বিন্ধ্য পর্বতের এপার আর ওপার। উত্তর আর দক্ষিণ। সেই প্রাচীন কাল থেকেই নানাবিধ ইস্যুতে এই দুই অংশের বিরোধ। প্রাচীন কালে রাজা-মহারাজারা দাক্ষিণাত্য অভিযান করতেন। এখন সেই অভিযানের চরিত্র বদল হয়েছে। দক্ষিণের অভিযোগ, কৌশলে উত্তরের শাসন জারি করার চেষ্টা হচ্ছে। ইস্যু জনগণনার মাধ্যমে আসন সংরক্ষণ।
জনগণনা চলতি বছরে হবে কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে বাজেটে যে ভাবে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তাতে এই কাজ চলতি বছরে হবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারই ঘোষণা করেছিল জনগণনা ও এনপিআরের কাজ শেষ করতে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা দরকার। সেখানে গত ১ ফেব্রুয়ারি বাজেট প্রস্তাবে আগামী অর্থবর্ষের জন্য মাত্র ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ যাই হোক না কেন, আজ না হোক কাল জনগণনার দিকে যেতেই হবে। কারণ ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস।
আসন পুনর্বিন্যাস কী? জনসংখ্যার আনুপাতিক হিসেবে যখন সংসদীয় বা বিধানসভার সীমানা পরিবর্তন হয়, তখন তাকে বলে আসন পুনর্বিন্যাস। এর ফলে মোট আসন সংখ্যার বৃদ্ধি বা হ্রাসও হতে পারে। মূলত জনসংখ্যার পরিবর্তনই এই আসন পুনর্বিন্যাসকে চিহ্নিত করে। বিধানসভা বা লোকসভা কেন্দ্রের এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত ও যথাযথ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সম্ভব। শুধু তাই নয়, কতগুলি আসন তফসিলি জাতি বা উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, সেটির জন্যও জনগণনা হওয়া দরকার। অর্থাৎ এককথায় এই আসন বিন্যাসের মাধ্যমে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
আমাদের দেশে প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১ সালে। স্বাধীনতার পর সেটিই ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আসন সংখ্যা ছিল ৪৮৯। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫২ সালে গঠিত হয় বাউন্ডারি বা ডিলিমিটেশন কমিশন। ১৯৫১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে হয়েছিল দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। লোকসভার আসন নির্ধারিত হয়েছিল ৪৯৪টি। জনগণনায় বলা হয়েছিল দেশের জনসংখ্যা ৩৬ কোটির সামান্য বেশি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ জনসংখ্যা পিছু এক একটি আসন নির্ধারিত হয়েছিল। ১০ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬১ সালে আবার জনগণনা হয়। সেবারের গণনায় স্বাভাবিকভাবে ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তথ্য বলছে, জনসংখ্যা ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৪ কোটি। যেহেতু লোকসংখ্যা বেড়ে যায়, নিয়ম মেনেই লোকসভার আসন বৃদ্ধি পায়। পরের নির্বাচনেও দেশে আসন সংখ্যার হেরফের হয়নি। দেশে দ্বিতীয় বাউন্ডারি কমিশন গঠিত হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৭ সালের লোকসভার আসন বেড়ে হয়েছিল ৫২২টি। অর্থাৎ প্রতি সাড়ে আট লক্ষ জনগণ পিছু একটি লোকসভার আসন। তৃতীয় তথা শেষবার জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেবারের জনগণনায় বলা হয় দেশের জনসংখ্যা প্রায় ৫৫ কোটি। তার ভিত্তিতেই প্রতি ১০ লক্ষ মানুষ পিছু একটি লোকসভা আসন বরাদ্দ হয়। ১৯৭৭ সালে লোকসভার আসন বেড়ে হয় ৫৪২। তারপর থেকে আসন সংখ্যায় আর বড় কোনও পরিবর্তন হয়নি। আমাদের সংবিধানের ৮২ ও ১৭০ অনুচ্ছেদেই বলা আছে, প্রত্যেকবার জনগণনার ভিত্তিতে আসন সংখ্যা ও তার সীমানা নির্ধারিত করতে হবে। এই কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করা হয়। অনুচ্ছেদ ৮২-তে বলা হয়েছে, সীমানা ও লোকসভার আসন সংখ্যা নির্ধারণে প্রতিবার জনগণনার পরে ডিলিমিটেশন আইন পাশ করাবে সংসদ। আর ১৭০ অনুচ্ছেদে রাজ্যের বিধানসভা ক্ষেত্রগুলির সীমানা ও আসন সংখ্যা পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। ভারতে শেষবার ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করা হয়েছিল ২০০২ সালে। কিন্তু আসন সংখ্যা সেই অনুযায়ী পরিবর্তন হয়নি।
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই জরুরি অবস্থা চলাকালেই ১৯৭৬ সালে দেশে ৪২ তম সংবিধান সংশোধনী পাশ হয়। সেই সময় ইন্দিরার সরকার পরিবার পরিকল্পনায় জোর দিয়েছিল। এসেছিল হাম দো হামারে দো স্লোগান। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণই ছিল সেই সময় সরকারের মূল লক্ষ্য। আর সেটা করতে গিয়েই জনসংখ্যার নিরিখে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের যে সাংবিধানিক বিধি ছিল, তাকে হিমঘরে পাঠিয়ে দেন ইন্দিরা। সংবিধান সংশোধন করে বলা হয়েছিল পরিবার পরিকল্পনাকে উৎসাহ দিতে ২৫ বছরের জন্য আসন পুনর্বিন্যাসের কাজ স্থগিত রাখা হবে। অর্থাৎ, ২০০১ সালের জনগণনার আগে আর নতুন করে আসন সংখ্যা হেরফেরের যাবতীয় সম্ভাবনা স্থগিত রাখা হয়। আবার ২০০১ সালে ৮৪ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আরও ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের পর জনগণনার ভিত্তিতে বাউন্ডারি কমিশন নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস করবে। গোল বেঁধেছে এখানেই।
দক্ষিণের রাজ্যগুলি সিঁদুরে মেঘ দেখছে। তাদের দাবি, হয় ১৯৭১- সালের জনগণনার ভিত্তি, নাহলে অন্য কোনও উপায়। এরজন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারীর বাজপেয়ির বক্তব্যও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সুর চড়িয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন। তাঁর সাফ কথা, ডিলিমিটেশন হলে রাজ্যের ভাগের আসন কমে যাবে। এমনকী জরুরি ভিত্তিতে সন্তান বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি। স্ট্যালিনের সুরেই কথা বলেছেন তেলেঙ্গানার ভারত রাষ্ট্র সমিতির কার্যকরী সভাপতি কে টি রামা রাও। তাঁরও অভিযোগ, শুধু জনগণনার ভিত্তিতে সীমানা চিহ্নিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেলেঙ্গানা সহ দক্ষিণের রাজ্যগুলি। কারণ এই রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে যথাযথভাবে পালন করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অবশ্য এই ধারণাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ডিলিমিটেশন
হলেও দক্ষিণের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা কমবে না। কিন্তু অমিত শাহ যেটা বলছেন না, সেটা হল আসন পুনর্বিন্যাস হলে উত্তরের প্রাধান্য নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কেরলের সিপিএম নেতা এম এ বেবির বক্তব্য, অমিত শাহ যদি এতই আত্মবিশ্বাসী হন, তাহলে তিনি কেন সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বৈঠক করছেন না। তিনি দক্ষিণের রাজ্যগুলির উদ্বেগের বিষয়টি বৈঠকে খোলসা করে জানান।
কেন উদ্বেগ দক্ষিণের? তথ্য বলছে, যদি জনগণনার ভিত্তিতেই আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়, তবে সামগ্রিক লোকসভা আসনের নিরিখে দক্ষিণের আসন কমবে ১৯ শতাংশের মতো। অন্যদিকে উত্তরের বিশেষ করে হিন্দি বলয়ের আসন বাড়বে প্রায় ৬০ শতাংশ। মনে করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে দেশের জনসংখ্যা হবে ১৪১ কোটি। সেই নিরিখে হবে আসন পুনর্বিন্যাস। এমনিতে আসন সংখ্যার নিরিখে দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। এখন তাদের আসন সংখ্যা ৮০। সব ঠিক থাকলে ডিলিমিটেশনের ফলে আসন বেড়ে হতে পারে ১২৮। আবার বিহারের এখন আসন ৪০। সেটা বৃদ্ধি পেয়ে হতে পারে ৭০। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানের এখন আসন সংখ্যা যথাক্রমে ২৯, ৪৮ ও ২৫। সেই আসন বেড়ে হতে পারে ৪৭, ৬৮ ও ৪৪। আমাদের রাজ্যেরও আসন বেড়ে হতে পারে ৬০। সেখানে দক্ষিণের পাঁচ রাজ্য তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, তামিলনাড় ও কর্ণাটকের আসন সংখ্যা এখন যথাক্রমে ১৭, ২৫, ২০, ৩৯ ও ২৮। সব ঠিক থাকলে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রের আসন বাড়তে পারে তিনটি করে। তামিলনাড়ুর বাড়তে পারে দু’টি আসন। কর্ণাটকের আসন সবচেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে হতে পারে ৩৬। কেরলের আসন তো আবার একটি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। কারণ কেরল সবচেয়ে ভালোভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, তামিলনাড়ু, কেরল, তেলেঙ্গানা— প্রতিটি রাজ্যেরই আসন কমবে। অর্থাৎ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, যে সব রাজ্যে বিজেপি অনেক বেশি শক্তিশালী, সেগুলির আসন এতটাই বাড়ছে যে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিতে তাদের ভরাডুবি হলেও মসনদে আসা আটকাবে না। বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রভাব একেবারেই তলানিতে পৌঁছে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল কংগ্রেস কী করবে? কারণ বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর স্লোগান ছিল ‘জিতনি আবাদি, উতনা হক’। অর্থাৎ, জনসংখ্যা বেশি হলে তার অধিকারও বেশি। উত্তরের বিশেষ করে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলির জন্মহার অনেক বেশি। ২০০১ থেকে ২০১১— এই ১০ বছরে হিন্দিবলয়ে জন্মহার বেড়েছে কমপক্ষে ২০ শতাংশ। সেখানে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এই হার ১৫ শতাংশের আশপাশে। কেরলে তো মাত্র ৪.৯ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গেও তা প্রায় ১৪ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই ২০২৬ সালে জনগণনা হলে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা অনেক বেশি হবে। এখন মোদি সরকার ‘জিতনি আবাদি উতনা হক’ নীতিতে আসন পুনর্বিন্যাস করলে কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখ থাকবে কি?