নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: বালি ও কয়লা লুটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল পশ্চিম বর্ধমান জেলা। অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে দামোদর ও অজয় থেকে বেপরোয়া বালি লুট হয়েছে। একইভাবে কুলটি থেকে জামুড়িয়া, অণ্ডাল সর্বত্র অবৈধভাবে কয়লা কেটে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। ঠিক তেমনি অর্থের বিনিময়ে কারখানায় লোক ঢোকানো। শ্রমিক শোষণ করে কাটমানি খাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে, অভিযোগ বিস্তর হলেও পালা বদলের পর ‘অ্যাকশন’-এর পরিধি কিন্তু সীমিতই। খোঁজ নিতেই উঠে আসছে ‘আঁতাত’ তত্ত্ব। সেটা আবার কেমন ভাবে? স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য বেশ চাঞ্চল্যকর। লুটেপুটে খাওয়া তৃণমূলীদের একাংশকে ঘুরপথে কাজে লাগানো শুরু করেছে গেরুয়া শিবিরের একাংশ নেতা। ১৫ বছর দল ক্ষমতায় থেকে টাকা লুটের ফন্দি ফিকির জানা তৃণমূলীদের ওই অংশের। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিজেপির কিছু নেতা তাঁদের পাশে রেখেই লুটপাটের ধারা অব্যাহত রাখতে চাইছেন।
বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিভিন্ন ব্লকে সভা করে কড়া বার্তা দিতে হচ্ছে বিজেপির জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্যকে। তিনি অণ্ডালের সভায় বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে যাওয়া বালির লরি আটকানো যাবে না। যদি আপনাদের মনে হয় অবৈধ বালি পাচার হচ্ছে, তা হলে থানায় অভিযোগ করুন। দলীয় নেতৃত্বের নজরে দিন।’ তাঁর বক্তব্যের পিছনে স্থানীয়দের অভিযোগ মান্যতা পাচ্ছে। কেননা, বালির গাড়ি এলাকায় এলাকায় আটক করে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। অনেক সময়ে ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে সমস্যা হওয়ায় সেগুলি আটকানো হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে জেলা সভাপতিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিজেপি কর্মীদের মনে রাখতে হবে আমরা আর বিরোধীদল নই। ইচ্ছেমতো রাস্তা অবরোধ করে বালির লরি নিয়ে আন্দোলন করা যাবে না।’ বিজেপি নেতাদের একাংশের তৃণমূলীদের সঙ্গে সখ্যের বিষয়টি মেনে নিয়ে জেলা সভাপতি বলেন, ‘এই অভিযোগ আমিও পেয়েছি। দল থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনোমতেই দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না।’
পশ্চিম বর্ধমান জেলার পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভা ও কাঁকসা ব্লক বালি লুটের জন্য কুখ্যাত। কাঁকসায় অজয়, দামোদর দুই নদী থেকেই ব্যাপক বালি লুটের অভিযোগ রয়েছে। পাণ্ডবেশ্বরে অজয় থেকে বেপরোয়া বালি লুট হয়েছে বলে অভিযোগ। তৃণমূল নেতা ও তৃণমূলপন্থী বালি মাফিয়ারাই এই লুটের নেতৃত্ব দিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। সরকার বদলের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, বালি কারবারে জড়িতরা গারদে থাকবে, এলাকায় অবৈধ বালি কারবার বন্ধ হবে। সরকার বদলের দেড় মাস পর ছবিটা এতটুকুও বদলায়নি। বালি লুটের অভিযোগে জেলায় একমাত্র তৃণমূল নেতা গৌতম ঘোষ গ্রেপ্তার হয়েছে। আর কেউই ধরা পড়েনি। উল্টে পাণ্ডবেশ্বর থেকে কাঁকসা ব্লকজুড়ে নতুন করে অবৈধ বালি কারবার চালু হওয়ার অভিযোগ উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এনিয়ে বিস্তর সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ অণ্ডালের এক দাপুটে তৃণমূল জনপ্রতিনিধি অবৈধ বালি ও কয়লা কারবার হাতের তালুর মতো চেনেন। নিঃস্ব অবস্থা থেকে এখন তিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক। ক্ষমতা বদলের পর তাঁর গায়ে কোনো আঁচই পড়েনি। বরং বিজেপি নেতারা তাঁকে সমীহ করে চলছেন। জামুড়িয়ার এক বিজেপি নেতা কারখানা থেকে টাকা লুটে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে চলছেন বলেও অভিযোগ। কুলটির ধেমোমেন কোলিয়ারি এলাকার তৃণমূল নেতা রোহিত নুনিয়া ইসিএলের জমিতে পেট্রল পাম্প গড়ে তুলেছেন। উচ্ছেদের নোটিসও দেওয়া হয়েছিল। সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় সংস্থা। এখানেও উঠে আসছে ‘সেটিং’ তত্ত্ব।