Bartaman Logo
১৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উপলব্ধি হলেও রয়ে গিয়েছে চ্যালেঞ্জ

ভারতীয় অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা। ৩০-৪০ বিলিয়ন ডলার আসার সম্ভাবনা। বিস্তারিত পড়ুন।

উপলব্ধি হলেও রয়ে গিয়েছে চ্যালেঞ্জ
  • ১৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ২০২৬ সালের মে মাসের শেষে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ হতাশাজনক। জুনের শুরুতেই সরকারি তৎপরতা জোরদার হয়। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ঘোষণা করে—বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের ‘ফুললি অ্যাক্সেসেবল রুট’ (এফএআর)-এর আওতা বাড়িয়ে নতুন ১৫, ৩০ ও ৪০ বছর মেয়াদি বন্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া, বিদেশি পোর্টফোলিয়ো বিনিয়োগকারীদের উপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও সীমা তুলে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে, সরকার একটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বন্ড বিক্রির উপর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের কর (১২.৫ শতাংশ) এবং ‘উইথহোল্ডিং ট্যাক্স’ বা উৎসমূলে কর (২০ শতাংশ) থেকে অব্যাহতি দেয়। পাশাপাশি, হেজিংয়ের খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংকগুলিকে আরবিআই আকর্ষণীয় প্রস্তাবসহ ফরেন কারেন্সি নন-রেসিডেন্ট ব্যাংক বা এফসিএনআর (বি) আমানত সংগ্রহের অনুমতিও দেয়।

Advertisement

এগুলি পরীক্ষিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। এর ফলে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে যে, ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বা তারও বেশি) আসবে। এই অর্থাগম শক্তিশালী করবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে। এর মাধ্যমে ভারতীয় মুদ্রা বা রুপির অবমূল্যায়ন হয়তো রোধ করা সম্ভব হবে। কারণ রুপির মান নেমে যাওয়াটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি ২০১৪ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে রুপি-ডলার বিনিময় হার ৪০ রুপিতেই নিয়ন্ত্রণ করা হবে (যা অনেকটা রাজা ক্যানুটের জোয়ার থামানোর আদেশের মতোই অবাস্তব ছিল!)।
অন্য কোনো বিকল্প নেই
ঝুঁকি তো আছেই। তবে ঝুঁকি নিয়ে এখন বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। কারণ সরকার ও রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। কোনো পদক্ষেপ না করার ঝুঁকি ছিল আরো বেশি। সরকার দীর্ঘসময় যাবৎ পরিস্থিতিকে অস্বীকার করে আসছিল। বিশেষ করে ট্রাম্প-যুগের শুল্ক আরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল বনাম ইরান সংঘাত, তেলের দামের আকস্মিক বৃদ্ধি এবং সরবরাহশৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) বিপর্যয়ের পর থেকে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতে বিনিয়োগের ব্যাপারে সতর্ক ও সন্দিহান ছিলেন। পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই এর ফলাফল স্পষ্ট হচ্ছিল, অথচ সরকারের টনক নড়ছিল না:
• কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি (সিএডি) প্রতি মাসেই বাড়ছিল এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের শেষে এই ঘাটতি ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হল, ওই বছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সোনা আমদানির পরিমাণ ছিল ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সমস্যার মূল কারণটি সম্পর্কে আমরা অবগত। 
• নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ ছিল মাত্র ৬.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও 
শেয়ার বাজারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবকেই প্রতিফলিত করে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বেশিরভাগ মাসেই ভারতীয় শেয়ার বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট বিক্রেতা হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে গত মার্চে এই বিক্রির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৭৭৫ ​​কোটি টাকায় পৌঁছায়।
• স্থির মূল্যের ভিত্তিতে ‘গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন’ (জিএফসিএফ)—অর্থাৎ স্থায়ী মূলধনী সম্পদ গঠনের হার—২০২২-২৩ সাল থেকে ৩২.৩ শতাংশেই থমকে রয়েছে। সরকারি ক্ষেত্র, গৃহস্থালি ক্ষেত্র (রিয়েল এস্টেট এবং নির্মাণ শিল্প) এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের মধ্যে এই জিএফসিএফের ভাগ মোটামুটি সমানভাবেই বণ্টিত। নানাবিধ বোঝানো, প্ররোচনা, হুমকি কিংবা বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন—কোনো কিছুই বেসরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে, বিশেষ করে উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী করে তুলতে পারেনি। এনডিএ জমানায় বহু বছর ধরেই স্থির মূল্যের ভিত্তিতে জিভিএ-তে উৎপাদন ক্ষেত্রের অবদান ১৭ শতাংশেই আটকে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, জিডিপি = জিভিএ + পণ্যের উপর নিট কর। 
স্থিতিস্থাপক নয়, বরং ভঙ্গুর
রিজার্ভ ব্যাংকের মাসিক বুলেটিন এবং অর্থমন্ত্রকের মাসিক পর্যালোচনাগুলিই এই আত্মতুষ্টির জন্ম দিয়েছিল। অনেক অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদই উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রতিবেদন দুটি ছিল অত্যধিক আশাব্যঞ্জক এবং এসব তুলে ধরে প্রকৃত পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলিকে আড়াল করা হয়েছিল। সরকারের মুখপাত্ররা ক্রমাগত ‘স্থিতিস্থাপকতা’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছিলেন, অথচ বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছিলেন যে, এই শব্দটি আসলে ‘ভঙ্গুরতা’কে আড়াল করার একটি দুর্বল পর্দা ছাড়া কিছু নয়।
সরকার হয়তো কেবল এই পদক্ষেপগুলি নিয়েই থেমে থাকার কথা ভাবতে পারে, কিন্তু তাতে একটি বড়ো ভুলই হবে। ‘ইন্ডিয়া টুডে’র মারিয়া শাকিলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অনন্ত নাগেশ্বরণ সরকারের বর্তমান চিন্তাধারা তুলে ধরেন। সোনা আমদানির উপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিতে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন যে, সোনা আমদানির উপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ সম্পর্কে তিনি ‘অবহিত নন’। অথচ তিনি হলেন প্রধান উপদেষ্টা! এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মতামত নিশ্চয় রয়েছে এবং সেই পরামর্শ অবশ্যই দিয়েছেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই জনসমক্ষে এই বিষয়ে কথা বলতে কিছুটা কুণ্ঠাবোধ করেন নাগেশ্বরণ। কারণ ২০১৩-১৪ সালে তৎকালীন সরকার যখন সোনা আমদানির উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, তখন নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘অর্থমন্ত্রী আপনাদের মঙ্গলসূত্র চুরি করছেন।’ তবে আশঙ্কা হচ্ছে, সোনা আমদানির গতি কিছুটা শ্লথ করা বা তাতে বাধা সৃষ্টি করা ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো উপায় নেই।
চ্যালেঞ্জগুলি স্বীকার করা প্রয়োজন
তাছাড়া, সরকারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে পারিবারিক ঋণের বোঝা বেড়েছে (জিডিপির 
৪১ শতাংশ), পরিবারের আর্থিক সঞ্চয় কমেছে (জিডিপির ৬ শতাংশের কম) এবং ভোগ-ব্যয় বা খরচের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে (ব্যতিক্রম 
কেবল সেই ক্ষুদ্র অংশ, যাঁরা বিলাসবহুল পণ্য কেনেন)। ‘সাফল্য’ সম্পর্কে পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকসহ বিভিন্ন মন্ত্রক মারফত যেসব তথ্য বা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় সেগুলি সরকারেরও অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বরং মানুষের 
হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এর জন্য বেশকিছু উপায় রয়েছে: মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা। ভোগ্যপণ্যের উপর কর হ্রাস। গ্রেট নিকোবর কন্টেইনার পোর্ট-কাম-এয়ারপোর্টের মতো অপ্রয়োজনীয় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্প বাতিল করা। শিক্ষাঋণের সংখ্যা বৃদ্ধি। এমজিএনআরইজিএস বা ১০০ দিনের 
কাজের মতো শ্রমনিবিড় সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্পগুলিকে পুনরায় জোরদার করা। এছাড়া পানীয় জল, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প ও শহুরে আবাসন প্রকল্পে যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে সেটির সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা।
কেন্দ্রীয় সরকারকে এবং রাজ্য সরকারগুলিকেও তাদের অনুমোদিত শূন্যপদগুলি দ্রুত পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ, এবং ডাক্তার, শিক্ষক, নার্স, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর জওয়ান, ভারতীয় রেলের কর্মী প্রভৃতির মতো পদগুলি পূরণ করা প্রয়োজন। যেসব পদে চাকরি পাওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণরা মুখিয়ে থাকেন। সরকারের সামনে এমন কিছু লক্ষ্য থাকা উচিত যা মানুষকে উজ্জীবিত করবে এবং আশার সঞ্চার করবে তাঁদের মনে। যেসব লক্ষ্য বিভেদকামী, মেরুকরণ সৃষ্টিকারী এবং অনুৎপাদক—সেসবের পিছনে নরেন্দ্র মোদির সময় নষ্ট করা উচিত নয়। শুধুমাত্র ইতিবাচক লক্ষ্যগুলি অর্জনেই নিজের শক্তি ও সময় ব্যয় করা উচিত তাঁর।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ