সৌম্যকান্তি ত্রিপাঠী, বেলদা: একটু খুনসুটি, একটু মন কষাকষি, বর-কনেযাত্রীদের মধ্যে একটু ঠেস দিয়ে কথাবার্তা—এই নিয়ে গ্রামের বিয়েবাড়ি। এবং এটাই দস্তুর। বিয়ে মিটে গেলে সব শেষ। সবার সঙ্গে আত্ময়তার বন্ধন। কিন্তু বিয়ের পরও বাপের বাড়ির লোকজনকে অপমান করে যাবেন বরপক্ষ, তা মানতে পারেনি নববধূ। প্রতিবাদে বাবা-মায়ের হাত ধরে বউভাতের আসর ছাড়লেন নববধূ। থমকে থেমে যায় সানাইয়ের সুর। পুরো পন্ড হয়ে যায় পাত্রের বাড়ির ভুরিভোজের এলাহি আয়োজন। এমন ‘দাবাং’ মেয়ের প্রতিবাদী সত্তাকে কুর্নিশ জানিয়েছে সমাজের বিশিষ্টজনদের একটা বড় অংশ। পাশাপাশি ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন সংসারে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকেই।
ঘটনাটি দাঁতনের একতারপুর গ্রামের। তবে, ঘটনার সূত্রপাত বিয়ের দিন, সোমবার। সেদিন আপ্যায়নে সামান্য ত্রুটি থেকেই বর ও কনেপক্ষের সামান্য ঝামেলা বাধে। সেই ঝামেলা গড়ায় বউভাতের দিনও। পাত্রের বাড়ির লোকজন নাগাড়ে অপমান করে যেতে থাকে বরপক্ষকে। এমনটাই অভিযোগ। শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি। খবর যায় পুলিসে। তারা এসে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু, নববধূ বেঁকে বসেন। তিনি বউভাতে আসা বাবা-মা’কে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমাদের বাড়ির লোককে যাঁরা এভাবে অপমান করেন, তাঁদের সঙ্গে আমার ঘর করা সম্ভব নয়।’। বলেই বাবা-মা’য়ের হাত ধরে সটান বাড়ি চলে যান নববধূ।
সোমবার ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন হয়েছিল চন্দ্রকোণার ক্ষীরপাইয়ে মেয়ের বাড়িতে। প্রায় ১০০ জন বরযাত্রী নিয়ে রাত বারোটা নাগাদ কনের বাড়ির কাছাকাছি একটি স্থানে পৌঁছয় পাত্র। সেখান থেকে ডিজে বাজিয়ে, বাজি ফাটিয়ে ফের যাত্রা শুরু। রাত দুটো নাগাদ বিয়ের আসরে উপস্থিত হন সকলে। তারপর খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। শুরুতে পকোড়া থেকে কফি, মকটেল সহ হরেক খাবার। রাত আড়াইটে নাগাদ খেতে বসেন সকলেই। বেশি রাতে বরযাত্রীরা খেতে বসায় খানিক সমস্যায় পড়তে হয় কনেপক্ষকে। কি সেই সমস্যা? এক বরযাত্রী বলছিলেন, ‘পানীয় জল চেয়ে সময় মতো পাইনি। বেশিরভাগ খাবার ঠান্ডাও হয়ে গিয়েছিল।’
বড় মেয়ের বিয়েতে আয়োজনের কোনও ঘাটতি রাখেননি ক্ষীরপাই এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী। বরযাত্রীরা দেরিতে আসায় আয়োজনে কিছুটা ঘাটতি থেকে যায়। বেশি রাতে পানীয় জল জোগাড় করতে সমস্যায় পড়তে হয়। ত্রুটির কথা স্বীকারও করে নেন ওই ব্যবসায়ী। বিষয়টা সেদিনের মতো মিটেও যায়। বুধবার দাঁতনের এক্তারপুর এলাকায় পাত্রের নতুন বাড়িতে আয়োজন ছিল রিসেপশনের। ছিল ঢালাও আয়োজন। পোলাও থেকে চিলি চিকেন। খাসির মাংস থেকে মিষ্টি, গলদা চিংড়ি—কোনও কিছুরই অভাব ছিল না। সন্ধ্যার পর ক্ষীরপাই থেকে প্রায় ১০০ জন কনেযাত্রী নিয়ে হাজির হন মেয়ের বাবা নিজেই। চলছিল খাওয়া-দাওয়া। হঠাৎ করে ছেলের বাড়ির লোকজন বিয়ের দিনে আপ্যায়নের ত্রুটি কটাক্ষ করতে শুরু করেন। মেয়ের বাবা বলছিলেন, ‘বিয়ের দিন সমস্যা হয়েছিল। আমি স্বীকার করে নিয়েছি। এদিন আমাদের লোকজন খেতে বসতেই টিপ্পনি কেটে অপমান করেন ওরা। আমার মেয়ে প্রতিবাদ করে। মেয়ে বলে, আমি আর এখানে থাকতে চাই না। যারা এভাবে অপমান করে তাদের সঙ্গে ঘর করব না। তখনই আমি তাকে নিয়ে চলে আসি। আমাদের বেশ কয়েকজন আত্মীয়কেও মারধর করা হয়েছে।’ তবে আমি চাই নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি মিটিয়ে নিয়ে দু’জনে সংসার করুক। দাঁতন-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দেবেশ দাস বলেন, ‘অনভিপ্রেত ঘটনা। আমরা চাই, বিষয়টি দু’পক্ষ মিটিয়ে ফেলুক।’