অর্চনা মা’র ছোট বেলার একটি ঘটনা স্মরণীয়। তখনও বাড়ী থেকেই আশ্রম যাতায়াত করেন। কোনও এক ভক্তের দীক্ষা উপলক্ষ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল আশ্রমের। ভক্তরা তখন দীক্ষা উপলক্ষ্যে সামর্থ্যমত ভক্তসেবার ব্যবস্থা করতেন। দীক্ষার পূজা প্রণামী ইত্যাদি আনুষঙ্গিক সব নিবেদন এবং ব্যবস্থার অতিরিক্ত এই ব্যবস্থা প্রায় সকলেই করতেন বিশেষ দিনের পুণ্যলগ্নকে কৃপাময় করে তোলার জন্য। ভক্তের সেবা যে ভগবানের প্রিয়। তাই বিশেষ ভক্তবাড়ীতে বলে আসা হ’ত সেদিনের প্রসাদের কথা। সেইভাবেই কৃষ্ণাবাসেও চলে গেছে নিমন্ত্রণবার্তা। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই চিররুগ্না অর্চনা মা’র সুরু হয়েছে পেটের গোলমাল। বাড়ীর সকলেই যাচ্ছে। অথচ এ অবস্থায় কি করে যাবেন ভেবে কাঁদছেন অর্চনা মা। যাবার ইচ্ছাও অদম্য অথচ উপায় নেই। অর্চনা মা’র জননী ন’মা বুঝলেন কন্যার মনের অবস্থা। বললেন—‘তুই এক কাজ কর্, আমাদের সঙ্গে আশ্রমে চল্। তারপর ঠাকুরকে প্রণাম করেই চলে যাবি চন্দ্রমামাদের বাড়ি। ওখানেই শুয়ে থাকবি।’ প্রস্তাবটা মন্দ নয়। চন্দ্রমামাদের বাড়ী আশ্রমের একেবারে কাছেই।
আশ্রমে গিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করেই অর্চনা মা চলে গেলেন চন্দ্রমামাদের বাড়ীতে। ঠাকুর বসলেন পূজায়। অর্চনা মার পেটের অবস্থা তখনও একই রকম। তাই শুয়ে আছেন চুপচাপ। দুর্বল দেহ ক্লান্তিতে অবসন্ন। কখন ঘুম এসে গেছে টেরই পাননি। হঠাৎ চন্দ্রমামার সহধর্মিণী এসে ডাকায় ঘুম ভাঙলো। উনি বললেন—‘আশ্রম থেকে তোমাকে ডাকতে এসেছিল। ঠাকুর ডাকছেন। দেখ যদি যেতে পারো তো যাও।’ ঠাকুর ডেকেছেন। যেতে তো হবেই। দুর্বল শরীর নিয়ে কোনও রকমে উঠে আস্তে আস্তে এলেন আশ্রমে। ঠাকুর তখন দীক্ষাদান সেরে উপরে উঠে গেছেন। ভক্তরা প্রসাদ পেতে বসেছেন। পাতায় পাতায় পরিবেশিত হচ্ছে গরম খিচুড়ী। অর্চনা মাকে দেখেই কে একজন বলে উঠলো ‘এদিকে আয়, প্রসাদ পেতে বোস্।’ অর্চনা মা বলেন, আমি কিছু খাবো না, শরীর ভালো নেই। পরেশকা দাঁড়িয়েছিলেন কাছেই। বললেন,—‘সে কি! ঠাকুর বলেছেন অর্চনা এলেই প্রসাদ খাইয়ে দিও, আর তুই বলছিস খাবো না! যা পারবি তাই খাবি। বোস্।’ অগত্যা মায়েদের ঘরে ঢুকে এক কোণে গিয়ে বসলেন। সেখানে প্রসাদ পেতে বসেছিলেন ন’মাও। ন’মার কাছে বসে বললেন—‘আমি কিছু খাবো না মা। পেটের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। কিন্তু ঠাকুর যে বলেছেন প্রসাদ পেতে, তা কি করি?’ ন’মা বললেন—একটুখানি আমার পাত থেকে নিয়ে মুখে ঠেকা তাহলেই হবে।
মায়ের কথামত অর্চনা মা একটুখানি কণিকা তুলে নিয়ে মুখে দিয়েছেন, কি ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীঠাকুর স্বয়ং এসে উপস্থিত মায়েদের ঘরে। ঠাকুরের হাতে গরম পায়েসের বালতি আর পরিবেশনের হাতা। উৎসবের এরকম দিনে প্রায়ই ঠাকুর নিজের হাতে পায়েস দিতেন ভক্তদের।
স্বামী মৃগানন্দের ‘অলৌকিক কৃপাময় সত্যানন্দ’ থেকে