নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যের একাধিক দপ্তরে সাইবার হানা! কলকাতা পুরসভা, উচ্চশিক্ষা দপ্তর সহ বেশ কয়েকটির ওয়েবসাইটে ঢুকে পড়েছিল প্রতারকরা। পুরোটাই র্যানসামওয়্যার। আর তাই স্তব্ধ হয়ে যায় এইসব ওয়েবসাইটের যাবতীয় অনলাইন প্রক্রিয়া। টার্গেট ছিল রাজ্যের ডেটা সেন্টার বা তথ্যভাণ্ডার। যদিও সেই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি সাইবার হানাদাররা। পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ডেটা সেন্টার ‘আইসোলেট’ করে দেওয়া হয়েছে। তার জন্য ই-ডিস্ট্রিক্ট সহ বিভিন্ন পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটলেও বড়োসড়ো ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি রাজ্যকে।
কোথায় কোথায় বিঘ্ন ঘটেছে পরিষেবায়? নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, স্কুলশিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন পোর্টাল ‘ডাউন’ ছিল। বেতন সংক্রান্ত আইওএসএমএস পোর্টালও ঠিকঠাক খুলছে না। সমস্যা হচ্ছিল উচ্চ মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড ডাউনলোডের পোর্টালেও। স্কুলস্তরে বৃত্তি দেওয়ার ন্যাশনাল মেরিট কাম মিনস স্কলারশিপ পোর্টালও কার্যত বন্ধ ছিল। এদিকে, আবেদনের শেষ দিন ছিল বুধবারই। এদিন পোর্টাল সচল হয়েছে। তাতে জানানো হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন জানানো যাবে।
র্যানসমওয়্যার হল এক ধরনের ক্ষতিকর কম্পিউটার সফটওয়্যার, যা কোনও কম্পিউটার বা তথ্যভাণ্ডারে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ফাইল তালাবন্দি করে দেয়। এরপর সেই তথ্য আবার ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার জন্য হামলাকারীরা মুক্তিপণ দাবি করে। সূত্রের খবর, ১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ রাজ্যের সংশ্লিষ্ট এই সমস্ত দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট এবং অনলাইন ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। আঁচ করতে পেরেই আক্রান্ত সার্ভারগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে রাজ্যের তথ্যকেন্দ্র বা স্টেট ডেটা সেন্টারকেও (দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম) গত শনিবার দুপুরের পর থেকেই সামগ্রিকভাবে অন্যান্য নেটওয়ার্কের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। যাতে কোনো অননুমোদিতভাবে কেউ এই সাইবার হামলার আড়ালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা তথ্যের দখল না নিতে পারে। তবে রাজ্যের ক্ষেত্রে মুক্তিপণ দাবির আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
সাইবার হানা সম্পর্কে জানা মাত্রই রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরকে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিবিদদের অবিলম্বে স্টেট ডেটা সেন্টার পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁরা তথ্যভাণ্ডারে থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যের নিরাপত্তা যাচাই করার পাশাপাশি সার্ভারে ‘অ্যান্টি ভাইরাস’ বসানোর কাজ করেন। শনিবার থেকে দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচাই করা হয় প্রায় ২ হাজার ৪০০টি ভার্চুয়াল ব্যবস্থাপনা। রবিবার থেকে ধীরে ধীরে অনলাইন ব্যবস্থাপনা ফের চালু হয়। অর্থদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যদপ্তরের পরিষেবা, খাদ্য এবং ভূমি সংস্কার সংক্রান্ত অনলাইন পরিষেবা, অন্নপূর্ণা যোজনা সহ একাধিক অনলাইন পরিষেবা চালু হলেও কলকাতা পুরসভা, কৃষি বিপণন, ক্ষুদ্র-ছোটো ও মাঝারি শিল্প এবং রাজ্যের সরকারি দরপত্র সংক্রান্ত ব্যবস্থার বেশ কয়েকটি অনলাইন পরিষেবা এখনও পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনার পর সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত তদন্তকারী প্রযুক্তিবিদদের পক্ষ থেকে একটি আট পাতার বিস্তারিত রিপোর্ট হাতে এসেছে রাজ্যের। সেই রিপোর্টে জনসাধারণের ব্যবহার সংক্রান্ত অনলাইন পরিষেবাকে হামলাকারীদের ‘প্রাইমারি এন্ট্রি’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হামলার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল বলেও রিপোর্টে উঠে এসেছে। এই ঘটনার জেরে প্রত্যেক দপ্তরের কাছে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশিকা পাঠিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে ভার্চুয়াল ব্যবস্থা, পাসওয়ার্ড, অ্যান্টি ভাইরাস, ভিপিএন এবং শুধুমাত্র অনুমোদিত সফটওয়্যার ব্যবহারে। সাফ বলা হয়েছে, ৯০ দিনের বেশি কোনো পাসওয়ার্ড রাখা যাবে না। রাজ্য প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, এই ঘটনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারি অনলাইন পরিষেবার সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।