Bartaman Logo
৭ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

দেউচা-পাচামির স্বাস্থ্যকেন্দ্র কোমায়, ফুসফুস ঝাঁঝরা করছে সিলিকোসিস

পাথর লুটের টাকায় কেউ ‘মসিহা’ হয়েছেন, কেউ রাতারাতি কোটিপতি। নবান্নও রাজকোষ ভরিয়েছে। কিন্তু, বিনিময়ে পাথর শিল্পাঞ্চলের মেহনতি মানুষ কী পেলেন?

দেউচা-পাচামির স্বাস্থ্যকেন্দ্র কোমায়, ফুসফুস ঝাঁঝরা করছে সিলিকোসিস
  • ৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, মহম্মদবাজার: পাথর লুটের টাকায় কেউ ‘মসিহা’ হয়েছেন, কেউ রাতারাতি কোটিপতি। নবান্নও রাজকোষ ভরিয়েছে। কিন্তু, বিনিময়ে পাথর শিল্পাঞ্চলের মেহনতি মানুষ কী পেলেন? রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে তো বঞ্চিত হয়েছেন। বাড়তি পাওনা হিসাবে জুটেছে মারণরোগ ‘সিলিকোসিস’। শিল্পাঞ্চলের বাতাসে ভাসা পাথরের গুঁড়ো নিঃশব্দে শত শত শ্রমিকের ফুসফুস ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে এক-একটা জীবন।

Advertisement

পাথর শিল্পাঞ্চলে গেলেই এই বঞ্চনার জীবন্ত কঙ্কালগুলিকে চোখের সামনে ঘুরতে দেখা যায়। যেমন দেউচা-পাচামির উপর হাবড়াপাহাড়ী গ্রামের ৫৫বছরের প্রৌঢ় শুভ মার্ডি। কোটরে ঢুকে গিয়েছে চোখ। পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট গোনা যায়। সামান্য দু’পা হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। ফুসফুস যেন একটু বাতাসের জন্য আর্তনাদ করে। অথচ একসময় এই মানুষটার বুকেই ছিল পাহাড় ভাঙার শক্তি। দিনরাত ক্র্যাশারে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন। সেই শুভবাবু ধুঁকতে ধুঁকতে বলছিলেন, ‘আমাদের জমি, জঙ্গল কেড়ে খাদান করে কোটি কোটি টাকা লুট করে নিয়ে চলে গেল ওরা। আর আমাদের শরীরেই মারণ রোগ ধরিয়ে গেল। সরকার আমাদের দিকে মুখ তুলেও তাকায় না।’
পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। মহম্মদবাজার ব্লকে সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কো-অর্ডিনেটর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘গত দু’বছরে মোট সিলিকোসিস আক্রান্তের সংখ্যা ২১৮। অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার। যাঁদের অনেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে রয়েছেন। ইতিমধ্যে চিহ্নিত এবং সন্দেহভাজন সিলিকোসিস মিলে মোট ২৫জনের মৃত্যু হয়েছে।’ নিয়ম অনুযায়ী, ধুলো ওড়া রুখতে ক্র্যাশারে জল ছিটানো থেকে শ্রমিকদের মাস্ক দেওয়ার মতো নানাবিধ নিয়ম খাতায় কলমে রয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। আদালতের নির্দেশ মেনে আক্রান্তদের এককালীন দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং মাসে চার হাজার টাকা পারিবারিক ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও শতাধিক মানুষ সেই অধিকার থেকে আজও বঞ্চিত হচ্ছে।
গত ১৫বছর ধরে ‘মণ্ডল কোম্পানি’র লুটের দাপটে শ্রমিকদের জীবনের মূল্য স্রেফ ধুলোয় মিশে গিয়েছে। টুলু মণ্ডলের মতো মাফিয়ারা যে শ্রমিকদের রক্তঘাম ঝরানো পরিশ্রমে টাকার পাহাড় গড়েছেন আজ তাঁরাই মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। পাথর খাদানে কাজ করে মিনু বেসরা, প্রশান্ত বাগদি, নিতাই বাগদি, হজ মহম্মদরা আজ শয্যাশায়ী। কাঁচা টাকা দিয়ে প্রশাসনকে হাতের মুঠোয় রাখা হয়েছে, আর বলি হচ্ছে গরিবের জীবন।
একদিকে মারণ রোগের থাবা, অন্যদিকে চরম স্বাস্থ্য-সংকট। গোটা দেউচা-পাচামির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই কার্যত কোমায় চলে গিয়েছে। ভাঁড়কাটা পঞ্চায়েতের কেন্দ্রপাড়ায় একটিমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। সেটি নিজেই যেন আইসিইউতে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা ন্যূনতম পরিষেবা কিছুই মেলে না। গোদের উপর বিষফোড়া এখানকার ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা রাস্তা। এই নরকযন্ত্রণা পেরিয়ে প্রসূতিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তাতেই বিপদ হয়। দিনের শেষে প্রশ্ন একটাই-হাজার হাজার কোটির সম্পদের নীচে শুভ মার্ডিদের দীর্ঘশ্বাসের হিসাব কি কোনোদিন হবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ