হাড় হিম করা ২৬/১১-এর পর তৈরি করা হয়েছিল ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বইয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিপ্রদান। আমরা জানি, ওই ভয়ংকর নাশকতা ঘটিয়েছিল পাকিস্তানের মদতপুষ্ট লস্কর-ই-তোইবা। সেদিনের সিরিয়াল অ্যাটাকে অন্তত ১৬৬ জন নিহত হন এবং জখম হন বহু নরনারী, তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিদেশিরাও। হতাহতের ঘটনাগুলি ঘটেছিল তাজমহল প্যালেস হোটেল, ওবেরয় ট্রাইডেন্ট, লিয়োপোল্ড কাফে এবং ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস রেল স্টেশনে। ২০০৮ সালে সংঘটিত এই প্রায় বেনজির কাণ্ডের তদন্তের জন্য যে ধরনের আইনি পরিকাঠামো জরুরি, প্রচলিত ব্যবস্থায় তা যথেষ্ট ছিল না বলেই মনে করেছিল তৎকালীন সরকার। এজন্যই জরুরি ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল এনআইএ অ্যাক্ট, ২০০৮ এবং ওইবছর ৩১ ডিসেম্বর গঠন করা হয়েছিল এনআইএ নামক প্রেমিয়ার ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি। অর্থাৎ এনআইএ যেমন তেমন কোনো সংস্থা নয়, এর কাজের পরিধি অনেক গভীর। বিশেষত বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র প্রভৃতি নিয়ে যারা রাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা করছে, সেই ভয়ংকর শক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের দরজায় দ্রুত হাজির করাই ছিল এনআইএ গঠনের উদ্দেশ্য। এটি একটি কাউন্টার-টেররিজম ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি। ভারতে সংঘটিত নাশকতার ক্ষেত্রে যেসব আন্তঃরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক মামলা হয়ে থাকে সেগুলিরই তদন্তের দায়িত্ব এই কেন্দ্রীয় এজেন্সির উপর বর্তায়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আওতায় এই সংস্থা ২০০৯ সাল থেকে কাজ শুরু করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এদের সাফল্য আশাপ্রদ নয়। সিবিআই, ইডি প্রভৃতির মতোই দেশকে ধারাবাহিকভাবে হতাশ করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সিও। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলসহ জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা হরণ করেছে মোদি সরকার। ওই রাজ্যকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্তরেও নামিয়ে আনা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহদের যুক্তি ছিল, ভূস্বর্গে পাকিস্তানের ছায়াযুদ্ধ বা জঙ্গি কার্যকলাপ বন্ধ করতে এটাই সেরা পদক্ষেপ। এটা অনেক আগেই করা দরকার ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের ভ্রান্ত রাজনীতির কারণেই এটা আটকে ছিল এতদিন। পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড গেরুয়া পক্ষের এই রাজনীতিকে ব্যর্থ প্রমাণিত করেছে। এমনকি কাশ্মীর নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি দূর হয়নি, এখনো আশ্বস্ত বোধ করেন না পর্যটকরা। শুধু কাশ্মীর নয়, মণিপুরসহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতেই বহু কাজ করার রয়েছে এনআইএ-র। কিন্তু তাদের সেই কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলেই মনে হয়। এনআইএ-র মতো একটি দারুণ কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার করে চলেছে মোদি সরকার। ঠিক যেমন সিবিআই, ইডি, ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট প্রভৃতির অন্যায় ব্যবহার চলেছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে মোদিবাবুরা ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক বিরোধীদের শায়েস্তা করার মতলবে। বিশেষ করে যাঁরা গেরুয়া শিবিরের মেরুকরণের রাজনীতি এবং দিল্লির জনবিরোধী শাসনের মোকাবিলায় প্রাণপাত করছেন, তাঁদেরকে জব্দ করতেই মরিয়া মোদি ও তাঁর সম্প্রদায়।
বলা বাহুল্য যে, এই প্রশ্নে বিজেপি ও মোদি সরকারের পয়লা নম্বর টার্গেট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁদের মা-মাটি-মানুষের সরকার। তাই এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমেই টার্গেট করা হয়েছে বাংলার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকটাকে। অতঃপর ধারাবাহিকভাবে চলেছে একাধিক কেন্দ্রীয় এজেন্সি লেলিয়ে দিয়ে বহু লড়াকু তৃণমূল নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে তাদের ভোট ম্যানেজারদের নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র। এমন অপপ্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এনআইএ-র মতো এজেন্সিকেও। ভাবা যায়, বুধবার বাংলায় দ্বিতীয় তথা শেষদফা ভোটগ্রহণের দিন এনআইএ-কে সুতলি বোমা (পেটো) খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! মশা মারতে কামান দাগার এর চেয়ে নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে? ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিকে সবচেয়ে নীচে নামিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এনআইএ-সহ সমস্ত কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার তার সঙ্গেই যথার্থ সংগত করল বললে কোনো ভুল হবে না। এটা কেবল স্বশাসিত সংস্থার রাজনীতিকরণের দৃষ্টান্ত নয়, সংস্থাগুলির দক্ষতা জলাঞ্জলি দেওয়ার মহাপাপও বটে!