন্ট ‘নাইট ফ্র্যাঙ্ক’ এমনই একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৫’-এই রয়েছে হাই নেট ওয়ার্থ ইন্ডিভিজিুয়াল বা ১ কোটি মার্কিন ডলারের অধিক অর্থের অধিকারী ধনকুবেরদের তালিকা। ভারতে আর্থিকভাবে এতটা প্রভাবশালী ব্যক্তির সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ৮৫,৬৯৮। এই বিচারে আমেরিকা, চীন ও জাপানের পরেই ‘মহান’ দেশটির নাম ভারত। সংখ্যাটি তার আগের বছর ছিল ৮০,৬৮৬। সমীক্ষকদের অনুমান, ২০২৮ সালে এমন ভারতীয়দের সংখ্যাটি ৯৪ হাজার ছুঁয়ে ফেলতে পারে। পরবর্তী লক্ষ্য নিশ্চয়—দ্রুত ১ লক্ষের মাইল ফলক অতিক্রম করা! অর্থাৎ, কোটিপতি বৃদ্ধির হারে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলিকে টেক্কা দিয়ে চলেছে ভারত। ২০২৩ সালের তুলনায়, গতবছর ধনকুবেরদের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের পাশে ভারতের ছিল ৬ শতাংশ। তিনবছর পর এটি ৯ শতাংশ হবে বলেই অনুমান সমীক্ষকদের। অর্থাৎ, বিশ্ব গড় ৭ শতাংশকে পিছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে যাবে ভারত। গতবছর বিলিওনেয়ারদের এই তালিকায় নতুন প্রবেশ ঘটেছে ২৬ জন ভারতীয়ের। পূর্ববর্তী বছরগুলির তুলনায় ‘শ্রীবৃদ্ধির’ হার ১২ শতাংশ। অথচ, ২০১৯ সালে এই তালিকায় ভারতের তরফে সংযোজন ছিল মাত্র সাতজনের। এখনই দুনিয়ার ধনীতমদের ৩.৭ শতাংশ ভারতের বাসিন্দা। ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনে ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণ যথাক্রমে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ডলার এবং ১ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি ডলার। সেখানে তৃতীয় ‘শ্রেষ্ঠ’ ভারতীয় ধনকুবেরগণ সম্পদ ধরে রেখেছেন ৯৫০ কোটি ডলার মূল্যের। 

Advertisement

এর পাশেই রাখা যেতে পারে ভারতীয়দের মধ্যে আয় বৈষম্যের ভয়াবহতাটি, যা মাত্র একমাস আগেই প্রকাশ করেছে দ্য পিপলস রিসার্চ নামে একটি সংস্থা। ২০২৩ সালে ভারতীয় ক্রেতাদের আয় বৈষম্য যা ধরা পড়েছে তা ১৯৫০ সালকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের আয়পত্তর এত খারাপ এবং অপুষ্টির শিকার শিশু ও মায়ের সংখ্যা এত বেশি যে সরকার ৮০ কোটির বেশি নাগরিককে বিনামূল্যের রেশন দিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্ব ক্ষুধা এবং সুখের সূচকে ভারতের লজ্জার এক শেষ অবস্থা! একাধিক নিকটতম ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রেরও নীচে চলে গিয়েছে ভারতের সূচক। তবে কেন্দ্রীয় সরকার বাহাদুরের মস্ত সুবিধা এই যে, তাদের প্রেরণা মরুদেশের উট নামক প্রাণীটি। বালিতে মুখ গুঁজে রেখে ঝড়ের ভয়াবহতাকে তারা অবলীলায় অস্বীকার করতে পারে। দারিদ্র্য এবং হতশ্রী দশার এই বাস্তব ছবিকে ‘পশ্চিমি কুৎসা’ দেগে দিয়ে তারা নস্যাৎ করে অহরহ। যাবতীয় সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাঝেমধ্যেই ‘৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি’র গল্প শোনান। বোঝাতে চান, ‘আচ্ছে দিন’ এল বলে! আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের রিপোর্টকে ঢাল করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০১৫-২৫ পর্বে অর্থনীতির মোট বৃদ্ধির পরিমাণ ৬৬ শতাংশ এবং তার জন্য ভারত ৩ কোটি ৮০ লক্ষ ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমেরিকা এবং চীনের পরেই, দ্রুত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির আসন গ্রহণই ভারতের আপাতত লক্ষ্য। 
আর এখানেই চলে আসে ‘সম্পদ বনাম কল্যাণ’ বিতর্ক। জনপ্রতি জাতীয় আয় বা মাথাপিছু আয়কে প্রায়শ মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং কল্যাণের সূচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই সূচক বাস্তবকে প্রতিষ্ঠিত করে কি? কারণ এটি একটি গড় মূল্য মাত্র। এর মাধ্যমে সব নাগরিকের প্রকৃত আয়ের বণ্টন প্রতিফলিত হয় না। দেশের ধনিক শ্রেণিভুক্ত লোকের সংখ্যা যৎসামান্য, কিন্তু আয় ও সম্পদের বেশিরভাগটাই তাদের কুক্ষিগত। মাথাপিছু আয় নামক গড়টি তার দ্বারা যার পর নাই বিকৃত হয়ে যায়। স্বভাবতই গড় নাগরিকের আয়ের কোনও হেরফের হয় না। যেমন ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষ দেশের ৪০ শতাংশ সম্পদের অধিকারী হওয়ায় গড় ভারতীয়ের পাতে বস্তুত ছোবড়াই পড়ে থাকে। নরেন্দ্র মোদির প্রিয় স্লোগান ‘সব কা বিকাশ’! এই স্লোগান আন্তরিক হলে মোদি সরকার গুটিকয়েক ধনকুবের বৃদ্ধির মেশিনে পরিণত হতো না। যন্ত্রটি সম্পদের সুষম বণ্টনেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করত। বিজেপি যে অর্থনীতির অনুসারী, তার কাছে বৈষম্য বৃদ্ধির বেশি কিছু প্রত্যাশা করা বৃথা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ