১৯৯৩ সালে গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মূল কাজ কী কী? সংক্ষেপে বললে, ভারতে মানবাধিকার রক্ষা ও প্রচার করা। এই সংস্থার দায়িত্ব হল, যেকোনও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত করা, সেই রিপোর্ট সরকারকে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা, ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা। অন্যভাবে বললে, নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষায় সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করার কথা মানবাধিকার কমিশনের। জন্মমুহূর্তে এই ঘোষিত পরিচয় ও লক্ষ্য মোদি জমানার এগারো বছরে যে অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে সেই অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে করে আসছিল দেশের প্রায় সব বিরোধী দল। এবার রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি শাখা সংগঠনও এই নিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছে। ভারতের মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা ও কাজকর্ম নিয়ে তারা শুধু মূল্যায়ন করেই ক্লান্ত হয়নি, আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারতকে ‘এ’ গ্রেড থেকে ‘বি’ গ্রেডে নামিয়ে দিয়েছে! জন্মের পর অবনমন এই প্রথম। এর মানে দাঁড়ায়, মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক নীতি মেনে চলছে না মোদির ভারত। তাই ১৪২ কোটির দেশ ‘এ’ গ্রেডে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছে। তবে ক্লাসের দুষ্টু ছাত্রদের ভালো ফল করায় উৎসাহ দিতে যেমন আরেকবার সুযোগ দেয় অনেক স্কুল, রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই সংস্থাটিও ভারতকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, অবনমনের ঘোষণা হলেও তা ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর করা হবে না। মোদি জমানায় দেশের আম জনতার অভিজ্ঞতা হল, আর্থ-সামাজিক যেকোনও ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির সাফল্যের ঢাক পেটাতে কোমর বেঁধে ময়দানে দাপিয়ে বেড়ায় গেরুয়াবাহিনী। তার সঙ্গে সঙ্গত করতে প্রচারের কাজে কোষাগার থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার। কিন্তু এই ঢাক পেটানো বা সরকারি প্রচার যে অনেকটাই অসত্য ও মনগড়া, বিভিন্ন সময়ে তা তথ্য দিয়ে তুলে ধরেছে বিরোধী থেকে সংবাদমাধ্যম। এবং দেখা যাচ্ছে, মানবাধিকার কমিশনের ‘ভূমিকার’ মতো প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সূচকের বিচারে ভারত ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এতেও লজ্জা না পেয়ে চড়া সুরের প্রচারে সব ঢেকে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা হচ্ছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুধুমাত্র রাজনৈতিক রং দেখে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে জানিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের যে সংস্থাটি ভারতকে ‘বি’ গ্রেডে নামিয়ে দিয়েছে, তার নাম গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস। এই সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনগুলিকে আন্তর্জাতিক মান, বিশেষ করে প্যারিস নীতিমালা মেনে চলা নিশ্চিত করতে সহায়তা, ক্ষমতাবৃদ্ধি ও স্বীকৃতি প্রদান করে। এই প্যারিস নীতিমালায় বহুত্ববাদ, স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সব দেশের মানবাধিকার কমিশনই যেন বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদণ্ডগুলি মেনে চলে। প্যারিস নীতিমালা ঠিকমতো মেনে চলা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য একটি অ্যাক্রিডিটেশন সাবকমিটি রয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই শাখা সংগঠনের ১২০টি সদস্য দেশের মধ্যে ৮৮টি দেশের মানবাধিকার কমিশন ছিল ‘এ’ গ্রেডে, যার মধ্যে ভারত অন্যতম। বাকি ৩২টি মানবাধিকার কমিশন ছিল ‘বি’ মর্যাদায় স্বীকৃত। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ১৯৯৯ সাল থেকে ‘এ’ গ্রেডভুক্ত ছিল। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে এদেশের মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্ম আতস কাচের নীচে রেখে ভারতকে পর পর দু’বছর কোনও গ্রেডই দেওয়া হয়নি। কিন্তু এবার অবনমনের সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়েছে।
কেন এই ‘শাস্তি’? তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংগঠন। যা ভারতের বাস্তব ছবির সঙ্গে মিলে যায়। বলা হয়েছে, ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তার স্বাধীনসত্তা ও কার্যকারিতা ঠিকমতো বজায় রাখছে না। সোজা কথায়, শাসকগোষ্ঠীর লেজুড়বৃত্তি করছে। কমিশনের কাজ হল, সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তা হচ্ছে না। সরকার বিরোধীস্বর দমিয়ে রাখতে নানা পন্থা নিলেও কমিশনের ভূমিকা ধোঁয়াশাপূর্ণ। দেশের বহু মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হলেও কমিশন কোনও পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ। বলা ভালো, দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে। পুলিসের বিরুদ্ধে মানবাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সেই তদন্তেও ভরসা করা হয়েছে পুলিস আধিকারিকদেরই! প্রশ্ন উঠেছে, মণিপুরে জাতীয় কমিশনের তৎপরতার অভাব নিয়েও। এর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনে উদ্বেগ জানিয়ে রিপোর্টে প্রকাশ করেছে। আসলে এটাই মোদি জমানার চেনা ‘মডেল’। গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে একদিকে ইডি, সিবিআইয়ের মতো তদন্তকারী সংস্থাকে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সহ যাবতীয় স্বাধীন, স্বশাসিত সংস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। এ হেন পরিস্থিতিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কি আর সরকারের হয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে? অতএব জাতীয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধেও শাসকের হয়ে ব্যাট করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সব কিছুতেই রাজনীতির রং লাগলে কার উপর ভরসা করা যাবে?