Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রদীপের নীচে অন্ধকার

মোদি জমানায় দেশের মধ্যবিত্ত-গরিব মানুষ কেমন আছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই গোয়েবলসের কথা মনে পড়ে যেতে বাধ্য।

প্রদীপের নীচে অন্ধকার
  • ৩০ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মোদি জমানায় দেশের মধ্যবিত্ত-গরিব মানুষ কেমন আছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই গোয়েবলসের কথা মনে পড়ে যেতে বাধ্য। পল যোশেফ গোয়েবলস নাৎসি জার্মানির তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। হিটলারের অন্যতম প্রধান এই সহযোগীর সাড়াজাগানো তত্ত্ব ছিল, একটা মিথ্যাকে দশবার বললে সত্যের মতো শোনায়। তাঁর এই তত্ত্বের উপর ভর করেই হিটলার সেই সময়ে জার্মানিতে প্রায় ‘মহামানবে’ পরিণত হন। গোয়েবলস বলতেন, মিথ্যা যখন বলবে তখন বড় মিথ্যাই বলবে। নরেন্দ্র মোদি, নির্মলা সীতারামনরা গোয়েবলসের অনুরাগী কি না তা জানার উপায় নেই। তবে দেশের মানুষকে একই অসত্য কথা বারবার বলে সত্য প্রমাণ করার যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মোদিবাহিনী, তা ওই কুখ্যাত গোয়েবলসীয় প্রচারকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। মুশকিল হল, মিথ্যার ধারাবাহিক প্রচার করতে গিয়ে এই সরকার জাতীয়-আন্তর্জাতিক কোনও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টকেও মান্যতা দিতে নারাজ। যেমন, দিনকয়েক আগে মোদি সরকার দাবি করেছে, চলতি অর্থবর্ষের শেষে জিডিপি বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৬.৫ শতাংশ। মূলত চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া, পণ্যের কেনাকাটা বৃদ্ধি, পরিষেবা রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়া, গত সাত মাসে সর্বনিম্ন মূল্যবৃদ্ধি, প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি বৃদ্ধি, কাজের বাজারের উন্নতির মতো দেশের অর্থনীতি নিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে এই প্রচারই চালাচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। প্রদীপের আলোর নীচে অন্ধকারটা সুকৌশলে চেপে যাওয়া হচ্ছে। কীরকম?  ভারতে বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি ছাপিয়েছে। সরকারি মতেই এর মধ্যে ৯৫ শতাংশই মধ্যবিত্ত-গরিব শ্রেণিভুক্ত। বাকি ৫ শতাংশ অর্থনীতির মানদণ্ডে ধনী, অতি ধনী ও ধনকুবের। অঙ্কের নিয়মেই বিপুল জনসংখ্যার কারণে ভারতের জিডিপি এখন কমবেশি ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসেবে মাথাপিছু বার্ষিক জিডিপি হওয়া উচিত ২৮০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু সামনের সারির ওই ৫ শতাংশকে বাদ দিলে মধ্যবিত্ত-গরিব ৯৫ শতাংশের বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপি কমে দাঁড়াবে ১১৩০ ডলার। মোদি-নির্মলারা এতে লজ্জা না পেলেও মাথাপিছু এই আয় আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও কম। আবার ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এবং আইএলও-র ২০২৪-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে ২০১১ সালে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ। ২০২১-এ তা বেড়ে হয়েছে ৬৪ শতাংশ। তার মানে ১৮-৬০ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ (অর্থাৎ ৯০ কোটি)। কেন্দ্রই দাবি করেছে, ২০২৪-এ দেশের কর্মসংস্থানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪.৩ কোটি। তর্কের খাতিরে এই হিসাব মেনে নিলেও দেশে এখন কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৬ কোটি। সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকনমির রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪-তে মোদি জমানার প্রথম বছর দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৫.৪৪ শতাংশ। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়িয়েছে ৭.৮ শতাংশে। কর্মসংস্থানের হার সেপ্টেম্বরে ৩৮ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৮ শতাংশ। তবু ‘বিকশিত ভারতে’ ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর গোয়েবলসীয় প্রচার চলছে!  মোদি জমানায় দেশের ৯৫ শতাংশ মধ্যবিত্ত-গরিব মানুষের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ, বেকারত্বের হার দেখেই বোঝা যায় এই বিপুল জনসম্পদ কেমন জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু এটাই শেষ নয়। আরও আছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এদেশে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনেরও আগে ১৮২০ সালে জাতীয় আয়ে গরিব মানুষের ভাগ ছিল ১০.৮ শতাংশ। ২০২৩-এ তা নেমেছে ৬.৪ শতাংশে। একইভাবে জাতীয় আয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভাগ বা অংশীদারিত্ব ১৮২০ সালে ছিল ১৫ শতাংশ। ২০২৩-এ তা কমে হয়েছে ১৪.৯ শতাংশ। অন্যদিকে, এই সময়কালে ধনকুবেরদের অংশীদারিত্ব ৭৩.২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৭.৮ শতাংশ। আইএলও-র রিপোর্ট বলছে, ভারতে ২০০৬ সালে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৯.৩ শতাংশ। ২০২৩-এ তা নেমেছে শূন্যের কাছাকাছি, ০.১ শতাংশে। ঘণ্টায় গড়ে দেশের একজন কর্মী যা আয় করেন, তা বিশ্বে নীচের দিক থেকে পঞ্চম। আর পেশাদার ও ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের স্থান নীচের দিক থেকে সপ্তম। এই নুন আনতে পান্তা ফুরনো, নরক যন্ত্রণার যাপনই মোদি জমানায় উন্নয়নের সেরা নিদর্শন। যেখানে উন্নয়নের কথা বলতে গেলে ২০০ বছর পিছিয়ে যেতে হবে। যা গোয়েবলসীয় প্রচারে আড়াল করার প্রাণপণ চেষ্টা হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ