পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বীরভূমের পাথর শিল্পাঞ্চল থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব চুরির সিন্ডিকেট ভাঙতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল ‘কেঁচো খুঁড়তে কেউটে’! পরিবর্তিত সরকার এবং জেলা প্রশাসন যে বজ্র আঁটুনির ভরসায় বুক ঠুকে বলেছিল সমূলে উৎপাটিত করা হবে সিন্ডিকেট রাজ, সেই আঁটুনির গেরো বেশ ফোস্কা! ভূমিদপ্তরের অন্দরেই ধরা পড়ল সর্ষের মধ্যে থাকা ভূত।
সিন্ডিকেট চালানোর অন্যতম পন্থা হিসেবে উঠে আসে জাল ডিসিআর। পূর্বতন সরকারের আমলে এই ডিসিআরের দৌলতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব লুট হয়েছে বলে অভিযোগ। পালাবদলের পর তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে
জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর। তাতেই চিচিংফাঁক! হাতেনাতে ধরে পড়ে যান দপ্তরের ভিতরে থাকা ‘বিভীষণ’রা। চেক গেটে বসে বিনা চালানে কিংবা ভুয়ো চালানে মাফিয়াদের গাড়ি পার করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে চারজন গ্রুপ-ডি কর্মীর বিরুদ্ধে। তাঁদের তড়িঘড়ি দূরের ব্লকে বদলি ও শোকজ করা হয়েছে। সূত্রের খবর, শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হলেই সাসপেন্ড। পালাবদলের পর পাঁচামী, রামপুরহাট, নলহাটি কিংবা রাজগ্রামের পাথর সাম্রাজ্যের দেদার লুটে লাগাম টানতে যৌথ অভিযানে নেমেছিল পুলিশ, ভূমি দপ্তর ও এমভিআই। ফলও মেলে আশানুরূপ। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তথ্য দিয়ে জানিয়েছিলেন, পাথর শিল্পাঞ্চল থেকে আগের জমানায় রাজস্ব বাবদ বার্ষিক মাত্র ৭ কোটি টাকা আসত। নতুন সরকারের দেড় মাসেই কোষাগারে এসেছে ৮৩ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল মাসে ১০০ কোটির ঘর ছোঁয়া। কিন্তু সেই সাধু উদ্যোগে জল ঢেলে দিচ্ছিল কিছু সরকারি কর্মীর মদতে চলা জাল ডিসিআর চক্র।
পুরনো আমলের কাগজের রসিদ এবং অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অভাবকে হাতিয়ার করেই চলছে এই জালিয়াতি। কম্পিউটার থেকে হুবহু আসলের মতো দেখতে রসিদ ছেপে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ১০ হাজার টাকার আসল ডিসিআরের বদলে মাত্র ২ হাজার টাকায় মিলছে এই জাল কাগজ। ফারাক শুধু সিরিয়াল নম্বরে। খালি চোখে তা ধরা অসম্ভব। লরি চেক পোস্টে আসার আগেই চালকদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে এই ভুয়ো রসিদ। পোস্টে ঢিলেঢালা নজরদারি আর কর্মীদের একাংশকে সন্তুষ্ট করেই রাতের অন্ধকারে পার পেয়ে যাচ্ছিল শত শত লরি। আধিকারিকদের আক্ষেপ, অনেক কর্মী নিজের পরিচিত ট্রাক মালিকদের গাড়ি চেক গেট থেকে পার করে দিচ্ছে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে। একবার গাড়ি গেট পেরিয়ে গেলে এই কাগজের রসিদ ঘেঁটে আর ধরার উপায় থাকে না।
তবে, প্রশাসনও এবার কোমর বেঁধে নেমেছে জাল ডিসিআর বন্ধ করতে। মহম্মদবাজার থানার পুলিশের জালে এক লরি চালক সহ দু’জন ধরা পড়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের জেরা করে এই চক্রের নেপথ্যে থাকা কিছু বড় মাথার হদিস মিলেছে। যাদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। একদিকে কর্মী সঙ্কট। অন্যদিকে ভেতরের ভূত—এই দুই কাঁটা উপড়ে রাজস্বের জোয়ার ধরে রাখাই এখন ভূমি দপ্তরের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেটা গ্রহণ করতে এবার জেলায় আসছেন ৩০ জন নতুন আধিকারিক। এর মধ্যে ১৫-১৬ জন রেভিনিউ ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার অফিসার। তাঁদের মোতায়েন করা হবে পাথর বলয়ের চেক গেটগুলিতে।