Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পাক প্ররোচনায় ব্যর্থতার পথে ঢাকা

ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার না দিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষা করেছে নোবেল কমিটি। পাক ‘জল্লাদ’ আসিম মুনিরের তরফে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম প্রস্তাব দেখেই হয়তো‌ নোবেল কমিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বরূপ চিনেছিল।

পাক প্ররোচনায় ব্যর্থতার পথে ঢাকা
  • ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার না দিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষা করেছে নোবেল কমিটি। পাক ‘জল্লাদ’ আসিম মুনিরের তরফে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম প্রস্তাব দেখেই হয়তো‌ নোবেল কমিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বরূপ চিনেছিল। নোবেল পুরস্কার নিয়ে ট্রাম্পের লাগাতার হ্যাংলামি বুঝিয়ে দিয়েছিল মার্কিন দেশের সর্বোচ্চ পদেরও মান এই মানুষটি কীভাবে নীচে নামাচ্ছেন। কমিটির নজরে এটাও ছিল নিশ্চয়। যদিও, ট্রাম্প কেন নয়—তার কৌশলী জবাব মিলেছে নোবেল কমিটির চেয়ারপার্সন জর্জেন ফ্রাইডনেসের মুখ থেকে, ‘‘আলফ্রেন্ড নোবেলের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে শুধুমাত্র কাজের ভিত্তিতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই। এবছরের নোবেল পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পের নাম নিয়ে ভাবনার অবকাশই ছিল না। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার (প্রেসিডেন্ট পদে) পরই, ৩১ জানুয়ারি এবছরে মনোনয়ন গ্রহণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’’ 

Advertisement

শান্তি পুরস্কার অপাত্রে দানের একাধিক উদাহরণ রয়েছে নোবেল কমিটির সামনে। তার মধ্যে একেবারে টাটকা একটা নাম হল ডঃ ইউনুস। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁকে। অতঃপর বিপুল আর্থিক দুর্নীতিসহ বিবিধ অভিযোগ ও বিতর্কে বিদ্ধ হন এই অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বিবাদ সংঘাত চরমে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটে। ‘বৈষম্য-বিরোধী’ আন্দোলনের নামে বাংলাদেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির কীর্তিমানরা যে মহম্মদ ইউনুসেরই অনুগামী, তা অচিরেই খোলসা হয়ে যায়। ২০২৪-এর ৮ আগস্ট বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব লুফে নিয়ে ইউনুস তাঁর ক্ষমতালিপ্সার প্রমাণ রাখেন। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, ব্যাপারটা শেখ হাসিনার সঙ্গে সংঘাতের বদলা ছাড়া কিছুই নয়। এইভাবেই বিবাদের একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছেন ইউনুস সাহেব।   
সর্বোপরি, ডঃ ইউনুস ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশজুড়ে নখ-দাঁত বার করতে থাকে ভারত-বিরোধী উগ্র মুসলিম মৌলবাদী শক্তি। তাদের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির প্রায় দুই কোটি নাগরিক। ইউনুসের সমর্থকদের ধারণা, হিন্দু মানেই ইন্ডিয়াপন্থী এবং তারা আওয়ামি লিগের অন্ধ সমর্থক। আমরা জানি, আওয়ামি লিগ হল স্বাধীন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৈরি রাজনৈতিক দল। জাতির পিতা শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার সাজাও তাঁকে দ্রুত ফিরিয়ে দিয়েছিল রাজাকার বাহিনী। ১৯৭৫ সালে ঢাকায় তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দিনটিও ছিল লক্ষণীয়—১৫ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা দিবস। অতএব বার্তা এবং নেপথ্য শক্তিও আর ঊহ্য ছিল না।   
পরবর্তীকালে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনা। হাসিনার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র হত্যা এবং দুর্নীতি স্বজনপোষণের অভিযোগ আনে পাকপ্রেমী শক্তি। বস্তুত তারা একাত্তরের লড়াইকে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের মতে, পাকিস্তানের শাসকরা আদৌ অত্যাচারী ছিল না; পূর্ববঙ্গে বাঙালিদের উপর পাক সেনা-প্রশাসনের অত্যাচার সম্পর্কে প্রচারটি ছিল আসলে ভারতের ষড়যন্ত্র, পাকিস্তানকে ধ্বংস করার অছিলা। সর্বোপরি, একাত্তরে কোনোভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হয়নি, আসলে উপমহাদেশে মুসলিম জনগণের প্রাণের দেশ পাকিস্তানকে দুই টুকরো করা হয়েছিল এবং জন্ম নিয়েছিল ‘বাংলাদেশ’ নামে ইন্ডিয়ার একটা কলোনি। বস্তুত বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত লোকজন চেয়েছিল একাত্তরে সংঘটিত ভুলের ‘প্রায়শ্চিত্ত’। আর তারা সেটা করেছিল ভারতবন্ধু হিসেব চিহ্নিত শেখ হাসিনাকে গদিচ্যুত করে। সেখানে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুরা তাদের এই প্রবল আকাঙ্ক্ষার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে বলেই মনে করে চব্বিশের ‘জুলাই বিপ্লবের’ হোতারা। 
ডঃ ইউনুস এবং তাঁর পারিষদরা সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ যতই অস্বীকার করুন না কেন, তা ধোপে টেকে না। এমনকি দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের আগে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইউনুসের বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। যদিও আমেরিকায় হিন্দু ভোট নিশ্চিতকরণসহ প্রেসিডেন্ট পদ হাসিল হয়ে যাওয়ার পর এই গুরুতর সমস্যাটি নিয়ে তিনি আর উচ্চবাচ্যই করেননি। অতএব নোবেল শান্তি পুরস্কারে মতো একটি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মর্যাদা যে ইউনুসের হাতে ভূলুণ্ঠিত হয়ে চলেছে, তা নোবেল কমিটির কাছে জলের মতোই পরিষ্কার। অতএব, একই পুরস্কারের জন্য ইউনুসের বর্তমান বিশেষ মিত্র ট্রাম্পকে বিবেচনায় রাখার আগে কমিটি অবশ্যই সতর্ক ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়।
‘ফোর্থ গ্রেডের স্তাবক’ আসিম মুনির যে ধান্দায় ট্রাম্পের পদলেহন করে চলেছেন, তাতে সাড়ে সর্বনাশ হতে চলেছে পাকিস্তানের। পাকিস্তানে গণতন্ত্র বরাবরই তলানিতে। শ্বাসগ্রহণের জন্য মাঝেমধ্যে মাথা তুলে নাসারন্ধ্রটুকুই বার করার মরিয়া চেষ্টায় থাকে দেশটা। তেমনই এক ‘নির্বাচিত’ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন শাহবাজ শরিফ। কিন্তু ট্রাম্পের চক্করে পড়ে তাঁর এমন দশা হয়েছে যে, মনে হচ্ছে, শরিফ এখন মুনিরের আজ্ঞাবহ দাসমাত্র। হায় রে, ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান—জিন্নার স্বপ্নের দেশ! পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণ 
দ্বন্দ্বে জীর্ণ ইতিমধ্যেই। নানা ইস্যুতে দেশটির কোণে কোণে বিস্ফোরণ, গণহত্যা প্রভৃতি লেগেই আছে। সেনাপ্রধান পদে পদে ব্যর্থতার নজির গড়ে চলেছেন। সাম্প্রতিক শুরুটা ‘অপারেশন সিন্দুর’ দিয়ে। তাই যতই মুনির ‘ফিল্ড মার্শাল’ তকমা বাগিয়ে নিন 
না কেন, দেশবাসী তাঁকে ‘ফেইলড মার্শাল’-এর বেশি মনে করে না। এমন একটা লোক ট‍্রাম্পের তল্পিবাহক না-হয়ে যায় কোথায়! পাকিস্তানি ফৌজকে লোকটা বাস্তবে আমেরিকার ভাড়াটে সেনায় পরিণত করে ছেড়েছে।  
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমারকে ঘিরে ট্রাম্পের কিছু খোয়াব আছে। সেই অন্যায় স্বপ্নপূরণের সাথি এখন শাহবাজ শরিফের সুপার বস আসিম মুনির। মতলব একট‍াই, ভারত এবং চীনকে টাইট দেওয়া। চীন নিয়ে ইসলামাবাদ, থুড়ি, রাওয়ালপিন্ডির কিছুটা দোলাচল এখনও আছে। কিন্তু নয়াদিল্লির প্রশ্নে পাক সেনানায়ক যাকে বলে উদ্বাহু! ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির ট্যারিফ টক্কর শুরু হতেই মুনির বাবাজি একেবারে হাতে চাঁদ পেয়ে গিয়েছেন যেন। কিন্তু, তিনি ভুলে গিয়েছেন, আমাদের দেশটার নাম ভারত। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। সেনা সদর দপ্তর কখনোই দেশ চালাবার দুঃস্বপ্ন দেখে না। এদেশের সবটাই চলে ১৪০ কোটি মানুষের স্বার্থে এবং ইচ্ছেতে। এখানে বহু ধর্ম, ভাষা ও দল। কিন্তু পাকিস্তানের মতো নষ্টশক্তিকে টাইট দেওয়ার প্রশ্নে, কোনও মতভেদ নেই। এই প্রশ্নে কখন কাকে কাছে টেনে নিতে হবে নয়াদিল্লির চেয়ে ভালো কেউ জানে না। যেমন কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো করে আফগানিস্তানকে পাশে নিয়ে পাকিস্তানের নষ্টামির জবাব দিচ্ছে ভারত। তালিবান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। আফগান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নেতৃত্বে একটা তালিবান প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লিতে আমাদের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন। নয়াদিল্লি ফের কাবুলে ভারতীয় দূতাবাস গড়ে তুলছে। গত শুক্রবার জয়শংকরকে পাশে বসিয়ে তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী নাম না করে পাকিস্তানকে রীতিমতো নিশানা করেন। মুত্তাকি বলেন, আফগান-ভূমিতে ভারত-বিরোধী কোনোরকম কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না। তিনি এমনও হুঁশিয়ারি দেন, আফগানদের ধৈর্যের পরীক্ষা যেন কেউ না নেয়। যে আফগানকে টার্গেট করবে, তাকে উচিত শিক্ষাই দেওয়া হবে। 
আফগান মন্ত্রীর ঘোষণা যে কথার কথামাত্র নয়, তার প্রমাণ ইসলামাবাদকে বলে বলে দিয়ে চলেছে কাবুল। যেমন ১০ অক্টোবর কাবুলে এয়ারস্ট্রাইকের জবাবে ১১ তারিখ পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনওয়া প্রদেশের পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। তাতে প্রাণ গিয়েছে ১৩ জনের। এখানেই থামেনি তালিবান। নতুন হামলা চালিয়েছে তারা একদিন পরও। শনিবার রাত। নয়াদিল্লিতে নৈশভোজ সেরে আফগান বিদেশমন্ত্রী মুত্তাকি ছিলেন বিশ্রামে। আর ঠিক তখনই ঘুম উড়ে গিয়েছে মুনিরের। পাক সীমান্তের একের পর এক পোস্টে আফগান হানায় খতম হয়ে গিয়েছে ৫৮ জন পাক সেনা! জনা তিরিশ জওয়ান জখমও হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের ২৫টির মতো পোস্ট দখল করে ব্যাপক গোলাবারুদ লুট করেছে তালিবান সেনা। এমনকি, আফগান সেনার গুলিতে ভূপাতিত হয়েছে একটা পাক যুদ্ধবিমান। সব মিলিয়ে তালিবানের সঙ্গে তাল ঠুকতে গিয়ে মুনির মাতব্বর তারা দেখে ফেলেছেন দিনমানেই!  
সবদিক থেকে এমনই নাস্তানাবুদ যখন পাকিস্তান, তখনও তাকে ধ্রুবতারার মতোই অনুসরণ করে চলেছে ঢাকা। যখন পাখির চোখ হওয়া উচিত জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, তখন ঢাকার অগ্রাধিকার নয়াদিল্লির সঙ্গে বৈরিতা বৃদ্ধি! তাদের বড়ো ভরসা—পাশে পরাশক্তি আমেরিকা এবং অপশক্তি পাকিস্তান। কিন্তু আমেরিকা আজ পর্যন্ত কারও প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছে বলে কোনও দেশই দাবি করতে পারবে না। সাম্রাজ্য বিস্তারের ধান্দায় কিছু দুর্বল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর খেলায় মাতে মার্কিন মুলুক। আর কাজ ফুরোলেই সেই দেশ ‘পাজি’—ততক্ষণে দেশটি ধনমান সর্বস্ব খুইয়ে বসে থাকে। হলফ করে বলা যায়, পাকিস্তানের হাঁড়ির হাল হবে অচিরেই। ইসলামি উম্মার মোহে কিছু নেতা যদি বাংলাদেশকেও ওই কানাগলিতে প্রবেশ করান, তারও ভাগ্যে যে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ ভিন্ন দ্বিতীয় কিছু লেখা হবে না, তা অনুমান করা শক্ত নয়। সবচেয়ে ক্ষতি হবে মায়ানমারের আরাকান বা রাখাইন রাজ্য লাগোয়া অঞ্চলের (বান্দরবন, কক্সবাজার প্রভৃতি)। আমেরিকা, চীন, পাকিস্তান আর স্থানীয় শতাধিক উগ্র সংগঠন মিলে জায়গাটাকে বঙ্গদেশের ‘গাজা’ বানিয়ে ছাড়বে। তাতে, পূর্ব সীমান্তে চিন্তা বাড়বে ভারতের, আমাদের সতর্ক থাকার ব্যাপার এটাই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ