সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত
সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত
‘ডাক্তার, ও ডাক্তার, এই ব্যথাটা একটু কমানো যায় না?’
‘এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন। আমি ওষুধ দিয়েছি।’
‘কিন্তু আমাকে তো কাল যেতেই হবে!’
‘আপনার বিলিয়াম কলিক হয়েছে, এই অবস্থায় কয়েক মাস বিছানাতেই...’
‘কী বলছ ডাক্তার! কাল ৭ জানুয়ারি। আমাকে যেতেই কাউন্সিলে হবে। ওরা ওই অর্ডিন্যান্সকে হাতিয়ার করে সুভাষকে জেলে ভরেছে। অর্ডিন্যান্সের মেয়াদ এই এপ্রিলে শেষ। এবার সুভাষকে ছাড়তে হবে বুঝতে পেরে ওরা কাউন্সিলে ৭ জানুয়ারি তড়িঘড়ি কাউন্সিলে তা পাস করিয়ে আইনে পরিণত করতে চাইছে। আমি বেঁচে থাকতে সুভাষকে ওরা জেলে রাখবে!’
‘আপনি শান্ত হন, উত্তেজনা ঠিক নয়।’
মর্ফিয়া ইনজেকশন। কিছুক্ষণ শান্তি। শরীরে যতটা না কাহিল, মনের যন্ত্রণায় তার থেকেও বেশি উদ্বিগ্ন চিত্তরঞ্জন দাশ। দেশবন্ধু।
১৯২৫ সালের ৭ জানুয়ারি। বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স বিলের প্রস্তাব ব্যবস্থাপক সভায় উঠবে। তিনি উপস্থিত না থাকলে কে আটকাবে এই কালা কানুন! বন্দিশালার অন্ধকূপ থেকেই বা কে ছাড়িয়ে আনবেন তাঁর প্রিয় ক্যাপ্টেন সুভাষচন্দ্রকে!
মহাকালের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছেন নিজের মধ্যে। ১৯২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ক্লান্ত দেহ নিয়ে বেলগাঁও থেকে ফিরেছেন কলকাতায়। খবরের কাগজে বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স বিল সরকার পক্ষ থেকে উত্থাপনের খবর দেখেই উত্তেজিত হলেন। কী করে ভুলবেন তিনি, এই সেই কালাকানুন যা তাঁর প্রিয় সুভাষকে কেড়ে নিয়েছে! এই অর্ডিন্যান্স পাস হলে সরকারের হাতে যে কাউকে বিনা কারণে গ্রেপ্তার ও বন্দি রাখার ক্ষমতা চলে আসবে।
রোগশয্যায় ব্যাকুল দেশবন্ধু। সর্বনাশ, শরীরের এই অবস্থায় তিনি কাউন্সিলে যাবেন কি করে! সবাই উদ্বিগ্ন। বার বার বারণ করছেন। কিন্তু দেশবন্ধু মরিয়া। বললেন, ‘তোমরা বুঝতে পারছ না, ওরা আমাকে মারবার জন্যই অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল। আর সেই উদ্দেশ্যে ওরা এই বিল আনছে। আমার ছেলেরা সব বিনা বিচারে আটকে আছে, আর আমি বসে থাকব? না না, বারণ কোরো না তোমরা।’ নেতা একেই বলে। সুভাষচন্দ্রের গ্রেপ্তারির পর থেকেই অবসন্ন হৃদয়ে হতাশা বাসা বেঁধেছে। পাটনা থেকে শেষ চিঠিতে সুভাষচন্দ্রকে সেই ব্যাকুলতা জানিয়ে ছিলেন।
লর্ড লিটন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। দেশবন্ধুহীন স্বরাজ্য পার্টি, এ যেন মণিহারা ফণী। এই তো মোক্ষম সুযোগ অর্ডিন্যান্স পাস করিয়ে নেওয়ার। কাউন্সিলের মেম্বারদের মধ্যে তখন চাপা গুঞ্জন। লিটন সভা শুরুর আগেই প্রস্তুত। আচমকা ছন্দপতন। স্ট্রেচারে শায়িত দেশবন্ধুকে নিয়ে আসা হচ্ছে কাউন্সিল কক্ষে। সঙ্গে দু’জন ডাক্তার—বিধানচন্দ্র রায় ও জে. এন. দাশগুপ্ত। দু’জনেই আইন সভার সদস্য। মুহূর্তে সেই খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। সভ্যগন দলে দলে অসুস্থ দেশবন্ধুকে দেখতে এলেন। দেশবন্ধুর কাউন্সিলের ঐতিহাসিক বক্তৃতা সকলের হৃদয় স্পর্শ করল। স্ট্রেচারে শুয়েই শেষ বক্তৃতা দিলেন তিনি। দেশবন্ধুর চির প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। ভোট গেল দেশবন্ধুর পক্ষে। অর্ডিন্যান্স বিল খারিজ হয়ে গেল। রাগে, ক্ষোভে লর্ড লিটন অগ্নিশর্মা। কাউন্সিলে পরিত্যক্ত বিলকে তিনদিন পর নিজের ক্ষমতাবলে মঞ্জুর করালেন। মানুষ দেখল, ব্রিটিশ গণতন্ত্রের স্বরূপ। ভগ্ন শরীরেই লড়াই করলেন দেশবন্ধু। ১৯২৫ সালের মার্চ মাস। আইনসভার কাজ শুরু হলেই অসুস্থ শরীরে কর্তব্যের টানে নিয়মিত হাজির। দেশবন্ধুর বক্তৃতায় দ্বৈতশাসন অগ্রাহ্য হল। ব্রিটিশ সরকার বুঝল, অসুস্থ দেশবন্ধুও কতটা ভয়ঙ্কর। আইনসভার অচলাবস্থা কাটাতে বাধ্য হয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইলেন লর্ড লিটন।
২ মে, ১৯২৫। ফরিদপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের অধিবেশন। দেশবন্ধু বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন, হাতে সময় কম। তাই এই সম্মেলনের উদ্বোধন করার জন্য গান্ধীজিকে আহ্বান করলেন। ১ মে কলকাতায় এলেন মহাত্মা গান্ধী। দেশবন্ধু তাঁর হাতে তুলে দিলেন নিজের কলকাতার বাসভবনের দলিল। দেশের জন্য তাঁর শেষ দান। এবার যেন নিশ্চিন্ত রাজসন্ন্যাসী। ৪ মে শেষ ভাষণ দিলেন ফরিদপুর প্রাদেশিক সম্মেলনে। বক্তৃতা মঞ্চে ক্লান্ত দেশবন্ধুকে দেখে সকলেই উৎকণ্ঠিত। সেদিন রাতেই অবস্থার অবনতি হল। কোনওরকমে নিয়ে আসা হল কলকাতায়। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করে একটু সুস্থ করলেন দেশবন্ধুকে। কিন্তু কলকাতায় থাকলেই আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবেন। এই অবস্থা তাঁর শরীরের জন্য বিপজ্জনক। তাই একটু হাওয়াবদল প্রয়োজন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল দার্জিলিংয়ে। অশ্রুসজল চোখে কলকাতার মানুষ বিদায় দিলেন দেশবন্ধুকে। আবার কবে ফিরবেন তিনি?
প্রবল উৎকণ্ঠা!
***********
রাস্তায় রাস্তায় ভিড়। প্রতিটি রেল স্টেশনে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ। অক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন ট্রেনের অপেক্ষায়। শেষবারের মতো ‘বন্ধু’কে দু’চোখ ভরে দেখতে উদগ্রীব সবাই। তিনি এমন এক বন্ধু, যিনি কোনও ব্যক্তির নন, আপামর দেশের। অন্তরে অর্জিত এক বিরল শক্তির অসীমতায় বাংলার রাজনৈতিক পরিসরকে করেছিলেন জনমুখী। হিমাদ্রির শ্বেতশুভ্র গিরিশিখরের বুকে নিদ্রা গিয়েছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে সেই খবর, ‘দেশবন্ধু আর নেই’। উন্মত্ত বন্ধনহীন নদীর মতো সারা বাংলার মানুষ পথে নেমেছেন। শৈলশহর দার্জিলিং থেকে দেশবন্ধুর দেহ আসছে কলকাতায়। যে শহর দেশবন্ধুর প্রাণের ক্ষেত্র। এই শহরের উন্নতিকল্পে বহু কাজ করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। আজ সেই প্রাণের শহরেই হবে তাঁর শেষকৃত্য।
১৬ জুন, ১৯২৫। মঙ্গলবার। একশো বছর আগের কথা। দার্জিলিং থেকে দেশবন্ধুর মৃত্যুর খবর এল। যেন বজ্রপাত হল জাতির মাথায়। বাংলায় তিনিই ছিলেন আক্ষরিক অর্থে প্রথম ‘জননেতা’। তাঁর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে ছিল অগাধ বিশ্বাস ও প্রত্যাশা। বাংলার বিপ্লবী দলগুলি তাঁকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছিল। কংগ্রেসের ক্ষীণ প্রবাহকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। সর্বসাধারণ থেকে কবি-সাহিত্যিক—প্রত্যেকেই তাঁর প্রয়াণে স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করেছিলেন। পরবর্তী সময়েও যাঁরা বাংলার রাজনীতির হাল ধরেছিলেন, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন দেশবন্ধুর শিষ্য। বিধানচন্দ্র রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু, নলিনীরঞ্জন সরকার, তুলসীচরণ গোস্বামী, নির্মলচন্দ্র চন্দ্র... প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন দেশবন্ধুর অনুগামী। অন্যদিকে মৌলানা ভাসানি, হুমায়ুন কবির থেকে কুখ্যাত সুরাবর্দিও তাঁর হাত ধরেই রাজনীতিতে এসেছিলেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে বিপ্লবী দলের নেতাদের ছিল গভীর সম্পর্ক। আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে সাহিত্যজগতে নবাগত শিবরাম চক্রবর্তী—সকলেই তাঁর বড় আপন।
একবার অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন গেলেন মালদায়। ফেরার সময় চিত্তরঞ্জন দাশের জন্য রিজার্ভ কামরায় লুকিয়ে উঠে পড়ল গ্রামের একটি বালক। সবাই দেশবন্ধুকে নিয়ে ব্যস্ত। তাঁর বিদায় অভিনন্দনের পালার মধ্যে কেউ লক্ষ্যই করল না ছোট্ট ছেলেটিকে। সকলের অলক্ষ্যে গ্রামের ছেলেটি এল কলকাতায়। আশ্রয় পেলেন চিত্তরঞ্জনের রসা রোডের বাড়িতে। সাহিত্যে ছিল তার চিরন্তন ভালোবাসা। দেশবন্ধুর সান্নিধ্যে এসে সেই বালক সাহিত্যকে করে তুলল নিজের অবলম্বন। বাংলা সাহিত্য পেল শিবরাম চক্রবর্তীকে। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’র লেখক শিবরাম সত্যিই দেশবন্ধুর সঙ্গে পালিয়েছিলেন বাড়ি থেকে।
এমনই এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁর মনে হয়েছিল, চিত্তরঞ্জনের সংগ্রহে থাকা বহু মূল্যবান পুঁথি কলকাতার সাহিত্য পরিষদে থাকলে বহু গবেষকের উপকার হবে। একদিন রসা রোডের বাড়িতে গেলেন হরপ্রসাদ। সাহিত্য-পরিষদের উন্নতির জন্য বাংলা পুঁথির সংগ্রহ দানের অনুরোধ করলেন চিত্তরঞ্জন দাশকে। একথা শোনামাত্র তিনি ‘পুঁথি’র আলমারির চাবি তুলে দিয়েছিলেন হরপ্রসাদের হাতে।
দেশবন্ধুর সম্বন্ধে এমন মুগ্ধতা বহু মানুষের মনেই তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যাঁরা তাঁকে আদালতে দেখেছেন। তিনি যখন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কোনও মামলায় লড়তেন, মনে হতো দেশের জন্যই তাঁর এই লড়াই। রাজদ্রোহের জন্য ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সরকার। জ্যাকসন, নর্টনের মতো সে যুগের বড় বড় ব্যারিস্টার অমৃতবাজার পত্রিকার পক্ষে মামলা লড়েও কিছুই করতে পারেননি। অবশেষে এলেন দেশবন্ধু। চিফ জাস্টিসের ঘরে তিল ধারণের জায়গা নেই। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সকলে চিত্তরঞ্জন দাশের সওয়াল শুনছেন। অপূর্ব কৌশলে সরকার পক্ষের সমস্ত যুক্তিজাল ছিন্ন করছেন তিনি। মামলার চেহারা বদলে গেল। কোর্টের করিডোর ধরে বেরিয়ে আসার সময় দু’দিকে করজোরে সারিবদ্ধ জনতার ভিড় অভিনন্দন জানাল দেশবন্ধুকে।
সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে যে সাফল্য তিনি অর্জন করেছিলেন তা বিরল। বিশেষ করে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন, অন্যদিকে বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক। যুগান্তর দলের পক্ষে মানিকতলা বোমা মামলায় অংশগ্রহণ যেমন সকলের জানা, তেমনই পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী নেতা বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি, হেমচন্দ্র ঘোষ, পূর্ণ দাস, পঞ্চানন চক্রবর্তী প্রায় সকলেই তাঁকে নিজেদের নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। প্রধানত আইনি সুরক্ষা ও বিপ্লব প্রয়াসের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিতেন দেশবন্ধু। ১৯২৪ সালে পূর্ব বঙ্গের সিরাজগঞ্জে কনগ্রেসের সম্মেলন হয়। এই কনফারেন্সের কিছু দিন আগেই কলকাতার কুখ্যাত পুলিস কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যা করতে গিয়ে টেগার্ট ভ্রমে হত্যা করলেন আর্নেস্ট ডে সাহেবকে। বিচারে ফাঁসি হল গোপীনাথ সাহার। এই ঘটনা সারা বাংলার মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। সিরাজগঞ্জ কনফারেন্সের সভাপতির আসনে মৌলানা আক্রাম খাঁ। দেশবন্ধুর নেতৃত্বে সেই কনফারেন্সে পাশ হল শহিদ গোপীনাথ সাহার স্মরণে শোক প্রস্তাব। প্রস্তাবটি বহুসংখ্যাধিক্যে গৃহীত হল। সেই যুগে প্রকাশ্যে বিপ্লবীর প্রশংসা করা ছিল এক অসম্ভব কল্পনা মাত্র। ব্রিটিশের উদ্যত অসি উপেক্ষা করার স্পর্ধা দু’একজন সর্বভারতীয় জননেতার থাকলেও গান্ধীর বিরোধিতা করার সাহস কারও ছিল না। দেশবন্ধুই প্রথম কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিলেন বিপ্লবীদের। স্বীকৃতি দিলেন তাঁদের উজ্জ্বল দেশপ্রেমকে। গান্ধীসহ অহিংস নেতৃত্ব এই ঘটনায় বিরক্ত হলেও চিত্তরঞ্জন ছিলেন অবিচল। বাংলার তরুণ সমাজের অন্তর পড়তে পেরেছিলেন তিনি।
বিপ্লবীদের প্রতি অপার ভালোবাসা আর স্নেহই দেশবন্ধুর বিপদ ডেকে আনল। মৃত্যুর আগে গভীর মনস্তাপে ভুগতে হল তাঁকে। দেশবন্ধু তখন কলকাতা পুরসভার মেয়র। সুভাষচন্দ্র চিফ একজিকিউটিভ অফিসার। একদিন এক জার্মান সাহেব এলেন দেশবন্ধুর কাছে। কথাবার্তায় বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠে দিয়ে বসলেন শ-চারেক রিভলবারের একটি স্মাগল্ড কন্সাইনমেন্ট গোপনে সরবরাহ করার প্রস্তাব। দেশবন্ধু ভাবলেন যে, ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলারটিকে ফিরিয়ে না দিয়ে যাঁদের কাজে লাগতে পারে তাঁদের কাছেই যদি পাঠিয়ে দেওয়া ভালো। তাই সরল মনে বললেন; ‘আমি ও সবের মধ্যে নেই তুমি বরং সুভাষ-সত্যেনের সঙ্গে ও নিয়ে আলাপ করতে পার।’ হিতে বিপরীত হল। বিপ্লবীদের সাহায্য করার সরল ইচ্ছায় ব্রিটিশ স্পাইয়ের জালে জড়িয়ে গেলেন তিনি। প্রিয়তম শিষ্য সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ মিত্র এবং আরও অনেকে বিনা বিচারে বন্দি হলেন ১৯২৪ সালের ২৫ অক্টোবর।
আসলে দেশবন্ধুর নেতৃত্বে কলকাতা কর্পোরেশন হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের আতুড়ঘর। যেটা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভালোভাবে নেয়নি। তাই দেশবন্ধুর প্রধান সেনাপতি সুভাষচন্দ্রকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
সুভাষচন্দ্র জেলে। দেশবন্ধুর অনুশোচনার অন্ত রইল না। তাই তিনি কর্পোরেশন সভায় বিক্ষুব্ধ সিংহের গর্জনে বলেছিলেন— ‘If love of Cuntry is a crime, I am a Criminal. If the Chief Executive Officer is a Criminal, then I declare that the Mayar is also criminal.’
এই ঘটনার পর থেকেই দেশবন্ধুর শরীর ভেঙে পড়ল। ডাক্তারদের পরামর্শে হাওয়া বদলে গেলেন দার্জিলিং। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য। জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে সামনে থেকে দেখেছিলেন ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষ সপ্তাহটি তাঁর হৃদয়ে আজীবন অম্লান ছিল। হিল রোডে ভগ্ন শরীরে হাঁটতে হাঁটতে কলকাতা শহরের জন্য তাঁর পরিকল্পনার কথা বলতেন দেশবন্ধু। কলকাতা কর্পোরেশনকে দিয়ে কন্টিনেন্টাল ইউরোপের মতো একটি মস্ত বড় ন্যাশনাল থিয়েটার তৈরি করে শিশির ভাদুড়ির মতো একজন দক্ষ অভিনেতার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন।
১৫ জুন হঠাৎ দেশবন্ধুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ১৬ জুন দুপুরে চিরবিদায়। সারা দেশের কান্না ভাষা পেয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘অর্ঘ্য’ কবিতায়—
‘হায়, চির ভোলা হিমালয় হতে
অমৃত আনিতে গিয়া,
ফিরিয়া এলে যে নীলকণ্ঠের
মৃত্যু গরল পিয়া।’
দার্জিলিং শহরে দেশবন্ধুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হল। প্রবল ঝড়-বৃষ্টি সেদিন রাতে। তা সত্ত্বেও মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল দার্জিলিং শহরে দেশবন্ধুর বাড়ির সামনে। দেশবন্ধুর কন্যা অপর্ণা দেবী স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, সেদিন মাঝরাত্রে এক গৈরিকবসনে অদ্ভুত দর্শন বিশালদেহী সাধুর আবির্ভাব হয়েছিল। দেশবন্ধুর মৃতদেহের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ তিনি কোথায় চলে গেলেন। কেউ তাঁর পরিচয় জানতে পারল না। বাংলার মানুষের অনুরোধে রেল কর্তৃপক্ষ মরদেহ কলকাতায় নিয়ে যাবার সমস্ত রকম বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। স্টেশনে এক বিশাল জনতা অশ্রুসজল নয়নে দেশবন্ধুকে শেষ বিদায় জানালো। দার্জিলিং মেলের শেষে একটা আলাদা বগি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল মরদেহের জন্য। পথে যেখানেই ট্রেন দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই এক বিশাল শোকার্ত জনতা দেশনেতার প্রতি নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন করে। অনেক জায়গায় আবার জনতা জোর করে ট্রেন থামিয়ে দেয়। কয়েকটি জায়গায় মানুষ এত ফুল ছিটিয়েছিল রেললাইন পর্যন্ত ঢেকে যায়। পরদিন সকালে যখন বারাকপুর স্টেশনে এসে পৌঁছল ট্রেন, সেখানে বিশাল অপেক্ষমান জনতা হাতে ফুল আর দু’চোখভরা অশ্রু নিয়ে দাঁড়িয়ে। শিয়ালদা স্টেশনে ভীষণ ভিড়। তাই দেশবন্ধুর দেহরক্ষিত বগিটাকে রেখে দেওয়া হল বারাকপুরে। অনেক পরে আলাদা একটি ইঞ্জিনের সাহায্যে তাই যখন শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছল— সে দৃশ্য অবর্ণনীয়। বিশাল জনসমুদ্রে শুধুই মানুষের মাথা। এমন জনসমাবেশ-এর আগে কোনও নেতার মৃত্যুতে দেখেনি বাংলা। সারা ভারতবর্ষের প্রতিনিধি এসেছেন শোক মিছিলে। কলকাতার রাস্তায় সেদিন কোন গাড়ি ছিল না। মানুষের ভিড়ে ট্রামও চালানো অসম্ভব। সারা শহর শোকসন্তপ্ত ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রতিটি বাড়ির ছাদ থেকে পুষ্প বৃষ্টি। যে রাস্তা নিয়ে দেহ যাচ্ছে জল সুগন্ধী দিয়ে ধুইয়ে দিচ্ছে মানুষ। সেই বাঁধভাঙা জনতার মধ্যে চোখে জল নিয়ে হেঁটেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কলকাতা কর্পোরেশনের সামনে, চৌরঙ্গিতে, স্ট্যান্ড রোডে মানুষের মাথা ছাড়া কিছুই দেখা যায়নি। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে হাজার হাজার মানুষ। তাদের হাতে চন্দন কাঠ। চিতা জ্বলেছিল সারারাত্রি। সেই দিনের দেশবন্ধুর চিতার বর্ণনা দিয়েছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। ‘চিত্তচিতা’ কবিতায়— ‘বিত্তহারা ‘চিত্ত’ সে যে বিধাতার অপার্থিব দান, /ফাল্গুনীর সৌম্য দেহে দধীচরি ধ্যানমগ্ন প্রাণ।’
দেশবন্ধুর বিয়োগব্যথা সেদিন ব্যাকুল করেছিল তরুণ কবি জীবনানন্দ দাশকেও। ‘দেশবন্ধু’ নামের কবিতায় লিখলেন—
‘বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রামেল্লী শাঁখ
অশান্ত সন্তান ওগো’ বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদীমাতা।’
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় নিজে জোড়াসাঁকোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এসেছিলেন একটা আর্জি নিয়ে। কবি তাঁকে শূন্যহাতে ফেরালেন না। লিখে দিলেন অমোঘ দু’টি লাইন। প্রবাসী পত্রিকায় (শ্রাবণ ১৩৩২) দেশবন্ধুর প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদিত হল। তাঁর ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’-হীন শবদেহের আলোকিত চিত্রের তলায় সেই বিখ্যাত চার লাইনের কবিতা—
‘এনেছিলে সাথে করে
মৃত্যুহীন প্রাণ
মরণে তাহাই তুমি
করে গেলে দান।’
অঙ্কন : সুব্রত মাজী
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস