সৌমিত্র দাস, কাঁথি: হেরিটেজ ঘোষণার পর প্রায় তিনবছর হতে চলল। কিন্তু খেজুরিতে অবস্থিত দেশের প্রথম ডাকঘর সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়নি। এখন সেই ডাকঘরের অবশিষ্টাংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকার বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীরা। বিডিও উদয়শঙ্কর মাইতি বলেন, নিদর্শনটি সংস্কার ও সংরক্ষণের বিষয়ে কোনও নির্দেশিকা আসেনি। এলে প্রশাসন নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবে।
২০২২সালের ১৪সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে এরাজ্যের অন্য বেশ কিছু নির্দশনের সঙ্গে খেজুরির ২০০বছরের প্রাচীন ডাকঘরের ভগ্নাবশেষকে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়। হেরিটেজ কমিশনের এই ঘোষণায় ইতিহাসপ্রেমীরা খুশি হয়েছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, হেরিটেজের আওতায় আসায় ডাকঘরটি সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশনের প্রতিনিধিদল ভাঙা ডাকঘরটি পরিদর্শনের কিছুদিন পরই হেরিটেজ ঘোষণা হয়। কিন্তু তারপর থেকে এখনও অবধি সেটি সংস্কার বা সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেজুরিতে বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত এই ডাকঘরের চারপাশ ঝোপঝাড় ও আগাছায় ঢেকে গিয়েছে।
বনদপ্তরের বিট অফিসের পিছনের দিকে এখনও ডাকঘরের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। প্রতিদিনই এই নিদর্শন দেখতে পর্যটক সহ ইতিহাসপ্রেমীরা খেজুরিতে ভিড় জমান। কিন্তু ডাকঘরের পরিস্থিতি দেখে তাঁরা হতাশ হন। অবিলম্বে ডাকঘরটি সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি উঠেছে।
১৭৭২সালে তৎকালীন সমৃদ্ধ বন্দর খেজুরিতে দেশের প্রথম ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের যোগাযোগের সুবিধার্থে এটি চালু করেছিল। ১৮৯৪সাল পর্যন্ত এই ভবন থেকে নিয়মিত ডাকব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৮৬৫সাল পর্যন্ত ইউরোপিয়ানরা পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব সামলেছেন। এই ডাকঘরে শিপ পোস্টেজ ব্যবস্থাও চালু ছিল। দোতলা ভবনের একটি কক্ষে ১৮৫২সালের ৩০মার্চ দেশের প্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবস্থাও চালু হয়। লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠানামা করতে হতো। কিন্তু ঝড়ঝঞ্ঝা সহ নানা কারণে ডাকঘরটি ক্রমশ জীর্ণ হতে শুরু করে। তাই ১৯২০সাল নাগাদ অন্যত্র ডাকঘর স্থানান্তরিত হয়। পরিত্যক্ত ডাক ও টেলিগ্রাফ ভবনটি ১৯৪২সালের ১৬অক্টোবর ঘূর্ণিঝড়ে অনেকটাই ভেঙে যায়। সাতের দশকে ঘূর্ণিঝড়ে মূল ভবনটি ধ্বংস হয়। বছরের পর বছর ঝড়ঝঞ্ঝার জেরে ডাকঘরের প্রাচীন ভবন ও সংলগ্ন ১২কক্ষবিশিষ্ট ব্যারাকটি কবেই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। এখন সিঁড়িঘর ও ডাকঘরের সামনে প্রবেশপথের ভাঙা সিংহদ্বার তার সোনালি অতীতের স্মৃতি বহন করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন সিঁড়িঘরটিও ধ্বংস হতে বসেছে।
খেজুরি হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির যুগ্ম সহ-সম্পাদক সুমননারায়ণ বাকরা ও সুদর্শন সেন বলেন, হেরিটেজ ঘোষণার পর আমরা আশা করেছিলাম, এই নিদর্শনটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে কমিশন। কিন্তু তা হয়নি। এখানে একটি পোস্টাল মিউজিয়াম গড়ে তোলার দাবিও রয়েছে। প্রাচীন ডাকঘরটি সংস্কার হলে খেজুরির গুরুত্ব বাড়বে। অনেক পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ খেজুরিতে আসবেন। কবি অজিতকুমার জানা বলেন, সংরক্ষণ করে এখানে একটি মিউজিয়াম গড়া হোক।