নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: এ যেন সরাসরি বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। অন্তত মধ্য জুনের সেই দুপুরটা তেমনই ছিল সিঙ্গুরের বলরামবাটির মালিক পরিবারের কাছে। বলা নেই কওয়া নেই, সেদিন বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন মালিক পরিবারের ‘মৃত’ ছেলে। বিষয়টি এক বা দু’দিনেরও নয়! দীর্ঘ ২৫বছর পরে ঘরে ফেরেন সমর মালিক। ফলে, একপ্রকার বাকরুদ্ধ হয়ে যান বৃদ্ধ বাবা সুধীর মালিক থেকে আত্মীয়রা পর্যন্ত। তবে হ্যাঁ, সমরকে চিনেছিলেন অনেকেই। সেই ১২ বছর বয়সের হারিয়ে যাওয়া সমরকে চিনতে ভুল করেননি কাকিমা। প্রতিবেশী বন্ধুরাও চিনেছিলেন। চোখে কম দেখলেও পুরনো কথা স্মরণ করে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন বৃদ্ধ সুধীরবাবুও। গরিবের সংসারে হইহই পড়েছিল।
তবে ‘খোকাবাবু ফিরলেও’ গরিব কৃষকের ঘরে তাঁকে নিয়ে শুরু হয়েছে অন্য বিড়ম্বনা। দীর্ঘ ২৫ বছর ভিনরাজ্যে থেকে, জীবনযন্ত্রণায় ভুগে সমর ভুলেছেন তাঁর মাতৃভাষা বাংলা। ছেলের মুখে ‘পাপা’ ডাক বড় বিঁধছে জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা সুধীরবাবুকে। তবু ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে, সেই আনন্দেই ভাষার সমস্যাটা মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছে মালিক পরিবার। সমস্যা বুঝতে পারছেন সমরও। কিন্তু বাংলা যে আর বলতেই পারেন না, তিনিই বা কি করবেন! সমর বলেন, বহু বছর বাইরে ছিলাম। নানা সমস্যায় দিন কেটেছে। বাংলায় কথা বলার সুযোগও ছিল না। তাই হিন্দিটাই এখন ভাষা হয়ে গিয়েছে। জানি, সকলের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু বাংলা শিখতে আবার সময় লাগবে।
তবে এতবছর পরে ফিরলেন কেন? ছিলেনই বা কোথায়? সেসব নিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছরের যন্ত্রণার সাতকাহন সকলকে শোনাচ্ছেন সমর। তিনি বলেন, হাতে টাকা ছিল না। অনেক কষ্টে কিছু টাকা জমাতেই ১৫ বছর লেগে গেল। তার আগে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। গত সপ্তাহে হাওড়ার ট্রেনে উঠে পড়ি। তারপরে হাওড়াতে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। সিঙ্গুর আর বলরামবাটি নামটা মনে ছিল। তাঁর বাবা সুধীর বলেন, ছেলের ভাষা বোঝা সমস্যা। কিন্তু এটুকু বুঝেছি ও আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেই। এক স্যাকরার বাড়িতে ছোটবেলার কাজে ঢুকেছিল। সেই ভিনরাজ্যে পাঠিয়ে দেয়। প্রথম দু’বছর যোগাযোগ ছিল। তারপরে আর হদিশ পাইনি। সেই স্যাকরারও মৃত্যু হল। আর আমার ছেলেও হারিয়ে গেল। অনেকেই বলেছিলেন, ওঁর মৃত্যু হয়েছে। আমরা বিশ্বাসও করতাম। তবে বাবার মন তো! মানতে চাইত না।
রাজস্থানের জয়পুর থেকে রবিবার দুপুরে বাড়ি ফিরেছেন সমর। ১২ বছর বয়সে তাঁকে জয়পুরে পাঠিয়ে ছিলেন গ্রামেরই এক স্যাকরা। সেখানে অত্যাচারের কারণে তিনি পালিয়ে যান। পরে একাধিক রেঁস্তরায় কাজ করে বেঁচেছিলেন। কিন্তু টাকা জমাতে পারেননি। কারণ, অধিকাংশ জায়গাতেই বিপদে পড়া সমরকে টাকা দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সকলকে চমকে দিয়ে ‘মৃত’ সমর বাড়ি ফিরেছেন। নিজস্ব চিত্র