নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: দুর্গাপুজোর ঢাকে পড়ে গিয়েছে কাঠি। মণ্ডপ তৈরির কাজ চলছে জোরকদমে। বাঙালি ঢাকিরা ভিন রাজ্যে ঢাক বাজানোর বরাত পেয়ে গিয়েছেন বহু আগেই। কিন্তু এবারের ঢাকের বোলে কতটা সুর থাকবে তা নিয়ে চিন্তিত ঢাকিরা। যেভাবে বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে স্রেফ বাংলা বলার ‘অপরাধে’ আক্রান্ত হতে হচ্ছে, তাতে করে ঢাক বাজিয়ে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঢাকিরা। অনেকে আবার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, কাজের ফাঁকে বাইরে বেরলে পুলিসের খপ্পরে পড়তে হবে না তো? তাই বাঙালি ঢাকিরা গলায় সচিত্র পরিচয়পত্র ঝোলানোর কথাও ভাবছেন।
আগামী মাসের শেষদিকে দুর্গাপুজো। বাকি আর মাত্র ক’টা দিন। এই মরশুমে প্রতিবছরেই বাড়তি রোজগারের আশায় ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয় উত্তর ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকার একাধিক ঢাকির দল। তাতে পুরুষরা যেমন থাকেন, তেমনি থাকেন মহিলারাও। একবছর পুজো শেষ হয়ে গেলে পরের বছরের জন্য ঢাকের বায়না দিয়ে দেন ভিন রাজ্যের পুজো উদ্যোক্তারা। কিন্তু এবছর দিল্লি, অসম, গুজরাত, মুম্বই থেকে বায়না পেয়েও যাওয়ার নামে আতঙ্কেই রয়েছেন তাঁরা। আতঙ্কের নেপথ্যে ভিন রাজ্যে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান! জেলার মছলন্দপুর থেকে আটঘরা, কুমড়ো, কাশীপুর, বসিরহাট, দেগঙ্গা, হাড়োয়ায় অনেক ঢাকি দল রয়েছে। তাদের সকলেই বাঙালি। নিম্নবিত্ত পরিবারের বধূরাও ঢাক বাজানোর তালিম নিয়ে রীতিমতো দক্ষ। উৎসবের সময় বাড়তি উপার্জনের আশায় তাঁরাও দিল্লি, মুম্বই এবং বিভিন্ন রাজ্যে যান।
মছলন্দপুরে প্রতিবছরই পুজোর সময় ঢাক বাজানোর চমক দেন সজল নন্দী। এবছরের আকর্ষণ হল আলোয় সজ্জিত পঞ্চপ্রদীপ মাথায় নিয়ে ঢাক বাজাবেন তাঁর দলের ঢাকিরা। তাঁর এই প্রতিষ্ঠানেই ঢাক বাজানোর তালিম নিয়েছেন গীতা গোলদার, অঞ্জনা নন্দী, দীপালি বারুই , মিতালি কবিরাজরা। অভাবের সংসারে তাঁদের বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলেছে বর্ষার জমা জল। জলমগ্ন হওয়ায় এমনিতেই একমাস ধরে সংসার অচল প্রায়। এই অবস্থায় পুজোয় বাইরে গিয়ে ঢাক বাজিয়ে বাড়তি উপার্জনের আশাতেই বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেখানেই চিন্তায় রেখেছে বহির্বঙ্গে বাঙালি বিতাড়ন হুজুগ। উদ্বিগ্ন ঢাকির দল, বায়নার পরেও বারবার ভিন রাজ্যের পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাঁরা নিরাপত্তা চান।
এনিয়ে সজল বলেন, ‘গতবছর থেকেই আমাদের বায়না হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে ভয় যে পিছু ছাড়ছে না। আমরা বাঙালি। বাংলাতেই কথা বলব। তাতে হেনস্তার মুখে পড়তে হবে কেন!’
অন্যদিকে, অঞ্জনা নন্দী, মিতালি কবিরাজ নামে মহিলা ঢাকিদের কথায়, ‘আমরা বাঙালি। হিন্দিতে কথা বলার অভ্যাস আমাদের নেই। পুজোয় আমরা দিল্লি, মুম্বই কিংবা অসমে ঢাক বাজাতে যাই। কিন্তু সেখানে কেউ ‘বাংলাদেশি’ দেগে দিলে কী করব? তাই এবার পরিচয়পত্র নিজেদের কাছেই রেখে দেব। জানি না তার পরও কী হবে!’ -নিজস্ব চিত্র