Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণতন্ত্রের বিপদ: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পরাধীন

আজকাল কেউ ক্যাগ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করে? কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া শেষ ১১ বছরে এমন কোনও বিস্ফোরক রিপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে?

গণতন্ত্রের বিপদ: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পরাধীন
  • ২২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: আজকাল কেউ ক্যাগ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করে? কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া শেষ ১১ বছরে এমন কোনও বিস্ফোরক রিপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে? ক্যাগ নামক একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ছিল স্বাধীন স্বশাসিত এবং নির্ভয়। আজ সেই ক্যাগ সম্পর্কে মানুষের কোনও আগ্রহ নেই। সেই সংস্থা বছরভর কী করে, কী কী রিপোর্ট দেয়, সংসদে সেইসব রিপোর্ট কখন পেশ হয়, সরকার তার অ্যাকশন টেকেন রিপোর্টে কী লেখে, সে সম্পর্কে কোনও সামান্য ঢেউ তৈরি হয় না। কেন? কারণ ক্যাগ কর্তারা ও অফিসারদের বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে কোনও রিপোর্ট দিলে, কী হতে পারে। দিল্লি থেকে গুরগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে হঠাৎ কেন ১৪০০ শতাংশ নির্মাণব্যয় বেড়ে গেল? কেন ৩৬০০ কোটি টাকার তহবিল অন্য খাতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে? এইসব প্রশ্ন তুলেছিল ক্যাগ রিপোর্ট। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনে গরিবের চিকিৎসা বিমা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের অডিট করে ক্যাগ দেখেছিল লক্ষ লক্ষ রোগীর নামে চিকিৎসা বিমার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে যে রিপোর্ট দেখানো হয়েছে, সেই রোগীরা আসলে মৃত। অর্থাৎ এই রোগীদের চিকিৎসাই হয়নি ওই বিমার আওতায়। সাড়ে ৭ লক্ষ এরকম পেশেন্টের নাম পাওয়া গিয়েছে, যাদের মোবাইল নম্বর একই। বিরোধীরা এই অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ দেখা যায় ঠিক যে অফিসাররা এই অনিয়মগুলি অডিট করেছিল, তাদের বদলি করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ক্যাগ কর্তৃপক্ষ বার্তা পেয়ে গিয়েছিল যে, এই আমলে কী করা উচিত। তাই ক্যাগ বলে আর কোনও জুজু নেই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। অতীতে ক্যাগ রিপোর্ট ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক অন্যতম প্রধান অস্ত্র। এখন ক্যাগ নামক কোনও দপ্তর আছে একথাই আর  বিশেষ মনে নেই। সবথেকে উদ্বেগজনক হল, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান শর্ত হল স্বাধীনতা। কিন্তু ক্যাগ আর স্বাধীন নেই। সুতরাং শক্তিশালীও নেই। এবং সেই কারণে এখন নখদন্তহীন। 

Advertisement

২০১৫ সালে অর্থ কমিশন সুপারিশ করেছিল যে, নির্বাচন কমিশনার মনোনয়ন ব্যবস্থায় একটি কলেজিয়াম প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হোক। প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন কে হবেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। কিন্তু সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি শুনছিল। বিষয় ছিল, নির্বাচন কমিশনের সংস্কার করা দরকার। সর্বাগ্রে নির্বাচন কমিশনারদের মনোনয়ন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক পক্ষপাতহীন ব্যবস্থা করা দরকার। ১৯৫০ সালে নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর প্রথম থেকে ছিল একজন মাত্র নির্বাচন কমিশনারের পদ। এরপর ১৯৮৯ সাল থেকে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনার ব্যবস্থা চালু হয়। সংবিধানের ৩২৪ নং ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল স্বচ্ছ, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ভোটপ্রক্রিয়া সম্পাদন করা। এবং সংবিধানের অধিকারবলে কমিশন এমন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যা সম্পূর্ণ স্বাধীন। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে নিয়ে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতেন। এই ছিল নিয়ম। 
২০২৩ সালের ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশিকা জারি করে জানায়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের একটি বিশেষ কমিটি নিয়োগ করবে। কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। অর্থাৎ ২০১৫ সালে ঠিক যে সুপারিশ করেছিল অর্থ কমিশন। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, পার্লামেন্ট একটি আইন আনুক। অর্থ কমিশনের সুপারিশ বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গ্রাহ্য করেনি। এবার সুপ্রিম কোর্টের রুলিং-ও গ্রাহ্য করল না। মোদি সরকার যে কমিটি তৈরি করল, সেখানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, তাঁরই মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রইলেন না। সুতরাং, কমিটির কাঠামোই এমন করে দেওয়া হল যে, কোনও সিদ্ধান্তে সর্বদাই প্রধানমন্ত্রীর কথাই শেষ কথা হবে। কারণ তিনজন সদস্য। একজন মাত্র বিরোধী দলনেতা। বাকি দুজন সরকারের। অতএব ভোটাভুটি হলে সর্বদাই জয়ী হবে সরকারপক্ষ। ঠিক এই নিয়ম মেনেই বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। সুতরাং এরপর নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এখন অথবা আগামী দিনে আর পক্ষপাতহীন এবং স্বাধীন থাকা সম্ভব নয়। 
সংবিধান সভায় নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সময় বি আর আম্বেদকর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সরকারি শাসকদের কোনও ভূমিকাই রাখা উচিত হবে না। রাখলেই ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করবে সরকার। তাঁর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চকে ডেকে পাঠিয়েছিল পিএমওতে একটি বৈঠকে যোগ দিতে। যা কার্যত অসাংবিধানিক। 
নির্বাচন কমিশন কতটা শক্তিশালী ছিল এক সময়। প্ররোচনামূলক বক্তৃতা দেওয়ার অপরাধে শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব থ্যাকারেকে নির্বাচন কমিশন ডিসকোয়ালিফায়েড করে দিয়েছিল। ১৯৯১ সালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের সঙ্গে আইনমন্ত্রী বিজয় ভাস্কর রেড্ডির প্রথম সংঘাত তৈরি হয়। নিয়ম করে সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশিকা পাঠাত যে সংসদে নির্বাচন কিংবা ভোটার সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর যেন কমিশন তৈরি করে দেয়। টি এন সেশন এই ব্যবস্থায় আপত্তি তোলেন। তিনি আইনমন্ত্রীকে বলেন, নির্বাচন কমিশন আপনাদের ক্লার্ক নয়। কোনও তথ্য পরিসংখ্যান ডেটা লাগলে বলবেন। আমরা সেটা পাঠিয়ে দেব। কিন্তু সংসদের প্রশ্নের উত্তর কমিশন তৈরি করে দেবে না। বিজয় ভাস্কর রেড্ডি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাওকে নালিশ করেন। নরসিমা রাও ক্ষুব্ধ হয়ে সেশনকে বলেছিলেন, আপনি আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন না। ইউ আর নট কোঅপারেটিভ। টি এন সেশন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমরা কোঅপারেটিভ সোসাইটি নয়। আমরা নির্বাচন কমিশন! আমাদের কাজ ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। আজ নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আচরণ ও যুক্তি ও বিরোধীদের আক্রমণ করা দেখলে টি এন সেশনকে রূপকথার অলীক নায়ক মনে হবে। বিশ্বাস করা যায় না যে নির্বাচন কমিশন কখনও স্বাধীন শক্তিশালী এবং একক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ছিল। আজ নির্বাচন কমিশন নিছক একটি দুর্বল আজ্ঞাবহ  সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা যা বলছে সেটা সমর্থন করলেই কমিশন ভালো, এটা বলা হচ্ছে না। কিন্তু কমিশনের চারিত্রিক দৃঢ়তাটাই হারিয়ে গিয়েছে। কারণ তাঁদের নির্বাচন করেন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী। অতএব যে কোনও সরকারি কর্মী অথবা মন্ত্রীর মতোই তাঁদের অনুগত থাকতেই হবে। 
আধুনিক ভারত নির্মাণের কারিগর যোজনা কমিশন। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা।  শিল্পস্থাপনের রোডম্যাপ। গ্রামীণ ভারতের উন্নয়ন স্ট্র্যাটেজি। সব ছিল যোজনা কমিশনের মস্তিষ্কপ্রসূত। জওহরলাল নেহরু যোজনা কমিশনের একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলনাবিশের সহায়তায়। কিন্তু মূল ভাবনা ছিল সুভাষচন্দ্র বসু। সুভাষচন্দ্র যখন ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন, তখনই তিনি পরিকল্পনা কমিটি তৈরি করে জওহরলাল নেহরুকে অনুরোধ করেছিলেন সভাপতি হতে। স্বাধীন ভারতের যোজনা কমিশন কমবেশি ওই কাঠামোরই আদলে তৈরি হয়েছিল। যোজনা কমিশন যে পরিকল্পনা করত, সেই অনুযায়ী বাজেটও তারাই বরাদ্দ করত। তাদের ছিল তহবিল বরাদ্দ করার ক্ষমতা। যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের ক্ষমতাও ছিল বিপুল। 
২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট নতুন প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লা থেকেই ঘোষণা করেছিলেন যোজনা কমিশনকে বদলে ফেলা হবে। ২০১৫ সালে সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়। যোজনা কমিশন বাতিল করে দিয়ে তৈরি হল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ট্র্যান্সফর্মিং ইন্ডিয়া আয়োগ অর্থাৎ নীতি আয়োগ। ২০২৫ সালে নীতি আয়োগের ১০ বছর পূর্ণ হল। ভারতবাসী এখন জানে যে, নীতি আয়োগ নামক একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে আদৌ তাদের মধ্যে কোনও আগ্রহ, আলোচনা, চর্চা, প্রত্যাশা আছে কি না। কেন নেই? কারণ নীতি আয়োগ আজ পর্যন্ত এমন কোনও প্ল্যান কিংবা প্রকল্প উদ্ভাবন করেছে যা ভারতের জীবনযাপন অনেক বদলে দিয়েছে কিংবা আধুনিক ভারতের দিশা নির্দেশ করেছে? এমন একটিও উদাহরণ নেই। নীতি আয়োগের গুরুত্ব কতটা তার প্রমাণ হল, নীতি আয়োগের কোনও প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা নেই। সব ক্ষমতা অর্থমন্ত্রকের। বস্তুত বর্তমান সরকার চেয়েছিল সরকারের পাশাপাশি আরও একটি ক্ষমতার সমান্তরাল মেরু থাকবে কেন? তাই প্ল্যানিং কমিশনকে ধ্বংস করতে হবে। নীতি আয়োগের সামান্যতম গুরুত্বই  নেই। নীতি আয়োগ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়। তবু ছিল অসীম গুরুত্বপূর্ণ। যার তাৎপর্য নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। 
নির্বাচন কমিশন, ক্যাগ, মানবাধিকার কমিশন, সিবিআ‌ই, তথ্য কমিশন, লোকপাল প্রতিটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের একই হাল। ক্রমেই এই প্রতিষ্ঠানগুলি মাহাত্ম্য হারিয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য যা চরম বিপজ্জনক! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ