তাঁর ঝুলিতে ‘কৃতিত্বের দাবি’ নেহাত কম ছিল না। দ্বিতীয় দফায় মাত্র ন’মাস মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদে বসেছেন। আর আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ থামানোর দাবি ছিল অন্তত ৫০ বার! সর্বশেষ ইজরায়েলের সঙ্গে হামাসের শান্তিচুক্তির পর হোয়াইট হাউসের তরফে ট্রাম্পের একটি ছবি পোস্ট করে লেখা হয়— ‘দ্য পিস প্রেসিডেন্ট’। যুদ্ধ থামানো অথবা শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার এই ধারাবাহিক দাবির পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর বিষয়েও আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিচ্ছিলেন তিনি। ট্রাম্প ধরেই নিয়েছিলেন, এই ‘কৃতিত্ব’-র জন্য এবছর শান্তির নোবেল পুরস্কারটি পাওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। গত কয়েক মাসে বারবার বলেছেন, তিনিই নোবেলের ‘যোগ্যতম দাবিদার’। প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিছু না করেও যদি তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে পারেন, তবে তাঁকে কেন পুরস্কৃত করা হবে না? শুধু নিজে একা নন, ট্রাম্পের নোবেল প্রাপ্তির দাবি জানিয়ে গলা ফাটিয়েছিলেন আমেরিকার দোসর পাকিস্তান সহ একাধিক রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা। এই দাবিতে যোগ্য সংগত ছিল হোয়াইট হাউসের। এত আত্মপ্রচার, এত আত্মবিশ্বাস, তবু যেন অন্তরাত্মার ডাক তিনি শুনতে পেয়েছিলেন, ‘ওরা আমায় কিছুতেই নোবেল দেবে না। এটা কেবল উদারপন্থীদের দেওয়া হয়।’ দেখা গেল এটাই সত্য হল। প্রবল শক্তিধর ট্রাম্পকে দৌড়ে পিছনে ফেলে এবছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ইতিহাসে এমন নজির সম্ভবত বিরল, যেখানে জয়ীর চেয়ে পরাজিত ব্যক্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বেশি উঠে এসেছেন।
এবছর ট্রাম্পের ‘নোবেল’ পাওয়া ‘উচিত’ বলে যে দাবিই করুক আমেরিকা ও তার তাঁবেদাররা, তিনি কি সত্যিই ‘যোগ্যতম’ ব্যক্তি ছিলেন? এ বিষয়ে নরওয়ের নোবেল কমিটির বার্তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। বলা হয়েছে, কমিটির সদস্যরা যখন শান্তি পুরস্কারের জন্য কারও নাম বিবেচনা করেন, তখন তাঁরা শুধু অ্যালফ্রেড নোবেলের দেখানো পথই অনুসরণ করেন। তা হল— সাহস। এবছরের নোবেল জয়ী সেই সাহস দেখিয়েছেন। ‘ইট ওয়াজ এ চয়েজ অফ ব্যালটস ওভার বুলেটস’—বলেছেন নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান। শান্তির দূত মারিয়া মাচাদো যেন এ কথারই প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছেন। তাঁর হাতে নোবেল তুলে দেওয়ার কারণ হিসাবে নোবেল কমিটি বলেছে, ‘ভেনিজুয়েলার বিরোধীদের একজোট করে দেশটিকে শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানোর জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হল নেত্রীকে’। বলা যায়, এক্ষেত্রেও গণতন্ত্রেরই জয় হল। এই ঘোষণায় স্পষ্টতই হতাশ ট্রাম্প নিজে কিছু না বললেও ক্ষুব্ধ হোয়াইট হাউস বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘আবারও নোবেল কমিটি প্রমাণ করল যে তারা শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।’ ট্রাম্পের নোবেল না পাওয়ার পিছনে একাধিক কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এক, যুদ্ধ থামানো বা শান্তি স্থাপনের যে দাবি করছে ট্রাম্পবাহিনী, তার প্রায় কোনওটাই শান্তিপূর্ণ পথে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে হয়নি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পারস্পরিক বাণিজ্য ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারির হুঁশিয়ারি, বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে কোনও একপক্ষকে সমরাস্ত্র সাহায্য দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল, যুদ্ধরত কোনও দেশকে ঘিরে ফেলার হুমকি দিয়ে কাজ হাসিল করতে চেয়েছেন ট্রাম্প। করেছেন ‘দাদাগিরি’। এককথায় ক্ষমতার ভয় দেখানো। দুই, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে গোটা বিশ্বকে বিপদে ফেলেছেন ট্রাম্প। তিন, বর্তমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে এসে বিশ্বকে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। সঙ্গতকারণে নোবেল তাই তাঁর অধরাই থেকেছে।
তবে হতাশা ঝেড়ে ফেলে পরের বছরের জন্য আবার প্রস্তুতি শুরু করতেই পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বাঙালির চেনা লব্জ ধার করে হোয়াইট হাউস বলতেই পারে, ‘আসছে বছর আবার হবে’। কারণ এবছর নোবেলের দাবি জানিয়ে আবেদনের শেষদিন ছিল ৩১ জানুয়ারি। ঘটনা হল, তার ১১ দিন আগে প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসেন ট্রাম্প। ফলে যুদ্ধ থামানো বা যুদ্ধ বিরতি ঘটিয়ে শান্তিচুক্তি স্থাপনে তাঁর লম্বা হাত থাকার যে দাবি করছেন ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস, এবারের বায়োডাটায় তার উল্লেখ ছিল না। ২০২৬-এ মনোনয়নপত্র জমা দিলে সেইসব দাবি করার সুযোগ মিলবে। তখন মিলিলেও মিলিতে পারে অমূল্য রতন। আরও জোরালোভাবে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় ট্রাম্প বলতে পারেন, এবার ফিরাও মোরে...। অতএব ‘যোগ্য’ দাবির লড়াই জারি থাকুক। নোবেল কমিটিও আরও একবার তাঁর সাহস ও সততার অগ্নিপরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাবে।