সমৃদ্ধ দত্ত: নাগপুরের ভোঁসলে বংশীয় রাজা রাঘোজি ভোঁসলে তাঁর ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে বলে দিয়েছিলেন, বাংলার মতো সম্পদশালী রাজ্য আর নেই। ওখানে গণহত্যা চালিয়ে ত্রাস সঞ্চার করতে পারলেই ভয়ে আতঙ্কে বার্ষিক বিপুল অঙ্কের শুল্ক (চৌথ) আদায় করা সম্ভব হবে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভাস্কর পণ্ডিত নামক এক সেনাপতিকে। ১৭৪১ সাল থেকে শুরু হয়েছিল মারাঠা বাহিনীর বাংলা আক্রমণ। যাদের নাম ইতিহাসে বর্গী। ১৭৪১ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত ১০ বছর ধরে মোট ৬ বার এই বর্গীরা এসে মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, নদীয়ায় যে গণহত্যা কায়েম করেছিল সেটা বিশ্বের নির্মমতার ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার মতো এক নিষ্ঠুরতা। গঙ্গারাম শাস্ত্রীর ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’ রচনায় দেখা যায় যে, চরম অত্যাচার সংঘটিত হয়েছিল বাংলার হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে জনতার উপর। কীভাবে বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে বধ্যভূমি করা হয়েছিল? গ্রামে গ্রামে ঢুকে লুটপাটের সময় পুরুষদের কান কেটে নেওয়া, নাক কেটে নেওয়া, জলের ট্যাঙ্ক কিংবা মলমুত্র ভর্তি গর্তের মধ্যে ফেলে দমবন্ধ করে মেরে ফেলা, বঙ্গনারীদের স্তন কেটে নেওয়া, অবাধ ধর্ষণ এবং সর্বোপরি গ্রামের পর গ্রাম আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেওয়া। হাজার হাজার বঙ্গবাসী নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বর্গীর ভয়ে এই গ্রাম থেকে সেই গ্রাম পালিয়ে বেরিয়েছে। প্রতি বছর ১২ লক্ষ টাকা চৌথ দেওয়ার অঙ্গীকার করতে বাধ্য হন নবাব আলীবর্দি খান। বাঙালির ঘামরক্তের ১২ লক্ষ টাকা মারাঠারা নিয়ে চলে গিয়েছিল বছরের পর বছর। ঘরছাড়াদের মিছিল দেখা গিয়েছে বাংলার জেলায় জেলায়। বাঙালি উদ্বাস্তু হয়েছে।
১৭৬৮ সালে সামান্য বৃষ্টি হয়। তখনও আশা ছিল যে, আগামী বছর নিশ্চয়ই এই অনাবৃষ্টির ক্ষতিপূরণ হবে। হয়নি। ১৭৬৯ সালে বস্তুত দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি হলই না। তুলো এবং তুঁতে চাষে লাভ হচ্ছিল। সেটা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। এই দুই চাষে জল বেশি প্রয়োজন। অনাবৃষ্টির সঙ্গেই যা আসে সেটার আগমন ঘটল দ্রুত। অর্থাৎ খরাজনিত খাদ্যাভাব। মুর্শিদাবাদের প্রশাসন মূলত যিনি দেখভাল করতেন, সেই মহম্মদ রেজা খান কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের কাছে খবর পাঠিয়ে বললেন, অনাহারের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কৃষক ও গরিব গ্রামবাসী নিজেদের সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছে। প্রথমে খেতমজুর, তারপর শ্রমিক, তারপর মাঝি ও মধ্যবিত্তের মৃত্যুমিছিল। রাজমহল এলাকার দায়িত্বে থাকা জেমস গ্র্যান্ট রিপোর্ট পাঠালেন রাস্তায় এখন হয় মৃত্যুমিছিল, নয়তো ঘরছাড়া মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়ার অন্তহীন পদযাত্রা। বাঙালি আবার উদ্বাস্তু হয়েছিল।
সিঙ্গাপুর, বর্মা যখন জাপানিরা দখল করে নিয়েছে, তখন অবশ্যই আজ নয় কাল ভারতে ঢুকে পড়বে তারা। তাই ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে সবার আগে বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে সব নৌকা বাজেয়াপ্ত অথবা ধ্বংস করে ফেলতে শুরু করল। যাতে জাপানিরা বাংলা দখল করে নৌকার সাহায্য না পায়। তার পরই বর্মা থেকে চাল আসা বন্ধ হয়ে গেল। ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে সাইক্লোন ও বন্যা। ধানের ব্রাউন স্পট নামক একটি রোগের প্রাদুর্ভাব ফসলের বিপুল ক্ষতি করল। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার কী করল? তারা আরও বেশি করে চাল বাংলাকে দেওয়ার পরিবর্তে চাল সব সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নীতি নিল যুদ্ধের দোহাই দেখিয়ে। লর্ড ওয়াভেল ভাইসরয় হয়ে আসার দু মাসের মধ্যে বাংলা সফর করে আগাম সংকেত দিয়েছিলেন যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হতে পারে। ব্রিটিশ সরকার লন্ডনে বসে সেই আশঙ্কা অগ্রাহ্য করেছে। অতএব ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে অন্তত ৩৫ লক্ষ বঙ্গবাসীর মৃত্যু হল। গ্রাম থেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ শহরগুলিতে চলে আসছিল। বাঙালি আবার উদ্বাস্তু হয়েছিল।
এসবের আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ বর্মায় আছড়ে পড়ায় সবথেকে বেশি সংখ্যায় যে জাতিকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পর্বত, জঙ্গল, নদী পেরিয়ে পালাতে হল তার নাম বাঙালি। বাঙালি খেদাও অভিযান বলা যেতে পারে ওই ঘটনাকে। বাঙালি উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিল সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার হাত ধরে দেশভাগও করে দেওয়া হয়। হিন্দু বনাম মুসলিমের দ্বন্দ্বে বাঙালির অস্তিত্ব, ভিটে, প্রাণ, সম্পত্তি, সম্মান, পেশা সব আবার ভুলুণ্ঠিত হওয়া শুরু হল। বাঙালিকে স্বাধীনতার সবথেকে বড়ো উপহার হল ছিন্নমূল করে দেওয়া। আবার ঘর, উঠোন, তুলসীমঞ্চ, আমবাগান, ব্রজমোহন কলেজ, কর্ণফুলি নদী এবং সম্মানের জীবন ছেড়ে বাঙালি পথে নেমে এল। নিহত হল। ধর্ষিত হল। অসম্মানিত হল। খণ্ডিত এক ভূমিতে এসে সংগ্রাম শুরু করল। তাদের নতুন ঠিকানাগুলি সরকারি খাতায় নতুন নাম পেল। কলোনি! তারা একটি কার্ড পেল। রিফিউজি কার্ড। তাদের পরিচয় হল ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু।
এই চেনাজানা ইতিহাসের বিবরণ আবার উত্থাপন করার কারণ কী? কারণ হল, বাঙালির ইতিহাসে উদ্বাস্তু হওয়া, বাঙালির ভিটে থেকে উচ্ছেদ করার প্রবণতা এবং বাঙালিকে চিরঅস্থিরতায় ঠেলে দেওয়ার ইতিহাস আজকের নয়।
জওহরলাল নেহরু এলাহাবাদের মানুষ। প্রাসাদোপম বাড়িতে। নরেন্দ্র মোদি গুজরাতের ভাদনগর গ্রামে লালিত পালিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষা, চরিত্র, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা প্রশাসনিক পদ্ধতি নিয়ে সামান্যতম সাদৃশ্য নেই। একমাত্র মিল হল, তাঁরা নিজেরা উদ্বাস্তু যন্ত্রণা উপলব্ধি করেননি। তাঁদের পরিবার, আত্মীয়, স্বজন, স্বজাতি দেশভাগজনিত সর্বনাশের সম্মুখীন হয়নি। আর তাই নেহরু থেকে মোদি সকলেই বাঙালির উদ্বাস্তু হওয়ার ঐতিহাসিক আতঙ্কের মনস্তত্ত্ব কখনওই অনুভব করতে সক্ষম হননি।
নেহরু এবং মোদি, দুজনেই বাঙালিকে উদ্বাস্তু হওয়ার দিকেই ঠেলে দিয়েছেন। একজন দেশভাগের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর প্রধানমন্ত্রী হয়েও বাংলায় চলে আসা উদ্বাস্তুদের কোনও সম্মানজনক বাসস্থান ও পেশা উপহার দিতে পারেননি। বাঙালিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আন্দামান থেকে দণ্ডকারণ্য কিংবা নানাবিধ রিফিউজি ক্যাম্পে। বাংলায় ১৯৫০ সালে যে এলাকা কলোনি নামে পরিচিত, ২০২৬ সালেও সেই পরিচয় থেকে তারা আর বেরতে পারেনি। নেহরু ব্যর্থ হয়েছেন বাঙালির উদ্বাস্তু সমস্যা মেটাতে।
আর নরেন্দ্র মোদি, কখনও সিএএ, কখনও এনআরসি, কখনও এসআইআর নামক অস্ত্র দিয়ে লাগাতার বাঙালিকে উদ্বাস্তু হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এসআইআর বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু বিজেপি যেভাবে বৈধ নাগরিকের অবাধে নাম বাদ যাওয়া অথবা সন্দেহজনক নাগরিকের তকমা দিয়ে শুনানিতে ডাকার পক্ষে সওয়াল করছে, সেটা তাদের রাজনৈতিক ক্ষতি করছে।
বঙ্গ বিজেপিকে বুঝতে হবে যে, তাঁদের দিল্লিশ্বররা উদ্বাস্তু শব্দটির অভিঘাতের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাঁদের রাজ্য গুজরাত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ভোগ করেনি। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে ধ্বংস হয়নি। দেশভাগের দুর্দশার বিন্দুমাত্র আঁচ লাগেনি। তাঁরা কীভাবে বুঝবেন বৈধ নাগরিকের নাগরিকত্ব তথা বাসস্থান চলে যাওয়ার আতঙ্ক ঠিক কোন মনস্তত্ত্বে গিয়ে আঘাত করে? অতএব এসআইআর করা বিজেপির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
প্রত্যেক বাঙালির মনে কেন যে যেভাবে হোক একটি নিজের বাড়ি করার স্বপ্ন থাকে? সেই তাগিদ পূরণ করার জন্য কেন তারা জীবনপণ করেও এক ফালি জমি কেনাকে সর্বোত্তম সাফল্য ও স্বস্তি বলে মনে করে? মাথার উপর যত ক্ষুদ্রই হোক একটি নিজের ছাদ হয়ে গেলে আচমকা গতকালের থেকে আজকের আমি কেন একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাই? এই মনস্তত্ত্বগুলি দিল্লির শাসক ও কমিশনের পক্ষে বোঝা কঠিন। এই মনস্তত্ত্ব দিল্লির শাসকরা বিগত ৮০ বছরে বুঝতে পারেনি।
এসআইআর নিছক রাজনৈতিক ইস্যু নয়। আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব সংকট এবং সামাজিক সম্মানের ইস্যু। তাহলে কি আমাকে ভিটেমাটি ছেড়ে দিতে হবে? আমার এই দেশে কোনো আত্মপরিচয় নেই? আমি এক অনাগরিক? এই যে এত কষ্ট করে বাড়ি করলাম? ছেলেমেয়ে মানুষ করলাম? ভোট দিলাম? ট্যাক্স দিলাম? আজ আমি কেউ না? আবার কোথায় যেতে হবে এবার? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে বাঙালির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। কখনো মুসলিম শাসক। কখনো হিন্দু মারাঠা বর্গী। কখনও খ্রিস্টান ইংরেজ শাসন। সব আমলেই ঐতিহাসিকভাবে বাঙালিকে অসংখ্যবার উদ্বাস্তু হতে হয়েছে। হয়তো তাই আজও প্রত্যেক বাঙালির জীবনে সবথেকে বড়ো দুঃস্বপ্ন ছিন্নমূল হওয়া! এসআইআর সেই আতঙ্কের দুঃস্বপ্ন ফিরিয়ে আনছে। বাঙালি ছাড়া কেউ বুঝবে না এই আতঙ্ক মনস্তত্ত্ব! বাঙালির চিরকালীন আতঙ্ক—‘আমার কোনো ঘর নেই’ এরকম হবে না তো?