রাজদীপ গোস্বামী, শালবনী: বিজেপি সরকারের বাজেটে শালবনীর শিল্পতালুক নিয়ে একটা শব্দও খরচ করা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই উৎকণ্ঠায় ছিলেন জমিহারা থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা। শালবনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছিল। তবে আশার কথা, বাজেটে শালবনী নিয়ে সরকার বাজেটে নীরব অবস্থান নিলেও প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে আগের মতোই। বুধবার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কর্মমুখর শালবনী। শিল্পাতালুকের নির্ধারিত জমিতে কাজ চলছে স্বাভাবিক নিয়মেই। প্রশাসন সূত্রেও খবর, শালবনীতে শিল্পতালুক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। যথাসময়ে কাজ সম্পূর্ণ হবে। জিন্দাল গোষ্ঠীর মানবসম্পদ বিভাগের আধিকারিক দিব্যেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগচ্ছে।’ শালবনীর বিধায়ক গুচ্ছাইতও এদিন বলেছেন, ‘সিপিএম আমলে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তৃণমূলের জমানায় শিলান্যাস হয়েছে। আমরা শালবনীতে শিল্প গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ, বিজেপি সরকার চায় বাংলায় কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি হোক। শালবনীতে শিল্পতালুক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠলে জেলার প্রচুর বেকার যুবক-যুবতী কাজ পাবেন।’
শালবনীতে শিল্পায়নের ইতিহাস কম নাটকীয় নয়। ২০০৭ সালে জিন্দাল গোষ্ঠী এখানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। আশায় বুক বেঁধেছিলেন কুলফেনী, আসনাশুলি, গাইঘাটা-সহ প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ। কৃষিজমি ছেড়ে বহু পরিবার শিল্পের ভবিষ্যতের উপর ভরসা রেখেছিল। সরকারি, রায়ত ও পাট্টা জমি মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রত্যাশা ছিল, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু, মাঝ পথে গল্প বদলে যায়। ২০০৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ের উপর মাওবাদী হামলার পর প্রকল্প থমকে যায়। অধিগৃহীত বিশাল জমি পড়ে থাকে। পরে ওই জমির একাংশে সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠলেও বৃহৎ শিল্পাঞ্চল তৈরির স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
এখন সেই জমিতেই গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দু’টি ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, ভবিষ্যতে একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কও তৈরি হবে। তাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, পরিবহণ, নির্মাণ এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন। সেটাই এখন পুরোপুরি বাস্তবায়নের পথে। বিজেপি সরকারও শালবনীতে শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে যে সদর্থক ভূমিকা নিয়ে চলবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিধায়ক। ফলে, শালবনীকে ঘিরে নতুন করে কর্মসংস্থানের বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ছেলে-মেয়েরা। এলাকার বাসিন্দা স্বপন দাস বলছিলেন, ‘এখানকার বহু ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা শেষ করেও কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে উঠলে বহু পরিবার বাঁচার স্বপ্ন দেখবে। আমরা চাই, কাজ দ্রুত শেষ হোক।’
জিন্দাল কারখানার গেটের সামনে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে আর এক বাসিন্দার আক্ষেপ, ‘শিল্পের জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছি। এবার যেন কোনো কারণে কাজ বন্ধ না হয়। বাজেটে শালবনীর কথা থাকলে ভালো হতো। তবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হচ্ছে। জেলার ছেলেমেয়েদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ জিন্দাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।