Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঞ্চনা অব্যাহত

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, দুর্নীতি রুখতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে প্রয়োজনে কোনও শর্ত দিতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সমগ্র প্রকল্পটিকে বন্ধ রাখা যাবে না।

বঞ্চনা অব্যাহত
  • ৩ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, দুর্নীতি রুখতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে প্রয়োজনে কোনও শর্ত দিতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সমগ্র প্রকল্পটিকে বন্ধ রাখা যাবে না। ১ আগস্ট থেকে ১০০ দিনের কাজ আবার চালু করতে হবে। আদালতের এই নির্দেশে কর্ণপাত করেনি মোদি সরকার। ফলে পরিস্থিতি যা ছিল তাই আছে। ২০২২ সালের ৯ মার্চ থেকে এ রাজ্যে ১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রের অর্থ বরাদ্দ বন্ধই থেকেছে। এর প্রতিবাদে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়তো হতে চলেছে। কিন্তু এই ঘটনায় কেন্দ্রের সদিচ্ছা নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। ১০০ দিনের কাজে যে কোনও কোনও জেলায় অনিয়ম হয়েছে, তা কোনও গোপন কথা নয়। দুর্নীতির তদন্তে হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, মালদহ ও দার্জিলিং—এই চারটি জেলার নাম উঠে  এসেছিল। অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু টাকা উদ্ধারও করা হয়। গত সাড়ে তিন বছরে কেন্দ্রের নির্দেশে একাধিকবার নিজেদের ভুল শুধরে নেয় রাজ্য সরকার। তবু কাজ বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার! তাই প্রশ্ন উঠেছে, আসলে কী চায় কেন্দ্র? কারণ আদালত বলেছিল, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা যায়। কেন্দ্র চাইলে অভিযুক্ত চারটি জেলায় যেসব ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে তাদের বাদ দিয়ে ১০০ দিনের কাজ চালু করতে পারে। রাজ্য সরকারের উপর নতুন করে কোনও শর্ত চাপাতে পারে। কিন্তু যারা কাজ করতে পারছে না বা কাজ করেও প্রাপ্য পাচ্ছে না—তাদের কেন ফল ভুগতে হবে? কেন তাদের কাজ আটকে রাখা হবে? কেন্দ্রকে আদালত মনে করিয়ে দেয়, মনরেগা আইনে কোথাও বলা নেই, বেনিয়ম বা দুর্নীতি হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে। কিন্তু আদালতের এই পর্যবেক্ষণ, নির্দেশ কোনও কিছুই যে কেন্দ্র গায়ে মাখেনি, ১ আগস্ট প্রকল্পের কাজ চালু না হওয়াটাই তা জানান দিচ্ছে।

Advertisement

আদালতের নির্দেশের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার অর্থ, দুর্নীতির কারণ দেখিয়ে বছরের পর বছর কাজ বন্ধ রাখাটা আসলে মস্তবড় ‘অজুহাত’। কারণ আরও বড় আকারে এই একই অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ১০০ দিনের কাজের অর্থ বরাদ্দ একদিনের জন্যও বন্ধ করা হয়নি। অথচ বছরের পর বছর ধরে বাংলার প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণ চলছে। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হল, গত ২২ জুলাই সংসদে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান লিখিতভাবে জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভুয়ো জবকার্ড মিলেছে বিহারে ৮১১১টি, ওড়িশায় ৭৫৬৬টি, অসমে ৭৩৪১টি, ছত্তিশগড়ে ৬৮৮৮টি, উত্তরপ্রদেশে ৩৪২১টি, মহারাষ্ট্রে ১৪০১টি, গুজরাতে ৯৮৮টি, মধ্যপ্রদেশে ৮০৪টি, ত্রিপুরায় ২৮৩টি। আর পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ২টি। অথচ টাকা দেওয়া বন্ধ রয়েছে একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে! বাকি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ একাধিক রাজ্য ব্যাপক দুর্নীতি করেও কেন্দ্রের বরাদ্দ পেয়ে চলেছে সমানে। কই তাদের তো বরাদ্দ আটকে রাখা হয়নি! এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, আসলে দুর্নীতিটা প্রকৃত কারণ নয়। আসল উদ্দেশ্য, রাজনৈতিকভাবে এঁটে উঠতে না পেরে এ রাজ্যকে ভাতে মারতে চাইছে মোদি সরকার। কারণ ১০০ দিনের কাজে যুক্ত থাকেন মূলত গরিব খেটে খাওয়া মানুষ। অভিযোগ, তাদের পেটে লাথি মেরে রাজ্য সরকারকে জব্দ করতে চাইছে কেন্দ্র!
তবু কিন্তু এ রাজ্যের মানুষকে ভাতে মারা যাচ্ছে না। কেন্দ্র ১০০ দিনের কাজ আটকে রাখলেও তার বিকল্প হিসাবে ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্প চালু করেছে রাজ্য সরকার। সেই প্রকল্পে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ৮৩৩৩ কোটি টাকা খরচ করে ৫৮ দিন কাজের ব্যবস্থা করেছে বাংলার সরকার। চলতি অর্থবর্ষে এখনও পর্যন্ত ১০০০ কোটি টাকা খরচ করেছে রাজ্য। এভাবেই গরিব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে রাজ্য সরকার। সরকারের এবারের লক্ষ্য ৬৫-৭০ দিন কাজের ব্যবস্থা করা। গত বছর ৭৫ লক্ষ কার্ড গ্রাহকের নামে নথিভুক্ত হয়েছিল। ৪৩ কোটি শ্রমদিবস তৈরি হয়েছিল এ রাজ্যে। এবারের সংখ্যাটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রবল। এই পরিসংখ্যান ও উদ্যোগ বুঝিয়ে দিচ্ছে, একটা সরকারের (কেন্দ্র) লক্ষ্য গরিব মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া, আর আরেকটি সরকারের (রাজ্য) লক্ষ্য, গরিবের হাতে কাজ তুলে দেওয়া। ১০০ দিনের কাজ অথবা গ্রামীণ আবাস যোজনা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থা করে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার জবাব দিচ্ছে নবান্ন। কিন্তু সীমিত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে এই বাড়তি চাপ কতদিন বহন করা সম্ভব? তারচেয়েও বড় কথা হল, কেন একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও বিকল্প উপায় করতে সেই দায়িত্ব কোনও রাজ্য সরকারকে নিতে হবে? এর উত্তর জানা থাকলেও প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত আদালত অবমাননার মামলা হলে কেন্দ্রকে তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা যায় কি না— এখন তারই অপেক্ষা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ