রজত চক্রবর্তী: ঠং করে শব্দ হতেই ডানহাতে ধরা মাছের মাথাটা নামিয়ে রাখল পাতে। মাছের মাথার পাশেই লালেঝোলে মাখামাখি ধবধবে দাঁতের দিকে তাকিয়ে আছে হতভম্ব জামাই। শাশুড়ি হাতপাখার হাওয়া দিতে দিতে বললেন, ‘রান্না ভালো হয়নি বাবা! আমি নিজের হাতে রেঁধেছি!’ জামাই তখন জিভের কারসাজিতে মুখের ভিতরে আরেকটি দাঁত খুঁজতে বিশেষভাবে মনোযোগী। জিভের দক্ষতায় মাছের মাথার ঘিলু থেকে দাঁতটি লজেন্সের মতো গালে রেখে গিন্নির দিকে অসহায় চোখে তাকায়। ফুরসৎ পেতেই টুক করে বাঁ হাতের মুঠোয়। সামনের উপরের মাড়িতে মহাগহ্বর। গায়ে গায়ে দু’টি বাঁধানো দাঁত গেল খুলে। এখনও কচি পাঁঠার ঝোল কাঁসার বাটিতে ভরপুর অপেক্ষায়। গিন্নি এগিয়ে আসে, ‘মা মা তুমি একটু যাও তো! তোমার জামাই লজ্জা পাচ্ছে খেতে! যাও না!’ প্রায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কোমরে হাত দিয়ে ঘেমে ওঠা জামাইয়ের সামনে দাঁড়ায়, ‘বললাম বারবার একটু খরচ করে ফিক্সড দাঁত বাঁধিয়ে নাও! করলে না! বোঝো এবার! ঝটপট লাগিয়ে নাও!’
‘বুঝলি, গিন্নি সে যাত্রায় না বাঁচালে পুরো কেস খেয়ে যেতাম! তবে ওই কচি পাঁঠার হাড়গুলো বেঁচে গেল! চুষে চুষে ছেড়ে দিলুম! কী করব!’ অমুদা রসিয়ে রসিয়ে তার এই অভিজ্ঞতা বলেছিল আমাদের চায়ের দোকানের আড্ডায়।
জামাইষষ্ঠীর পরের দিন ঘুপচি চায়ের দোকানে ছিল এইসব গল্পগাছা ঘুগনির উপর টক-ঝাল টপিংস।
বেশিদিনের কথা নয়। আমাদের বন্ধু রিন্টুর শ্বশুরবাড়ির জামাইষষ্ঠী ছিল এক মহাযজ্ঞ। ওর শ্বশুরবাড়ি দেবানন্দপুর। বছর কুড়ি-পঁচিশ আগেও দেবানন্দপুরের ঘোষবাড়িতে জামাইষষ্ঠীর দিন দুপুরে বিরাট বারান্দায় বিরাশি জন জামাইয়ের পাত পড়ত সারসার। এ-মাথা থেকে ও-মাথা! তিন পুরুষের জামাই বাবাজীবনরা হাজির হত এক যৌথ শ্বশুরবাড়িতে। সব থেকে বয়স্ক যে জামাই, তাঁর বয়স কমবেশি আশি। আর সবথেকে ছোটো জামাইয়ের বয়স তিরিশ বছর। তিন তরফের মেয়ে, তাঁদের জামাই। তাঁদের আবার নাতনি। তাঁদের কত্তারা। সে এক পদ্মলতার হিলিবিলি। অথবা ‘সুতোর শেষ কোথায়’ ধাঁধা। প্রত্যেকের জন্য ছিল আলাদা আলাদা আসন। সেই আসন তৈরি হত প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান সংখ্যায়। তৈরি করতেন তিন তরফের তিন বৃদ্ধা শাশুড়ি এবং বয়স্ক বৌমারা। চৌকো চৌকো চটের উপর সুঁচ-সুতোয় ফুটে উঠত টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া পাখির দল, অথবা বাঘে-ঘোড়ার মুখ, কোনোটাতে ফুল-লতাপাতা। তার উপর জমাটি লেখা— ভালো থেকো, জামাই আদর, মায়ের আশীর্বাদ, আলোয় ভুবন ভরা, আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ইত্যাদি। জামাইরা এসে একে একে আসনে বসত। বিভিন্ন বয়সের শাশুড়িরা তাঁদের নির্দিষ্ট জামাইদের ‘ষাট ষাট’ বাতাস দিতেন। অপূর্ব এক দৃশ্য। শঙ্খ বেজে উঠত পাড়া-ঘর কাঁপিয়ে। প্লেটে প্লেটে সেজে উঠত বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা সেরা সেরা মিষ্টি। ওদিকে একদল শাশুড়ি সামাল দিচ্ছে হেঁসেল। পোলাওয়ের হাঁড়ি নামাতে ডাকতে হত ষন্ডামার্কা ছেলেদের। ঘোষ বাড়ির জামাইষষ্ঠীর পাতে ক্যাটারিংয়ের নো-এন্ট্রি। পোলাও থেকে কচি পাঁঠার ঝোল, দুধ-শুক্তো থেকে রসমালাই—সবটাই শাশুড়িদের চুড়ির ঝনাৎ ঝনাৎ মিউজিকের সুফল। যত চুড়ির আওয়াজ বাড়ে, তত মাংস কষার গন্ধে ভরপুর হয়ে ওঠে বাড়ির উঠোন, বারান্দা, এঘর-ওঘর। আড্ডায় আড্ডায় মেতে ওঠে জামাইরা। সত্তর বছরের জামাইবাবুর টাক নিয়ে মজা করতে ছাড়ে না পঁয়ষট্টির শ্যালিকা। এক অমল আলোয় ভেসে যায় ঘোষ বাড়ির জামাইষষ্ঠী অনুষ্ঠান। সব অনুষ্ঠান যেমন শেষ হয়। পরের দিন ঘোষ বাড়ি ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়। জামাইষষ্ঠীর পরের দিন বিরাশিটি আসন ভাঁজ করে তুলে রাখা হত বড়ো এক ট্রাঙ্কে। পরের বছর জামাইষষ্ঠীতে বেরিয়ে আসার প্রতীক্ষায়। এই এক বছরের ফাঁকে কোথাও কোনও তরফের কোনো মেয়ের বিয়ের সংবাদ দেবানন্দপুরে এলেই ঘোষ বাড়ির শাশুড়িরা ভেজা চুল শুকোনোর ফাঁকেই উঠোনে বসে যাবে পা ছড়িয়ে চটের চৌকো টুকরো আর নানা রঙের উল সহ সুঁচ নিয়ে। নতুন আসন তৈরি হবে। সময়ের গর্ভে সব যেমন মিলিয়ে যায়। এখন আর সেই উন্মাদনা চোখে পড়ে না। রিন্টু বলছিল, কেউ সময় পায় না আর! সে অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধই হয়ে গেল!
নগর সভ্যতার দ্রুত ধাবমান জীবন চিরদিন পাশ কাটিয়ে গিয়েছে এই ধরনের লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানগুলিকে। নগর জীবনে জামাই কবে ষষ্ঠীর ব্রত উদযাপনে ঢুকে গেল—এনিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিন বাংলার মেয়েদের ব্রতকথার তালিকায় আছে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ ব্রতর কথা। বীজ ধারন তথা সন্তানলাভের ব্রত। অরণ্যের কাছে গিয়ে এই ব্রত পালনের মূল কথা হল, প্রকৃতি এই সময়ে ফলে ফলে যৌবনোচ্ছলা। অরণ্যে অরণ্যে সেই সব ফলের বীজ ধারণ করবে ধরিত্রী মা। গর্ভবতী হবে। নতুন বৃক্ষের ভ্রুণ আসবে। বর্ষার জল তাকে সমৃদ্ধ করবে। প্রকৃতিতে এই গর্ভসঞ্চারের সময় নারী প্রকৃতির আকুতি তৈরি হয় গর্ভবতী হবার এই জ্যৈষ্ঠ মাসে। অরণ্যষষ্ঠী ব্রত পালনে তারই প্রার্থনা। সন্তানবতী হওয়া ও সন্তানের মঙ্গলকামনা। তখন জীবন ছিল অরণ্যনির্ভর। কিন্তু সেখানে ‘জামাই বাবাজীবন’ কীভাবে সেঁদিয়ে গেল এবং ঠিক কোন সময় থেকে বলা মুশকিল! ‘হুতুম’ তথা কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার যাবতীয় উৎসব নিয়ে ‘উজ্জুগ’-এর কথা বলে গেলেও ‘জামাইষষ্ঠী’ নিয়ে একটি শব্দও ব্যয় করেননি। স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত সেকালের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের কথা লিখে রেখে গিয়েছেন। সেইসব লেখায় ষষ্ঠীপুজোর কথা উল্লেখ থাকলেও ‘জামাই’-এর মঞ্চে প্রবেশ ঘটেনি। তবে! শহর কলকাতা গড়ে উঠেছে ‘ইয়েস, নো, ভেরিগুড’ নিয়ে ব্রিটিশদের ল্যাজ ধরে! পায়রা উড়ানো বাবু বৃত্তান্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু জামাইবাবাকে নিয়ে ‘উজ্জুগ’ চোখে পড়ছে না। দীনবন্ধু মিত্র ১৮৭২ সালে লিখলেন ‘জামাই বারিক’ নাটক। সেখানেও জামাইষষ্ঠী নেই।
নাটকের কথা যখন উঠলই তখন সিনেমা বাদ যাবে কেন! প্রথম সবাক বাংলা সিনেমা দেখল বাঙালি ১৯৩১ সালে ১১ এপ্রিল। সিনেমার নাম ‘জামাইষষ্ঠী’। পরিচালক ছিলেন অমর রায়চৌধুরী। নায়ক জামাই কুবেরের ভূমিকায় অমরবাবু নিজে, স্ত্রীর ভূমিকায় মিস গোলাপ আর শাশুড়ির চরিত্রে রানিসুন্দরী দেবী। স্ল্যাপস্টিক ধরনের মজার ছবি। সেই প্রথম সবাক ছবিই বা জামাইদের নিয়েই কেন! বোধহয় ততদিনে বাঙালির জীবনে উড়ে ঠাকুর, টিকিওয়ালা ব্রাহ্মণ, শুচিবাই বিধবার মতোই চুনোট করা ধুতি গিলে করা পাঞ্জাবি পরা জামাইয়ের টাইপ চরিত্র মার্কেটে এসে পড়েছে। কারণ, উনবিংশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত ষষ্ঠীপুজোর আচার থাকলেও জামাইয়ের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ‘শ্বশুর বধ পালা’ দেখার সুযোগ বাঙালির হয়নি বলেই মনে হয়। তা হলে কলকাতায় বাবাজীবনের ভুঁড়ি নিয়ে ভূরিভোজে প্রবেশের দিনকাল যথেষ্ট আধুনিক। কিন্তু গাঁ-গঞ্জের ব্যাপারটা আলাদা।
পীত - সুগন্ধি ঘৃতে অন্ন সিক্তকৈল।
চারিদিগে পাতে ঘৃত বাহিয়া চলিল।।
কেয়াপত্র-কলার খোলা-ডোঙ্গা সারি সারি।
চারি দিগে ধরিয়াছে নানা ব্যঞ্জন ভরি।।
দশ প্রকার শাক, নিম্ব-সুকুতার ঝোল।
মরিচের ঝাল, ছানা বড়া, বড়া ঘোল।।
দুগ্ধ তুম্বী, দুগ্ধ কুষ্মাণ্ড, বেসরি, লাফরা।
মোচাঘণ্ট, মোচাভাজা, বিবিধ শাকরা।।
বুদ্ধ কুষ্মাণ্ড বড়ীর ব্যঞ্জন অপার।
ফুল বড়ী ফল মূলে বিবিধ প্রকার।।
শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, পঞ্চদশ পরিচ্ছদের শ্লোক ২০৮ থেকে ২১৮ অবধি এক বিস্তৃত তালিকা আছে, যা মহাপ্রভু খেতে পছন্দ করতেন এবং তাঁকে দেওয়া হত ভোগ হিসাবে। আর সুপক্ক এইরকম বিভিন্ন পদ আজকেও রান্না হয়ে জামাই আদরেই দেওয়া হয় মহাপ্রভুকে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিনে। জামাইষষ্ঠীর দিন ধামেশ্বর মহাপ্রভু তাঁর সেবাইতদের কাছে জামাই আদরে পূজিত হন। জামাই-সাজে সাজিয়ে তোলা হয় তাঁকে। ধুতি-পাঞ্জাবিতে একেবারে জামাই-রাজা বেশ।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু হয় নগর সংকীর্তন। সমবেত কন্ঠে গান ভেসে যায়, ‘উঠো উঠো গোরাচাঁদ নিশি পোহাইল/ নদীয়ার লোক সব জাগিয়া উঠিল...।’ দিন শুরু হয় মহাপ্রভুর রূপোর থালায় আম, জাম, কলা, কাঁঠাল ইত্যাদি ফল, রূপোর বাটিতে ক্ষীর, রূপোর গ্লাসে জল সহকারে। সেবাইত পরিবারের মহিলারা আমপাতা, বাঁশপাতা, দূর্বা, লাল সুতো দিয়ে হাতপাখায় বেঁধে ‘ষাট-ষাট’ বাতাস দেন। বাতাস দিতে দিতে ছড়া কাটেন, ‘জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাইষষ্ঠী ষাট ষাট ষাট/ ভাদ্র মাসে চাপড়াষষ্ঠি ষাট ষাট ষাট...।’ বারোমাসের সব ষষ্ঠীর নামগান শেষ হবার পর মহাপ্রভুকে দেওয়া হয় ফলার। জামাই বলে কথা! গলায় তাঁর রজনীগন্ধা গোলাপ ফুলের মালা। গায়ে দেওয়া হয় সুগন্ধী আতর। ফলারে দেওয়া হয় চিঁড়ে, মুড়কি, দই, আম, কলা, আর মেয়েদের হাতে করে তৈরি নানান মিষ্টি। বিশেষ করে নারকেল, ক্ষীর, এলাচ, কাজু, কিসমিস বাটা গুড়ে পাক দিয়ে বিভিন্ন ছাঁচের মিষ্টি থাকবেই।
চৈতন্যদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর আপন ভাই ছিলেন যাদব মিশ্র। যাদব মিশ্রের ছেলে মাধব মিশ্র তথা মাধব গোস্বামী ছিলেন বিখ্যাত পন্ডিত। লিখেছেন বিখ্যাত বই ‘শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল’। চৈতন্যদেবের এই শ্যালকরাই উদ্যোগী ছিলেন জামাইষষ্ঠী পালনে। ওই বংশের ত্রয়োদশ পুরুষ এবং মন্দির পরিচালন সমিতির অন্যতম প্রদীপ্ত গোস্বামী বলছিলেন সেই ঐতিহ্যের কথা। বর্তমানে সেবাইত সংখ্যা শতাধিক। তাঁরাই পরম্পরা ও ঐতিহ্য রক্ষা করে আজও পালন করে চলেছেন ধামেশ্বর মন্দিরে শ্রীমন্ মহাপ্রভুর জামাইষষ্ঠী। ভুল শুধরে দিয়ে প্রদীপ্তবাবু বলেন, ‘সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি চৈতন্য মহাপ্রভু। তার আগে তিনি আমাদের জামাই শ্রীমন্ মহাপ্রভু।’
মহাপ্রভুর মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন শুরু হয়েছে। কচুশাক, মোচা, শুক্ত, পাঁচ রকম ডাল, পাঁচ-ভাজা, থোড়, বেগুনপাতুরি, ছানার ডালনা, ধোকার ডালনা, লাউ, চালকুমড়ো, পোস্ত বড়া থেকে শুরু করে পোস্তর নানা পদ থাকবেই। আমক্ষীরও থাকবে।
নবদ্বীপের মাইল কুড়ি পূবে গেলে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজবাড়ি। সেখানেও দেখা যায়, ধুমধাম করে জামাইদের নিয়ে জামাইষষ্ঠী পালন করছেন স্বয়ং রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে। নবদ্বীপের কমবেশি ২৫০ বছর পরেও জামাইষষ্ঠীর রাজকীয় উপস্থিতি দেখা যায়। রাজার একাধিক স্ত্রীর একাধিক কন্যা এবং তাঁদের জামাইদের নিয়ে জামাইষষ্ঠী উদযাপনের কথা এখনও লোকমুখে হারিয়ে যায়নি। গল্পকথায় প্রচারিত আছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র জামাইদের মধ্যাহ্নভোজের পর সোনার লবঙ্গ ছুড়ে ছুড়ে দিতেন। ‘রাজার জামাই’ বলে কথা!
রাজশেখর বসু একটি ‘অসমাপ্ত’ গল্প লিখেছিলেন চন্দননগরে শ্বশুরবাড়িতে জামাইষষ্ঠীতে জামাইয়ের আসা নিয়ে। চন্দননগরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান যদুগোপাল অধুনা মন্দা অবস্থাতেও ধারদেনা করে তাঁর পাঁচ জামাই নিয়ে ধুমধাম করে জামাইষষ্ঠী পালন করেন। কিন্তু তাঁর ছোটো মেয়ে ফুল্লরার কর্তা মহাবীর পেশায় ব্যবসাদার বড়বাজারে কাপড়ের ব্যবসা। সে এই ধরনের রাক্ষুসে ভুরিভোজের ভীষণ বিরোধী। গল্পের অংশটুকু দেখা যাক—
‘জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি ফুল্লরা মহাবীরকে বলল, জামাইষষ্ঠী এসে পড়ল, আমি ছোড়দার সঙ্গে পরশু চন্দননগর যাচ্ছি। দিদিরা ত আগেই পৌঁছে গেছে। এবারকার ভোজে একটু বেশী ঘটা হবে। এখান থেকে দুজন বাবুর্চি যাবে, একগাড়ি আইসক্রীমও যাবে।
মহাবীর বলল, ঘটা করার কি দরকার। আমরা পাঁচটি জামাই কি পাঁচটি রাক্ষস যে ভূরিভোজন না করলে চলবে না? শ্বশুর মশায়ের তো শুনেছি মোটারকম দেনা আছে, এখন অনর্থক খরচ করাই অন্যায়। তুমি আর তোমার দিদিরা বারণ কর না কেন?
ফুল্লরা বলল, বছরের মধ্যে একটি দিন পাঁচ জামাই আর পাঁচ মেয়ে একত্র হবে, একটু ভাল খাওয়া দাওয়া করবে, জামাইকে তত্ত্ব পাঠানো হবে—এতে অন্যায়টা কি? তোমার দোকানদারি বুদ্ধি, কেবল মুনাফাই বোঝ। বংশের যা দস্তুর আছে তা কি ছাড়া যায়? দেনা তো সব বনেদী বংশেরই থাকে, তার জন্যে ভাববার কিছু নেই, আমার ভাইরা শোধ করবে।
মহাবীর বলল, আমার কিন্তু ঘোর আপত্তি আছে।
খরচ করবেন আমার বাবা, তোমার মাথাব্যথা কেন? যেরকম একগুঁয়ে তুমি, জামাইষষ্ঠী বয়কট করবে না তো?
নিমন্ত্রণ পেলে অবশ্যই রক্ষা করব, কিন্তু পোলাও কালিয়া চপ কাটলেট সন্দেশ রাবড়ি চর্ব্য-চূষ্য রাজভোগ খাব না।
তবে খাবে কি, কচু না ছাতু?
ছাতুই খাব।
তোমার যেরকম বেয়াড়া গোঁ, ওখানে না যাওয়াই তোমার পক্ষে ভাল, একটা কেলেঙ্কারি করে বসবে। নিমন্ত্রণের চিঠি এলে একটা ছুতো করো, দোকানে কাজের চাপ, তাই যেতে পারব না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মহাবীর বলল, নিমন্ত্রণ এলে নিশ্চয়ই যাব, না এলেও যাব।
দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করবে নাকি?
দক্ষযজ্ঞে শিব নিজে যান নি, অনুচর বীরভদ্রকে পাঠিয়েছিলেন। সেরকম অনুচর আমার নেই, তাই নিজেই যাব। আমি কোনও উপদ্রব করব না, নিঃশব্দে অসহযোগ জানাবো।’
গল্পটি তো উনি শেষ করেননি। আমরা জানতে পারলাম না মহাবীর কী কান্ডটা বাঁধিয়েছিল ‘শ্বশুর বধ পালা’ এর ক্লাইম্যাক্সে।
দেখা যাচ্ছে, কলকাতায় এই উনিশ শতকেও জামাইষষ্ঠী নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ছিল না। যতটুকু ছিল বাংলার গাঁ-গঞ্জে, মফস্সলে। এখনও পর্যন্ত জামাইষষ্ঠীর দিন লোকাল ট্রেনে দেখা যায় সেই পুরানো দৃশ্য—ঢাউস ব্যাগ নিয়ে নতুন জামাকাপড় পরে কর্তা-গিন্নি সঙ্গে টোনা-টুনি চলেছে শ্বশুরবাড়ি। শনি, রবি, ছুটির দিন পড়লে তো প্যাকেজ ট্যুর—শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ।
কলকাতার ফ্ল্যাটে উঠে আসা মফস্বলের অরুন্ধতী ও বিশ্বজিৎ বিকেল থেকেই সেজেগুঁজে রেডি। ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছেন। ছোটো বড়ো নানা হটপটে জামাইয়ের পছন্দের আইটেম সব। মেয়ে আসবে গাড়ি নিয়ে। সঙ্গে নাতি। তারপর তাঁদের নিয়ে যাবে কোথাও একটা। সেখানে নাকি একটা গোটা টেবিলে সাজানো থাকবে জামাইষষ্ঠীর সমস্ত কিছু। হাতপাখা, ধান, দুব্বো, চন্দন, ফুল কিছুই নিয়ে যেতে হবে না। সব ব্যবস্থা করাই আছে। খুব আনন্দ অরুন্ধতী ও বিশ্বজিতের। সন্ধ্যায় মেয়ে গাড়ি নিয়ে এল নিজে চালিয়ে। অরুন্ধতী গাড়িতে উঠতেই ছ’বছরের নাতির প্রথম প্রশ্ন, ‘দিম্মা তুমি এত ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছ কেন! থাকবে আমাদের বাড়ি!’ অরুন্ধতী হেসে এড়িয়ে যায়, ‘থাকবো বলেই তো যাচ্ছি!’ মেয়ের ছোট চুল নড়ে ওঠে, ‘ব্যাগে কী আছে মা!’ অরুন্ধতী জানে মেয়েকে, ‘ও কিছু না! দেখতেই পাবি!’
ঝাঁ চকচকে আলোয় মোড়া এক ঠান্ডা জগতে ঢুকে পড়ল অরুন্ধতী মেয়ের সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে জামাই এসে হাজির। বিরাট ঘরের দিকে দিকে টেবিলে টেবিলে জামাই বরণ শুরু হয়ে গিয়েছে। ওরা একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। টেবিলের উপর প্রদীপ জ্বলছে। বরণ ডালা। সাদা দস্তানা ঢাকা খুলে দিতেই মিষ্টির প্লেট। সরবতের গ্লাস। ‘আসুন মা, আপনার কাজ শুরু করে দিন!’ জামাই সপ্রতিভ। ‘বাবা বসুন, সরবত খান!’ অরুন্ধতী জামাইয়ের জন্য ঘড়ি-পাজামা-পাঞ্জাবি আর মেয়ের জন্য শাড়ির প্যাকেট বার করে। দুটি মেয়ে এসে শাঁখ বাজিয়ে উলু দিয়ে চলে গেল অরুন্ধতীর ‘ষাট ষাট’ বাতাসের সঙ্গে। শেষ হতেই টেবিল ভরে উঠল খাবারের ডিশে। অরুন্ধতী নিজের আনা ব্যাগটা কোলের উপর আঁকড়ে ধরে। ফিসফিস করে মেয়েকে বলে, ‘পোস্তোর বড়া, মোচার কোপ্তা আর মুড়ি-ঘন্ট এনেছিলাম। অনিরুদ্ধ তো ভালোবাসে! দে ওকে একটু! তোর জন্য নারকেল তক্তি এনেছি ক্ষীর দিয়ে!’
‘মা! বাইরের খাবার এখানে অ্যালাউ করে না! তুমি এসব আবার করতে গেলে কেন! থাক ব্যাগে! নিয়ে যাবো বাড়িতে!’
অরুন্ধতী চুপ করে যায়। খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে রাত হয় বেশ! মেয়ে-জামাই ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে যায়।
রাত নামে আবাসনের আকাশে। অরুন্ধতীদের ব্যালকনি ভেসে থাকে অন্ধকারে। বিশ্বজিৎ রাতে একটু ব্যালকনিতে বেতের চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ। অরুন্ধতী নিজের ঘরে খুটখাট কাজ করে। আলমারি খুলে বার করে একটা চটের আসন। কোলে নিয়ে বসে খাটের উপর। চটের উপর সুঁচ-সুতোর কাজ। মুখোমুখি বসে আছে দুটি টিয়াপাখি। তাদের লাল ঠোঁটে ধরা আছে রঙিন সুতোয় জমাট করে লেখা—‘ভালো থেকো।’