সেতু যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু কখনো কখনো সেই সেতুই হয়ে ওঠে ভয়ের কারণ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তেমনই কয়েকটি সেতুর কথা জানালেন কালীপদ চক্রবর্তী
সেতু যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু কখনো কখনো সেই সেতুই হয়ে ওঠে ভয়ের কারণ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তেমনই কয়েকটি সেতুর কথা জানালেন কালীপদ চক্রবর্তী
মানুষের যাতায়াত সহজ করতে সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশ ততই এগিয়ে থাকে। নদী, পাহাড়, উপত্যকা কিংবা সমুদ্র— প্রকৃতির বাধা পেরিয়ে পথকে সহজ করতে সেতুর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে অধিকাংশ সেতু নদীর ওপর নির্মিত হলেও বিশ্বের নানা প্রান্তে পাহাড়-পর্বতের খাঁজে খাঁজে তৈরি হয়েছে কিছু রোমাঞ্চকর—কখনো বা ভীতিপ্রদ সেতু। এদের মধ্যে অনেকগুলো এতটাই বিপজ্জনক যে, সেগুলোর ওপর দিয়ে চলাফেরা করতেও অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়।
প্রথমেই নাম করা যেতে পারে রয়েল জর্জ ব্রিজের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত এই ঝুলন্ত সেতুটি দেশটির অন্যতম উঁচু সেতু। প্রায় ৯৬৯ ফুট উচ্চতায় ঝুলে থাকা এই সেতুর ওপর দাঁড়ালে অনেকেরই ভয়ে শ্বাস আটকে আসে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১ হাজার ২৬০ ফুট। এই সেতু দু’টি বিশাল পাহাড়কে যুক্ত করেছে। নীচ দিয়ে বয়ে চলা নদী আর ওপরে দুলতে থাকা সেতু— সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা সত্যিই খুব রোমাঞ্চকর, আবার ভয়েরও বটে।
এরপর রয়েছে ফ্রান্সের আউগুইলা দি মিদি ব্রিজ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ হাজার ৬০৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই সেতুর নীচে তাকানোই যেন দুঃসাহসিক কাজ। দু’টি পর্বতের মাঝখানে ঝুলে থাকা এই ছোটো সেতুর এক পাশে রয়েছে কংক্রিটের কাঠামো, আর অন্য পাশে পৌঁছাতে হয় গুহার মতো এক পথে। চারপাশের পরিবেশই যেন ভয়ের আবহ তৈরি করে।
সুইৎজারল্যান্ডের গ্যাডমেনের কাছে সুইস আল্পসে অবস্থিত ট্রিফট সাসপেনশন ব্রিজ। এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এবং উঁচু পদচারী ঝুলন্ত সেতু। ২০০৪ সালে নির্মিত এই সেতুটি প্রায় ৩২৮ ফুট উঁচু এবং ৫৫৮ ফুট দীর্ঘ। সরু এই সেতু পার হওয়ার সময় নীচের খাদ আর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে মনে ভয় ধরিয়ে দেয়।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কাছে অবস্থিত ক্যারিক এ রিড রোপ ব্রিজ একেবারেই আলাদা ধরনের। দড়ি দিয়ে তৈরি এই সেতুটি প্রায় ৬৫ ফুট লম্বা এবং ১০০ ফুট উঁচুতে ঝুলে আছে। দুই পাথুরে দ্বীপকে যুক্ত করা এই সেতুটি দেখতে যেমন ভয়ংকর, তেমনই আকর্ষণীয়ও। আশ্চর্যের বিষয় হল স্থানীয় জেলেরা প্রতিদিনই এটি ব্যবহার করেন!
এরপর রয়েছে কানাডার বিখ্যাত ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ। ১৮৮৯ সালে নির্মিত এই সেতুটি সবুজ ঘন বনের মাঝখানে ক্যাপিলানো নদীর ওপরে রয়েছে। প্রায় ৪৫০ ফুট দীর্ঘ ও ২৩০ ফুট উঁচু এই সেতুটি হাঁটার সময় দুলতে থাকে, যা অনেকের কাছেই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বনের ওপর ভাসমান একটা দোলনা।
সবশেষে, চীনের হুবেই প্রদেশের সিদু রিভার ব্রিজের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০০৯ সালে উদ্বোধনের সময় এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সেতুগুলোর একটি। প্রায় ১ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সেতুটি পাহাড়ঘেরা পরিবেশে নির্মিত। নীচ দিয়ে প্রবাহিত নদী আর চারপাশের গভীর খাদ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনই রোমহর্ষকও।
এই সেতুগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সাহস আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য উদাহরণ। ভয় আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে তারা আজও মানুষকে টানে—কেউ দেখে মুগ্ধ হয়, আর কেউ শিউরে ওঠে!