Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

অবাধ পারাপারে বাড়ছে মৃত্যু, রিপোর্ট জিআরপির, লাইনে ফেন্সিং দিতে চাপ রেলকে

বছরে প্রায় আড়াই হাজার মৃত্যু! দুরারোগ্য ব্যাধি বা মহামারী নয়!

অবাধ পারাপারে বাড়ছে মৃত্যু, রিপোর্ট জিআরপির, লাইনে ফেন্সিং দিতে চাপ রেলকে
  • ২৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বছরে প্রায় আড়াই হাজার মৃত্যু! দুরারোগ্য ব্যাধি বা মহামারী নয়! রেলের হাওড়া ও শিয়ালদহ এসআরপি’র আওতাধীন স্টেশনগুলিতে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ যাচ্ছে এত মানুষের। যাত্রীদের একাংশ ও রেল পুলিস মনে করছে, লাইনের দু’ধারে কোনও ফেন্সিং না থাকার জন্যই এই অবস্থা। বিভিন্ন স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম বদল বা বাইরে যাওয়ার জন্য রয়েছে সাবওয়ে বা ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে এগুলি রয়েছে প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে। স্বভাবতই প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে থাকা যাত্রী সাবওয়ে বা ওভারব্রিজ ব্যবহারের চেয়ে লাইন টপকে অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়াটা সহজ মনে করছেন। তা করতে গিয়েই ঘটে যাচ্ছে বিপদ। তাছাড়া, বিভিন্ন স্টেশন এলাকায় রেললাইন থেকে ২০-২৫ ফুট দূরে গজিয়ে উঠেছে ঝুপড়ি। সেখানকার বাসিন্দাদের দিনের একটা বড় সময় কাটছে লাইনে বসে বা আড্ডা দিয়ে। দৈনন্দিন প্রয়োজনে বারবার লাইন টপকে আসা-যাওয়া তো লেগেই আছে। সামান্য অসতর্ক হলে ঘটে যাচ্ছে দুর্ঘটনা। নিত্যযাত্রীরাও অনেকে স্টেশনে পৌঁছতে শর্টকাট খোঁজেন। তাঁদের ভরসা লাইন বরাবর সরু রাস্তা। সার্বিক এই পরিস্থিতির জন্য রেলকেই দুষছে রেল পুলিস (জিআরপি)। লাইনের দু’ধারে ফেন্সিং না থাকা এবং আরপিএফের নজরদারির অভাবকে দায়ী করছে তারা। ‘বিপজ্জনক’ স্টেশনগুলির মধ্যে রয়েছে দমদম, বিধাননগর, নৈহাটি, বারাকপুর, বারাসত, টিকিয়াপাড়া, শেওড়াফুলি, বর্ধমান, ব্যান্ডেলের মতো স্টেশনগুলি। এসব স্টেশনে মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ জন ট্রেনে কাটা পড়ছেন। 
সমস্যার সমাধান কোন পথে? মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিভিন্ন স্টেশনের নিত্যযাত্রীরা। যেমন, সোদপুর স্টেশনের নিত্যযাত্রী কৌস্তভ দে বলছিলেন, ‘ট্রেন আসছে দেখেও মানুষ অবলীলায় লাইন পারাপার করছে। কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। অথচ দেখুন, যেখান দিয়ে সবাই লাইন টপকাচ্ছে, তার উপরেই রয়েছে ব্রিজ। উল্টোদিকে আছে সাবওয়ে। পুলিসের কড়াকড়ি না থাকলে এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে সচেতনতা না তৈরি হলে দুর্ঘটনা আটকানো অসম্ভব।’ শেওড়াফুলির নিত্যযাত্রী অভিজিৎ বাগ বলেন, ‘আমাদের স্টেশনে ওভারব্রিজ আছে বটে, কিন্তু সেটি এত খাড়া যে অনেকেই এতটা সিঁড়ি ভাঙতে হবে ভেবেই পিছিয়ে যান। লাইন টপকে গেলে অনেক তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়।’ হাবড়ার বাসিন্দা সৌরভ কুণ্ডু বিধাননগর স্টেশনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ উগরে দিলেন। তাঁর কথায়, ‘এখানে ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ৩ নম্বরে যেতে গেলে এত ঘুরপথ যে লাইন ধরে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। রেলের উচিত, এই স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম বদলের জন্য বিকল্প উপায় বের করা।’ খোদ কলকাতা শহরেই রেললাইন ধরে স্টেশনে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। যেমন, বন্ডেল গেট এলাকার বাসিন্দা মহম্মদ আনিসুর রাজা বলেন, ‘বালিগঞ্জ থেকে অফিস যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরি। ওই সময় বাসে বালিগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছতে ৪৫ মিনিট লাগে। এত ঝামেলায় না গিয়ে লাইন ধরে কয়েক মিনিট হেঁটে স্টেশনে পৌঁছে যাই।’ ঝুঁকির বিষয়টি উড়িয়ে না দিলেও স্বভাবতই তিনি এনিয়ে কড়াকড়ির পক্ষে নন। বজবজ শাখার নুঙ্গি বা বনগাঁ শাখার বিশরপাড়া স্টেশনের যাত্রীরা অবশ্য ফেন্সিং এবং নজরদারি বৃদ্ধির দাবি করেছেন। 
এই অবস্থায় রেল পুলিস এই দুই এসআরপি এলাকায় দুর্ঘটনাপ্রবণ ৫০০’র বেশি জায়গা চিহ্নিত করেছে। রেল পুলিসের এক অফিসার বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা বারবার রেলকে তৎপর হতে বলেছি। কোনও কাজ হয়নি। তবে চিহ্নিত জায়গাগুলিতে ফেন্সিংয়ের প্রস্তাব ফের আমরা রেলকে পাঠাচ্ছি। আরপিএফ-কেও নজরদারি বাড়াতে হবে।’ যদিও আরপিএফের দাবি, তারা যথেষ্ট সতর্ক। তবে ফেন্সিংয়ের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েছে তারাও। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement

 

মাথায় ফলের ঝুড়ি নিয়ে কি ফুটব্রিজ পার করা যায়! একটু দেখেশুনে ট্রেন লাইন পার করলেই হল। এতদিন যখন কিছু হয়নি, আর কিছু হবেও না। বন্ডেল গেট এলাকায় রেল বেড়া দিলে স্থানীয় বাসিন্দারাই তা ভেঙে দেবে। 
ফাতিমা বেগম  ফলওয়ালা

 

এপার থেকে ওপারে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য ওভারব্রিজে কেউ ওঠে না। যখন ট্রেন লাইনে, রেলের মাথায় উঠে ছেলে-মেয়েরা রিল বানায়, তখন তো রেল কিছু করতে পারে না। যত গরিব মানুষের পেটের ভাত মারার প্ল্যান। 
অমিত পান্ডে  মুটে

স্টেশনের ২ নম্বর এবং ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার যে সাবওয়ে রয়েছে, সেটা রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। একটু বৃষ্টি হলেই জল জমে যায়।
সঞ্জীব মল্লিক  
সোদপুরের বাসিন্দা

বৈদ‍্যবাটি ও শেওড়াফুলি জনবহুল অঞ্চল। রেললাইনের ধার বরাবর বসত এলাকা। শেওড়াফুলিতে জেলার অন‍্যতম বৃহৎ পাইকারি সবজি বাজার। ফলে, দ্রুত রেললাইন পার করা নাগরিকদের বাধ‍্যতা। রেললাইনের ধারে ফেন্সিং করা সমাধান নয়, নাগরিকদের যাতায়াতের সুষ্ঠু নিরাপদ ব‍্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। তাহলেই সহজে দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে। রেল নাগরিকদের পরিষেবা দেওয়ার জন‍্য চালু হয়েছে। সেই বাস্তবতা ভুলে গিয়ে স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে আখেরে লাভ হবে না।
অজয়প্রতাপ সিং  বৈদ‍্যবাটির বাসিন্দা

বিধাননগর স্টেশনে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের টিকিট কাউন্টারের দিক থেকে যে পাতাল পথ রয়েছে, সেখান দিয়ে শুধুমাত্র ২ এবং ১ নম্বরে যাওয়া যায়। আবার ৩ নম্বর এবং ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মের সংযোগ করেছে অপর সাবওয়ে। এই দু’টি পাতাল পথের মধ্যে ইন্টারলিঙ্ক থাকলে যাত্রীদের সুবিধা হতো। রেলের তেমন কিছু ভাবা উচিত। 
ঋষি কর্মকার  বারাকপুরের বাসিন্দা

কলেজে আসার জন্য প্রতিদিন লোকাল ট্রেন ধরে টিকিয়াপাড়া স্টেশনে নামি। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে তিন নম্বরের দিকে যাওয়ার জন্য কোনও ফুটব্রিজ নেই। মাঝের থ্রু লাইন দিয়ে প্রায় সময়ই দূরপাল্লার ট্রেনগুলো যায়। প্রাণ হাতে করে লাইন পারাপার করতে হয়।
নাসিমা খাতুন 
হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজের ছাত্রী

টিকিয়াপাড়া স্টেশনের একদিকের টিকিট কাউন্টার পুরোপুরি বন্ধ। ফলে টিকিট কাটতে লাইন পারাপার করা ছাড়া উপায় নেই। রেল পুলিসও থাকে না। কারশেডে ঢোকার আগে অনেক সময় মাঝের লাইনে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকে। তখন অগত্যা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই ট্রেনের নীচ দিয়ে 
যেতে হয়।
প্রণতি দে শর্মা  নিত্যযাত্রী

অফিস থেকে ফেরার সময় বনগাঁ লোকাল ধরি। কোনও কোনও সময় ৩ নম্বরের পরিবর্তে আচমকা ট্রেন ১ নম্বরে দেওয়ার ঘোষণা হয়ে যায়। তখন বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাইন টপকে আমাদের ১ নম্বরে যেতে হয়। অনেকে দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছেন।
অমিত দত্ত  
বারাসতের নিত্যযাত্রী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ