বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: পুজোর লড়াইয়ে জমে উঠেছে বরানগরের শারদীয়া উৎসব। ডার্বি ম্যাচের মতো উদ্বোধনের আগেই প্রতিযোগিতার আবহ। পরস্পরের বিরুদ্ধে তাল ঠুকছে নেতাজি কলোনি লোল্যান্ড আর ন’পাড়া দাদাভাই সংঘ। মণ্ডপের সাজসজ্জা নিয়ে এখন মুখে কুলুপ দু’পক্ষের শিল্পী ও উদ্যোক্তাদের। বিনয়ের সঙ্গেই তাঁরা বলছেন, ‘উদ্বোধনের জন্য কিছুটা তোলা থাক।’ কমিটির তরফে এইটুকু শুধু জানা যাচ্ছে যে, মনোমুগ্ধকর থিম বা প্রতিমার আকর্ষণ শুধু নয়, আলোর কারিকুরিতেও মানুষকে চমকে দিতে কোমর বাধছে দুই পুজো।
২২তম বর্ষে পা দেওয়া ন’পাড়া দাদাভাই সংঘের এবার থিম ‘টান’। মুন্সিয়ানার সঙ্গে মণ্ডপজুড়ে সম্পর্কের বিনি সুতোর মালা বুনছেন শিল্পী। মণ্ডপের সামনে বাঁশের কাঠামোর পাশে রাখা নানান মাপের নৌকা। মোটা দড়ি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে প্রতিটি বাঁশকে। তার মাঝে নৌকায় থাকা যাত্রীরা জানান দেবেন, জীবন বৈতরণীর। এরপর লম্বা গলি পথ। তা ধরে এগতে হবে মূল মণ্ডপের দিকে। গলিপথে ফুটে উঠবে ‘ওরলি’ চিত্রকলা। মূল মণ্ডপে ঢুকলে নজরে আসবে বিশালাকার দুই বহুতল। আর পায়রার খোপের মতো ছোট ছোট ফ্ল্যাট। প্রতীকী অর্থে তা একান্নবর্তী জীবনের বদলে একা থাকা, নিঃসঙ্গ পরিবার আর যন্ত্রণা। দুই বহুতলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে একের পর এক সিঁড়ি। যা সমাজবদ্ধ হয়ে বাঁচার মন্ত্র দেবে। মণ্ডপের দ্বিতীয় ভাগে গুরু-শিষ্য, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্রের মতো একাধিক সম্পর্কের মডেল। নারী আছেন সুতোর ভূমিকায়। তিনিই আগলে রাখবেন সম্পর্কগুলি। মূল মণ্ডপ সাজছে দুর্গার প্রিয় হাজার হাজার পদ্মফুলে। ২০ ফুটের মাটির দুর্গা। তাঁর রূপে ফুটে উঠবে ছেলে-মেয়ের সঙ্গে মায়ের নাড়ির টানের সম্পর্ক। শিল্পী তাপসী মুখোপাধ্যায় ও সন্দীপ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। তাঁরা বলেন, ‘জীবনের সমস্ত ধরণের সম্পর্কের টান মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে’। পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক অঞ্জন পাল বলেন, ‘সম্পর্ক শুধু রক্তের হয় না। হৃদয়েরও হয়। জীবনের বিভিন্ন সম্পর্কের অদৃশ্য অথচ গভীর টান মণ্ডপে উপলব্ধি করবেন দর্শনার্থীরা।’
ন’পাড়ার যুযুধান নেতাজী কলোনি লোল্যান্ড সর্বজনীন দুর্গোৎসব প্রত্যেকবারই চমক রাখে। বিশাল জলাশয় লাগোয়া মণ্ডপ ও আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের মোহিত করে। এবার তাদের থিম ‘বাংলার মুখ’। সবংয়ের মাদুর, পিংলা ও কালীঘাটের পট, উত্তরবঙ্গের বেতের শিল্প, পুরুলিয়ার চড়িদার মুখোশ, বিষ্ণুপুর পাঁচমুড়ার টেরাকোটার মূর্তির মেলবন্ধনে মণ্ডপে শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। বিশালাকার মণ্ডপের বাইরে পটের দুর্গা দর্শনার্থীদের জন্য বড় চমক। মণ্ডপে ঢুকে প্রতিমা দর্শনের আগে পটচিত্রে দেখা যাবে সপরিবার মাকে। দুর্গার হাতে বিশালাকার চাঁদমালা। সেখানে ফুটে উঠবে বিষ্ণুর অবতার। মণ্ডপে প্রবেশ করলে বাংলার একান্ত নিজস্ব শিল্পকলা। ডোকরা শিল্প ও আলপনার মিশেলে চমৎকৃত হতে হবে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি। পরের ধাপে পৌঁছলে চোখে পড়বে, বিশালাকার মহীরুহ। তারই লতাপাতায় ঢেকে থাকবে মণ্ডপ। সেখানে ডোকরা শিল্পের আদলে দুই দিকে থাকবে দুর্গাপ্রতিমা। এক দুর্গার হাতে থাকবে অস্ত্র, অন্যের হাতে থাকবে গৃহস্থালির সামগ্রী। বাংলার প্রতিটি ঘরের সংসার সামলানো দুর্গার লড়াই প্রত্যক্ষ করা যাবে। এরপর মূল মণ্ডপে মা আসবেন থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। ১৪ ফুটের প্রতিমা বড় আকর্ষণ। শিল্পী সৌরভ দত্ত বলেন, ‘বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির গভীরতা মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’ পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক দিলীপনারায়ণ বসু বলেন, ‘বাস্তবে বাংলার রূপ সুধা মণ্ডপের ছত্রে ছত্রে প্রকাশ করা হয়েছে। সম্পর্কের বিনি সুতোর গল্প টান। বাংলার নিজস্ব শিল্প সংস্কৃতির গর্বের উত্তরাধিকারের কাহিনি।’