Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাই সংবেদনশীলতা

কৈলাস থেকে সপরিবারে মা দুর্গা মর্তে আসছেন প্রায় এগারো মাস পর, এ মাসের শেষে। তাঁকে বরণ করে নিতে সাজ সাজ রব বাংলাজুড়ে। মায়ের আতিথেয়তায় কোথাও যেন সামান্য ত্রুটিও না থাকে, প্রায় শেষলগ্নে তারই প্রস্তুতি চলছে সর্বত্র।

চাই সংবেদনশীলতা
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কৈলাস থেকে সপরিবারে মা দুর্গা মর্তে আসছেন প্রায় এগারো মাস পর, এ মাসের শেষে। তাঁকে বরণ করে নিতে সাজ সাজ রব বাংলাজুড়ে। মায়ের আতিথেয়তায় কোথাও যেন সামান্য ত্রুটিও না থাকে, প্রায় শেষলগ্নে তারই প্রস্তুতি চলছে সর্বত্র। অন্য এক প্রস্তুতি চলছে উত্তর-পূর্বের পাহাড়ঘেরা ছোট্ট রাজ্য মণিপুরেও। তবে মায়ের জন্য নয়, এক স্বঘোষিত ‘অবতার’ বা ‘বিশ্বগুরু’র সম্ভাব্য আগমন উপলক্ষ্যে। লোকে তাঁকে জানে নরেন্দ্র মোদি নামে। শোনা যাচ্ছে, আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি মণিপুর সফর করবেন। মা আসছেন প্রায় এগারো মাস পরে, চার দিনের জন্য। হিংসাদীর্ণ মণিপুরে প্রধানমন্ত্রী মোদির যেতে সময় লেগে গেল ২৯ মাস! তাও কয়েক ঘণ্টার জন্য! এই ধরাতলে মা বিরাজ করবেন সর্বত্র। কিন্তু ‘ঈশ্বরের বরপুত্র’র সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। তাই কুকি অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর এবং ঐতিহাসিক কাংলা দুর্গে ভাষণ দিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করবেন মোদি। তবে সংক্ষিপ্ত হলেও যেন রাজসূয় যজ্ঞ শুরু হয়েছে। ইম্ফল বিমানবন্দর থেকে রাস্তাঘাটের সৌন্দর্যায়ন, কাংলা দুর্গে ত্রিভুজাকৃতি মঞ্চ তৈরি করা, রাস্তার ডিভাইডারে রঙের প্রলেপ, সাধারণ মানুষের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে মণিপুরের আকাশে-বাতাসে যেন মোদির ‘আগমনি’-র সুর বাজতে শুরু করেছে! 

Advertisement

অথচ ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মণিপুরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। একদিকে মেইতেই সম্প্রদায়, অন্যদিকে কুকি জনগোষ্ঠী। এই দুই জাতিগোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ২৯ মাস ধরে মণিপুরের স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত স্তব্ধ। গত প্রায় আড়াই বছরে সেখানে সংঘর্ষে অন্তত ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ঘরছাড়া অন্তত ৬০ হাজার মানুষ। এই পরিস্থিতির জন্য মণিপুরের বিজেপি সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বারবার। যার জেরে পদত্যাগ করতে হয়েছে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীকে। গত ছ’মাস ধরে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি রয়েছে। বারুদের স্তূপের উপর বিরাজ করছে আপাত শান্তি। অশান্ত মণিপুরের বিধ্বস্ত মানুষের পাশে একবার গিয়ে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রী— শুরু থেকেই এই দাবি উঠেছে সর্বত্র। তখন তাতে কর্ণপাত করেননি মোদি। বিরোধীদের অভিযোগ, গত ২৯ মাসে দেশে-বিদেশে কয়েক লক্ষ কিলোমিটার সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দিল্লি থেকে মণিপুরের ২৪০০ কিলোমিটার পথ যেতে রাজি হননি তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, মণিপুরে ফের বিজেপি সরকার তৈরি করতে এবার তৎপর হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তারই প্রস্তুতি হিসেবে মোদির এই সফর। কিন্তু ৬০ সদস্যের গত মণিপুর বিধানসভায় এনডিএ-এর ৪৪ জন বিধায়ক থাকলেও অভ্যন্তরীণ যাবতীয় বিবাদকে দূরে ঠেলে ফের সরকার গঠন করা আদৌ সম্ভব হবে কি না অথবা তা সম্ভব হলেও সেই সরকারের স্থায়িত্ব কতদিন থাকবে— তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবু সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে সম্প্রতি কুকি-জো গোষ্ঠীর দুটি সংগঠনের সঙ্গে ‘সাসপেনশন অব অপারেশন’ চুক্তি করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এর প্রেক্ষিতে যাত্রী ও পণ্য যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ২ নম্বর জাতীয় সড়ক খুলে দিতে সম্মত হয়েছে কুকি-জো কাউন্সিল। কিন্তু রাজ্যের বৃহৎ জনগোষ্ঠী মেইতেইরা এই চুক্তির তীব্র নিন্দা করে একে সংবিধান বিরোধী বলেছে। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, সংযুক্ত নাগা কাউন্সিল এই চুক্তির প্রতিবাদে সোমবার থেকে বাণিজ্য বয়কটের ডাক দিয়েছে। তাদের এই পদক্ষেপ গোটা পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারে। নাগাদের দাবি, ভারত-মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ বন্ধ করে অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। 
শান্তির বার্তা দিতে প্রধানমন্ত্রীর মণিপুর সফরের আগেই ‘রাজ্যের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে’ বোঝাতে মোদি সরকার চুক্তি করলেও তা কতটা স্থায়ী হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তার কারণ, এই চুক্তি আগেও ছিল এবং তার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। তাছাড়া ২ নম্বর জাতীয় সড়কে অবাধ যান ও পণ্য চলাচলের আশ্বাস দিলেও মেইতেই ও নাগাগোষ্ঠী তার বিরোধিতা করায় এর বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিশবাঁও জলে বলা যায়। আসলে গোটা রাজ্যেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। রাজ্যের নাগরিক সমাজও যেন এই বিভাজনের শরিক হয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ চূড়ান্ত রাজনৈতিক সঙ্কট, সরকারের অপদার্থতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রপতি শাসন এই ধারণাকে আরও সম্পৃক্ত করেছে। তাই মোদির কয়েক ঘণ্টার সফর, শান্তির বার্তা, কুকিদের সঙ্গে রাস্তা খোলার চুক্তি বা হয়তো আরও কোনও রঙিন প্রতিশ্রুতিতে মণিপুরের ‘রক্তক্ষরণ’ বন্ধ হওয়া মুশকিল। তাই মণিপুরের সমস্যাকে স্রেফ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইস্যু হিসেবে না দেখে মোদি-শাহদের ধৈর্য ধরে সংবেদনশীল অভিভাবকের মতো আচরণ করতে হবে। একমাত্র তাহলেই ছোট্ট এই সুন্দর পাহাড়ি রাজ্যে বসন্ত নেমে আসতে পারে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ