সম্প্রতি কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং মরক্কোয় এক সভায় মন্তব্য করেন, ‘পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণই মূল কাশ্মীরের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে আন্দোলনে নামবে।’ তার মাত্র তিনদিন পরই পাক অধিকৃত কাশ্মীর জ্বলতে শুরু করেছে। শাহবাজ-মুনির জুটির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন তীব্র আকার নিয়েছে একাধিক জেলায়। বিভিন্ন মিছিল থেকে আওয়াজ উঠেছে, খুনি প্রশাসন নিপাত যাক, মানুষখেকো পুলিশ সেনা হায় হায়! স্বভাবতই অপারেশন সিন্দুরে বিপর্যস্ত প্রশাসন এতে সিঁদুরে মেঘ দেখতে পেয়েছে। বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করতে প্রশাসন সেখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছে বিপুল সংখ্যক ট্যাঙ্ক। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল মাহেন্দ্রক্ষণটি। মাত্র শুক্রবারই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ভারতের বিরুদ্ধে বিষ উগরে দিয়েছিল পাকিস্তান। উপর্যুপরি মিথ্যাচার করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এমনকি, ভারতের কাশ্মীরকে ‘আজাদ’ করারও ডাক দিয়েছিলেন তিনি। আর সেদিনই ট্রাম্প-মুলুকে বসে মিলেছে দুঃসংবাদ: জ্বলছে তাঁরই হাতে বন্দি কাশ্মীর! সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্রোহ—দিকে দিকে। বালুচিস্তানের বিদ্রোহী নেতা মির ইয়ার বালোচ সেদিনই পালটা আক্রমণ করেছেন। শরিফের রাষ্ট্রসংঘের ভাষণকে নস্যাৎসহ তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতি, পাক সেনা স্রেফ বন্দুক উঁচিয়েই অধিকৃত কাশ্মীর এবং বালুচিস্তান আটকে রেখেছে। এই দুই ভূখণ্ড কোনোভাবেই পাকিস্তানের অংশ থাকতে চায় না।
বস্তুত জেন জি বিদ্রোহের পদধ্বনি এবার পাকিস্তানেও! শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের পর যেন পাকিস্তানের পালা। নেপালে সরকার বদলের মাত্র দু-সপ্তাহের মধ্যেই পাক অধিকৃত কাশ্মীরে গণবিদ্রোহের পদধ্বনি। অন্তত চারটি শহরে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ। প্রাথমিকভাবে মূলত স্কুল-কলেজের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। পাশাপাশি চাকরির দাবিতে কর্মহীন যুবসমাজও। চতুর্দিকে শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভ। কারণ? সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর অকারণ অত্যাচারে তারা অতিষ্ঠ। যখন তখন যাকে তাকে গ্রেফতারি এবং দমনপীড়নমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ফুঁসছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর। শনিবার সকালে কোটলি এলাকায় ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ মিছিলে গুলি পর্যন্ত চালিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। সব মিলিয়ে পাক অধিকৃত কাশ্মীর ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কোন সময়? শরিফ যখন একেবারে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ভারতের ‘উগ্র হিন্দুত্ব’ নিয়ে বিষোদ্গারসহ পাকিস্তানকে ‘স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে তুলে ধরতে মরিয়া সেদিনই তাঁর দেশের কঙ্কালসার চেহারা বেআব্রু হল। এই ঘটনায় শরিফের সঙ্গে সমান উদ্বিগ্ন তাঁর ত্রাতা ‘ফেইল্ড মার্শাল’ মুনিরও। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পাক সরকার। নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়েছে দেশি-বিদেশি মিডিয়া প্রতিনিধিদের উপরেও। বলা হয়েছে কোনও বিদেশি সাংবাদিক রাস্তায় বেরোবেন না। এমনকি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাক অধিকৃত কাশ্মীর ছেড়ে যেতেও বলা হয়েছে তাঁদের। সেখানে আরও বড়ো কোনও বিপর্যয়ের আশঙ্কা কি চরমে? প্রশাসনের বজ্রআঁটুনিতে সেই ইঙ্গিতই কিন্তু স্পষ্ট। আসলে ‘অপারেশন সিন্দুরে’ পর্যুদস্ত পাকিস্তান আর কোনোরকম ঝুঁকি নিতে নারাজ। অন্যদিকে, পাবলিক অ্যাকশন কমিটিও পালটা অবস্থানে অনড়, তাদের বিক্ষোভ বহুবর্ধিত হচ্ছে নানাদিকে। রবি ও সোমবার পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট ডেকেছিল তারা। পুলিশ বিভাগ, সরকারি দপ্তর এবং হাসপাতালে ছুটি বাতিল ঘোষণা করেছে উদ্বিগ্ন প্রশাসন। পরিস্থিতি বাগে আনতে নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) থেকে মুজফ্ফরাবাদে দু-হাজার প্লাটুন পাক সেনা এবং রেঞ্জার্স বাহিনীকে পাঠানো হয়েছে।
এবার হলফ করে বলা যায়, ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’-এর পক্ষে আর সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। মুম্বই হামলা থেকে পহেলগাঁও গণহত্যার নায়কদের নষ্টামির দিন খুব শিগগিরই শেষ হবে। পাকিস্তান একই অঙ্গে সন্ত্রাসবাদের জন্মদাতা, পালনকর্তা ও রপ্তানিকারক। দেশটির এই ত্রিমূর্তিই এবার সংহার রূপ নেবে আত্মধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে। শরিফ-মুনির জুটি তার জন্য দ্রুত প্রস্তুত হতে পারেন। সমস্ত ‘অমীমাংসিত’ ইশ্যুতে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পাকিস্তান প্রস্তুত বলে রাষ্ট্রসংঘে দাবি করেন শরিফ। তবে সেটা পাক অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার বাইরে কিছু হতে পারে না বলেই মনে করে ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে এটাই ভারতের মূল অমীমাংসিত বিবাদ। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণও তাই মনে করে। পাকিস্তানের দুঃশাসনমুক্ত হতে বরাবরই মরিয়া তারা। শান্তিকামী মানুষের এই দাবি পাকিস্তান যত দ্রুত মেনে নেয় ততই তাদের মঙ্গল, অন্যথায় পাক মানচিত্র জুড়ে আরও কাটাকুটি খেলা চলতে পারে। দেশটির এই অসহায় ছবি তার ‘কনিষ্ঠ সহোদর’ বাংলাদেশের জন্যও কিছু শিক্ষা রেখে যাচ্ছে না কি? কী ভাবছে এই দুই দেশের মুরুব্বি আমেরিকা? ট্রাম্প সাহেবের দেশের শুধু মুখেই শান্তি, গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের বুলি, বাস্তবে তারা যুদ্ধবাজদের দোসর। তৃতীয় বিশ্বে তাদের অস্ত্রবাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধির অধিক কিছুই ভাবতে নারাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনেরও অস্বস্তি বাড়াবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।