Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কুশিক্ষা হটাতে আজও ডেভিড হেয়ারের দরকার

তিনটি মন্ত্রে দেশের শিক্ষাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি বাহিনী। এই তিনটি মন্ত্র হল শিক্ষাকে গেরুয়া তত্ত্বের মোড়কে পুরে দেশের নতুন প্রজন্মকে আকণ্ঠ গেলাও।

কুশিক্ষা হটাতে আজও ডেভিড হেয়ারের দরকার
  • ২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্দীপন বিশ্বাস: তিনটি মন্ত্রে দেশের শিক্ষাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি বাহিনী। এই তিনটি মন্ত্র হল শিক্ষাকে গেরুয়া তত্ত্বের মোড়কে পুরে দেশের নতুন প্রজন্মকে আকণ্ঠ গেলাও। শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ করে দাও এবং শিক্ষার ওপর আরএসএসের আধিপত্যবাদ কায়েম করে মানুষকে বিদ্বেষ মনোভাবাপন্ন, অসহিষ্ণু হিন্দু করে তোলো। তার মনে অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায় সম্পর্কে বিষ ঢুকিয়ে দাও। চুলোয় যাক বিজ্ঞান শিক্ষা, গণতান্ত্রিক বোধ এবং যুক্তিনিষ্ঠ মনন তৈরির প্রক্রিয়া। 

Advertisement

গোবরে কিংবা গোরুর দুধে সোনা থাকে অথবা গোমূত্রে সর্বরোগ নিরাময় হয়— এই ভ্রষ্ট বিজ্ঞানচেতনায় জেগে উঠুক সারা দেশ। মূর্খতার অন্ধকূপে মানুষকে ঠেলে দাও। এই যে ‘হিন্দু হিন্দু’ রব তুলে সমাজকে একটা অশান্তির আবহের মধ্যে ঠেলে দেওয়া, এর মূল উদ্দেশ্যই হল রাজনীতিতে একচেটিয়া ক্ষমতা কায়েম করা। পৃথিবীর তাবড় ফ্যাসিস্ট শাসকরা এই পথে হেঁটেই মানুষকে চিরকাল ক্রীতদাস বানাতে প্রয়াসী হয়েছেন। মোদিও চাইছেন মানুষকে ধর্মীয় ক্রীতদাসে পরিণত করতে।   
শিক্ষায় এমনই হিঁদুয়ানির আবেগ জেগেছিল আজ থেকে দুশো বছরেরও আগে বেশ কিছু মানুষের মধ্যে। তাঁরা যুগপুরুষ রামমোহন রায়ের মধ্যে জুজু দেখেছিলেন। কেননা নবজাগরণের ঋত্বিক রাজা রামমোহন রায় যেভাবে নতুন যুগের নতুন বার্তা নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তাতে করে হিন্দু সমাজের অধঃপতনের আশঙ্কা করেছিলেন কলকাতার তৎকালীন রক্ষণশীলরা। নতুন যুগের নতুন ছেলেমেয়েদের মধ্যে রক্ষণশীলতার বীজ বপন করতে উদ্যোগী হন তাঁরা। আর সেটা সম্ভব রক্ষণশীল শিক্ষার মাধ্যমেই। তাই ছাত্রদের রক্ষণশীলতার পাঠ দিতে তাঁরা স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন।  
পাশাপাশি রামমোহনও ভাবছিলেন, এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যেখানে সমস্ত কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ছাত্ররা নতুন ভাষা, নতুন ভাবনা ও আধুনিক মনস্কতার অনুবর্তী হবেন। হিন্দু সমাজের মধ্যে যেসব কুসংস্কার আছে, তা দিয়ে নব্য চেতনার মানুষ তৈরি হতে পারে না। পাশ্চাত্য শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন যুগ সৃষ্টি করতে হবে। হিন্দুকে হিন্দুত্বের গণ্ডি থেকে বের করতে না পারলে, সে উদার আকাশের সন্ধান পাবে না। 
এই দুই ভাবনার পাশাপাশি ছিল আরও একটি ভাবনা। এদেশে ব্যবসা করতে এসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে ইংরেজরা ভাবল, এখানে তাদের শাসনের নিগড় আরও গভীরে প্রোথিত করতে হলে এখানকার ছেলেদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া দরকার। সেই সঙ্গে দরকার ছিল প্রচুর ইংরেজি জানা যুবকের।  ইংরেজি শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মান্তরিতকরণের কাজটাও তাদের এজেন্ডায় ছিল।
এই তিনটি ভাবনা চলছিল একইসঙ্গে। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্টের বাড়িতে রক্ষণশীলরা একটি সভার আয়োজন করেন। হাইড ইস্ট ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার এবং কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস। ১৮১৩ থেকে ১৮২২ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। মনে রাখা দরকার, ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তাই সময়ের প্রয়োজনেই তখন দরকার ছিল অনেক ইংরেজি জানা যুবকের। যাই হোক, সেই সভায় শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রামদুলাল দে, গোপীমোহন দে, হরিমোহন ঠাকুর, কালীশঙ্কর ঘোষাল সহ আরও অনেকেই। তাঁদের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জন। স্কুল গড়তে গেলে টাকার দরকার। কথাটা উঠতেই সকলেই তাঁদের টাকার থলি উপুড় করে দিলেন। একটা মিটিংয়েই চাঁদা উঠল পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রয়োজনে আরও দেবেন। কিন্তু একটা শর্ত, রামমোহনের কাছ থেকে কোনও চাঁদা নেওয়া চলবে না। কারণটা কী! কারণ রামমোহন বিধর্মী। তিনি কথায় কথায় হিন্দুধর্মের অবমাননা করেন। আসলে রক্ষণশীলদের ভয় ছিল রামমোহনকে। একবার তিনি এখানে মাথা গলাতে পারলে তাঁদের উদ্দেশ্য পণ্ড হতে পারে। যাই হোক, কয়েকদিন পর দ্বিতীয় সভা বসল ইস্টেরই বাড়িতে। সেখানেই ঠিক হল কলেজের নাম রাখা হবে ‘হিন্দু কলেজ’। অর্থাৎ হিন্দু নামের মধ্য দিয়েই হিন্দুত্বকে রক্ষা করার একটা প্রয়াস শুরু হয়ে গেল। ওদিকে বিধি সম্ভবত আড়ালে মুচকি হাসলেন। 
যে রামমোহনকে বাদ দিয়ে গণ্যমান্য হিন্দুরা কলেজ গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর সঙ্গে ডেভিড হেয়ারের সাক্ষাৎ হওয়াটা ছিল ইতিহাসের একটা অনায়াস চমক। ‘আত্মীয় সভা’ রামমোহন এবং হেয়ার সাহেবকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। রামমোহন চেয়েছিলেন ‘আত্মীয় সভা’র মাধ্যমে দেশীয় ছাত্রদের মন ও মানসিকতায় আধুনিকতার আলো জ্বালাতে। কিন্তু ডেভিড হেয়ার বললেন, এতে তা সম্ভব নয়। বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সফল করতে গেলে প্রয়োজন আরও বড় পদক্ষেপের। সে কারণেই কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। তবে কি স্কুল? রামমোহনের সংশয় ভেঙে হেয়ার সাহেব বললেন, কলেজ গড়ে তোলা দরকার। যে কলেজ শেখাবে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান এবং সাহিত্য। পাশ্চাত্যের অগ্রগতির ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে যেন টেনে নিয়ে যায় নতুন পৃথিবীর দিকে। রামমোহন বুঝেছিলেন, যোগ্য মানুষের সন্ধান তিনি পেয়েছেন। এবার তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভাবলেন, ডেভিড হেয়ারের নেতৃত্বে তাঁর স্বপ্ন সফল হয়ে উঠবে। হেয়ারের হাত ধরেই হিন্দুরা পাশ্চাত্য শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত হয়ে উঠবেন। 
খ্রিস্টান মিশনারিরাও চাইছিলেন, তাঁদের মিশনারি স্কুলগুলির দায়িত্ব নিন হেয়ার। কিন্তু তিনি সে পথে পা বাড়াননি। তিনি এবং রামমোহন উভয়েই চেয়েছিলেন দেশে নতুন শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে। হিন্দু কলেজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর কাছে ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। তিনি বুঝেছিলেন, রামমোহনকে এর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। তাহলে রক্ষণশীলদের প্রতিবাদে সবটাই ভণ্ডুল হয়ে যাবে। তাই তিনি রামমোহনকে হিন্দু কলেজের থেকে কিছুটা দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
স্থান সমস্যা, ছাত্র জোগাড় করা, পাঠ্যসূচি তৈরি করা, যোগ্য শিক্ষক জোগাড় করা এসব হেয়ার সাহেব নিজেই করতে শুরু করলেন। অনেকে তাঁকে বিশেষ পদ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি কোনও পদই গ্রহণ করেননি। কিন্তু প্রতিটি কাজেই ছিল তাঁর অপরিসীম উৎসাহ! ছাত্রদের খেলাধূলা, তাঁদের জন্য আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা, তাঁদের শৃঙ্খলার দিকটির দেখাশোনা করা, সবকিছু তিনি নিজেই করতেন। সনাতনপন্থীরা মাঝেমধ্যে তাঁর কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁকে আটকাতে পারেননি। ডিরোজিওর ছাত্ররাও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। নবজাগরণের নেপথ্য কারিগর তিনি। যেন মশাল জ্বালিয়ে সবার হাতে সেটি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ওই দেখো আলোর সরণি, এগিয়ে যাও। সমস্ত পৃথিবী তোমাকে ডাকছে। 
আজ থেকে ঠিক আড়াইশো বছর আগে ১৭৭৫ সালে জন্ম ডেভিড হেয়ারের। এবছর তাঁর জন্মের সার্ধ দ্বিশতবর্ষ। দুশো বছর আগে কুসংস্কারাচ্ছন্ন  হিন্দু শিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। বাঙালির মনন ও মেধাকে তিনিই প্রথম আধুনিক শিক্ষার আলোকে আলোকিত করেছিলেন। কিছুটা ম্লান হয়ে এলেও বাঙালির সেই অস্মিতা আজও দীপ্যমান।  
যে রক্ষণশীলতার বীজ বপন করে হিন্দু সমাজকে আরও সংস্কারপন্থী করে তুলতে চেয়েছিলেন তৎকালীন বাবুরা, তা যেন ডেভিড হেয়ার নামক ব্যক্তিত্বের দমকা হওয়ায় মূলোৎপাটিত হল। আর ডিরোজিও নামক ব্যক্তিত্বের ঝোড়ো হাওয়ায় তা কোথায় উড়ে চলে গেল!
হেয়ার সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন, এই সময়ে ভারতকে আধুনিক শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত করে তুলতে গেলে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজন। একদা যে ঘড়ির ব্যবসার জন্য তিনি সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এখানে এসেছিলেন, সেই লক্ষ্য কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। নতুন এক সংকল্প তাঁকে টেনে নিয়ে গেল অন্যপথে। ঘড়ির ব্যবসা তিনি বিক্রি করে দিলেন। ডেভিড হেয়ারের সাহচর্য্যটুকু না পেলে রামমোহনের পক্ষে কাজটা একটু কঠিনই হতো। আবার পাশাপাশি এটাও বলতে হয়, রামমোহন এবং হেয়ার সাহেবের স্বপ্নকে দ্রুত রূপায়ণে মস্ত ভূমিকা পালন করেছিলেন ডিরোজিও। একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে সমগ্র দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হেয়ারের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ছিল এক আধুনিক মানসিকতা, ছিল স্বচ্ছতা। ছিল বিজ্ঞানমনস্কতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধরনের উদার ও যুক্তিবাদ নির্ভর শিক্ষাভাবনার পথিকৃৎ ছিলেন রামমোহন। হেয়ার জানতেন, শুধু হিন্দু কলেজ নয়, আরও নীচের তলা থেকে উৎসাহদান শুরু করতে হবে। তাই শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি খোঁজ নিতেন। স্কুল, পাঠশালা পরিদর্শন করতেন। সেখানে বই, খাতা দিয়ে ছাত্রদের উৎসাহ জোগাতেন।  ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষা দিলেও মনে করতেন, মাতৃভাষাকেও যথার্থ সম্মান করা দরকার। তাই তিনি ছাত্রদের বাংলা ভাষা শিক্ষায় উৎসাহ দিতেন। এদেশের পণ্ডিতদের মতো তিনিও হাতে বেত নিয়ে ঘুরতেন। তবে কাউকে কোনওদিন বেত্রাঘাত করেননি। স্কুলের গেটের সামনে তিনি তোয়ালে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, কাউকে অপরিষ্কার বা ক্লান্ত দেখলে তাঁর মুখ মুছিয়ে দিতেন। 
তাঁর সাহসিকতা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা, কলকাতা মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান, এসব নিয়ে অনেক কাহিনি রয়েছে। ১৮৩৬ সালে তিনিই প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করিয়েছিলেন প্রথম ভারতীয় ডাক্তার মধুসূদন গুপ্তকে দিয়ে। তখন হিন্দুরা ডাক্তারি পড়লেও বেওয়ারিশ লাশ ছুঁতেন না। ওতে নাকি হিন্দুত্ব নষ্ট হয়। সেই আজগুবি কুশিক্ষাকে ভেঙে দিয়েছিলেন ডেভিড হেয়ার। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কুলীন হিন্দুরা রাজা রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে আন্দোলনে নেমেছিলেন। মধুসূদন গুপ্ত যেদিন শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, সেদিন মেডিক্যাল কলেজের সব গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ আশঙ্কা ছিল কট্টর সংরক্ষণশীলরা মেডিক্যাল কলেজ আক্রমণ করতে পারে। 
আজও সেই কুসংস্কারের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।  শিক্ষায় ঢুকে পড়েছে কুশিক্ষার বেনোজল। চলছে গণতন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করার প্রচেষ্টা। তাই আজ লড়াইয়ে জন্য দরকার ডেভিড হেয়ারের মতো একটি বিদ্যুৎশিখা। কুশিক্ষার আগল ভেঙে যিনি বার্তা দেবে মনুষ্যত্বের, যুক্তিবাদের, ধর্মনিরপেক্ষতার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ