রাস্তাঘাটে বেরলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হই আমরা। যাঁরা গাড়ি কিংবা বাইক-স্কুটারে চেপে যাতায়াত করেন, তাঁদের যেমন নিয়ম মানতে হয়, তেমনই নিয়ম রয়েছে পথচারীদের জন্যও। আইন মেনে চলাফেরা না করলে জরিমানা ও বৃহত্তর শাস্তি দুই-ই হতে পারে। এ রাজ্যে সম্প্রতি পথআইন আরও কড়া হয়েছে। বেড়েছে জরিমানার অঙ্কও। প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক, কোন নিয়মের বিরুদ্ধাচরণে কত টাকা জরিমানা অপেক্ষা করছে।
পথআইনে শাস্তির বিধান
ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে গাড়ি চালানোর মূল নিয়ম ও আইন ১৯৮৮ সালের কেন্দ্রীয় মোটরযান আইন এবং রাজ্য পরিবহন দপ্তরের নিয়ম দ্বারা পরিচালিত। সড়ক নিরাপত্তা ও জরিমানা এড়াতে প্রতিটি চালককে বৈধ লাইসেন্স, ট্রাফিক সিগন্যাল ও নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে চলতে হবে।
হেলমেট ও সিটবেল্ট সংক্রান্ত নিয়ম
হেলমেট না পরে বাইক চালালে ৫০০ টাকা জরিমানা, সঙ্গে প্রয়োজন বুঝলে ৩ মাসের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। ঠিক তেমনই সিটবেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালালেও জরিমানা দিতে হবে ৫০০ টাকা।
জরুরি কাগজপত্র না থাকলে
রাস্তায় বেরনোর সময় গাড়ির যাবতীয় নথিপত্র সঙ্গে রাখুন। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে না পারলে সরাসরি ৫,০০০ টাকা জরিমানা নেওয়ার বিধান রয়েছে। গাড়ির যে কোনো কাগজপত্র না দেখাতে পারলে অপরাধের ওজন বুঝে ২,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। দেখে রাখুন গাড়ির পলিউশন সার্টিফিকেট ও ইনস্যুরেন্স আপডেটেড রয়েছে কি না। পলিউশন সার্টিফিকেট না দেখাতে পারলে ২০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ইনস্যুরেন্স না থাকলে ২০০০ টাকা জরিমানার সঙ্গে ৩ মাসের জেল হতে পারে।
গাড়ি চালানোর নিয়মনীতি
কানে মোবাইল, হাতে স্টিয়ারিং। এই নগর এমন দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত। কিংবা এক কাঁধ দিয়ে ফোন কানের সঙ্গে চেপে কথা বলতে বলতেই বাইক চালাচ্ছেন সওয়ারি। অ্যাপ ক্যাবেও এমন দৃশ্য সহজলভ্য। তবে এবার থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে করতে গাড়ি চালালে ট্রাফিক সার্জেন্ট প্রথমবারের জন্য ১,০০০ টাকা জরিমানা করবে। একই সওয়ারির ক্ষেত্রে এটি একাধিকবারের অপরাধ হিসেবে প্রমাণ হলে, ২,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। গাড়ির নম্বর নিজস্ব সাইটে ফেললেই ট্রাফিক সার্জেন্ট বুঝে যাবেন উক্ত গাড়ির চালক এর আগে কবে কোথায় কী অপরাধের জন্য জরিমানা দিয়েছেন।
গতি ও সিগন্যালের আইন
গতির হেরফেরের জন্যও নানারকম বিধিনিয়ম রয়েছে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে হালকা গাড়ির ক্ষেত্রে ১০০০ টাকা জরিমানা ও ভারী গাড়ির ক্ষেত্রে ২০০০ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। মদ্যপ বা মাদকাসক্ত অবস্থায় বা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালে অপরাধের তীব্রতা অনুসারে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলে ৫০০-১০০০ টাকা অনলাইনে কেস দেওয়ার নিয়ম। বাইকে দু’জনের অধিক কেউ থাকলে ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। ঠিক সেভাবে ফোর সিটার গাড়ি বা ট্যাক্সিতেও পাঁচজন নেওয়ার বিধি নেই। এটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যান্য নিয়ম
পথ আইনের আরও একটি বড়ো দিক ১৮ বছরের কমবয়সি নাবালকদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং না দেওয়া। বয়স আঠারো পূর্ণ হওয়ার আগেই গাড়ি চালালে গাড়ির মালিকের ২৫,০০০ টাকা জরিমানা সহ ৩ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এমনকি, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ১২ মাসের জন্য বাতিল করারও আইন রয়েছে। ১৮ বছরের নীচে কোনো ব্যক্তি গাড়ি চালানোর অপরাধে একবার ধরা পড়লে ওই নাবালক ২৫ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত কোনো লাইসেন্স পাবে না। এছাড়া মডিফায়েড সাইলেন্সর বা উচ্চমাত্রার হর্ন ব্যবহার করলে ৫০০০-১০,০০০ টাকা জরিমানার ফরমান রয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বা ফ্যান্সি নম্বর প্লেট থাকলে ৫০০০ টাকা জরিমানার নিয়ম রয়েছে।
গাড়ি বা বাইকে কী কী নথি রাখবেন
রাস্তায় বেরলে সঙ্গে রাখুন ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ইনস্যুরেন্সের কাগজপত্র, গাড়িতে থার্ড-পার্টি মোটর বিমা থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া গাড়ির ধোঁয়া পরীক্ষার সার্টিফিকেটও সঙ্গে রাখুন।
জেব্রা ক্রসিংয়ের নিয়ম
আমাদের দেশে রাস্তা পারাপার করার জন্য জেব্রা ক্রসিং রয়েছে। সবসময় জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করেই রাস্তা পেরনো উচিত। চালকদের জন্যও জেব্রা ক্রসিংয়ের নানা নিয়ম আছে। এই ক্রসিংয়ের সামনে পথচারী দেখলে গাড়ি থামাতে হবে।
অকারণে হর্ন বাজিয়ে পথচারীকে বিভ্রান্ত করলেও শাস্তির বিধান রয়েছে। এমনকি, জেব্রা ক্রসিং খালি থাকলেও ধীরে চলতে হবে চালকদের।
পথ সুরক্ষা আইন মেনে ঠান্ডা মাথায় গাড়ি চালান। চালক ও মানুষজন আইন মেনে চললে তবেই পথ সুরক্ষা আরও মজবুত হবে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়
গাড়ি বা বাইক নিয়ে বেরন? কী করলে জরিমানা লাগবে না? পরামর্শে আইনজ্ঞ দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
দূর থেকে রনিতের গাড়িটা লক্ষ করছিলেন ট্রাফিক পুলিশ। চিংড়িহাটা ক্রসিংয়ের কাছে আসতেই সাইড করতে বললেন। রনিত অবাক। কাগজপত্র থেকে লাইসেন্স সবই আপডেট করানো। সিগনাল ভাঙেননি, বেল্ট পরেছেন, ভুল লেনেও ঢুকে পড়েননি! তাহলে? গাড়িটা সাইড করে কাচ নামালেন। ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে বললেন, ‘পলিউশন সার্টিফিকেটটা দেখি!’ প্রমাদ গুনলেন রনিত। এই একটিমাত্র কাজ করব, করব করেও করানো হচ্ছিল না। পলিউশন সার্টিফিকেট আপডেট করানো নেই! নেমে বিষয়টা বুঝিয়ে বললেও কাজ হল না। এককথায় ২০০০ টাকার চালান কাটলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট। এত বেশি কেন? ট্রাফিক সার্জেন্ট চার্ট বের করে দেখিয়ে দিলেন কোথায় কত টাকা। সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়েই ২০০০ টাকা খসে গেল রনিতের।
হেলমেট পরেই বাইক চালাচ্ছিলেন দেবেশ। সারা রাস্তা নিশ্চিন্তে এসেছেন। কোনো মোড়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট দাঁড় করাননি। কিন্তু বাড়ি ফিরে মোবাইল দেখতেই অবাক! মোড় থেকে ঘোরার সময় ইন্ডিকেটর জ্বালাতে ভুলে গিয়েছিলেন। অনলাইনে ইতিমধ্যেই কেস ঢুকে গিয়েছে!