নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: জঙ্গলের রাস্তা পার হতে গোপাল শরণাপন্ন হয়েছিলেন মধুসুদন (শ্রীকৃষ্ণ) দাদার। গোপালের গুরুদেবের বাবার বাৎসরিক কাজে গোপালকে মধুসুদন দিয়েছিলেন দুধ ভর্তি একটি ছোট্ট ঘটি। সেই দুধ আর শেষ হয়নি! নিন্দুকেরা বলেন, বর্ষাকালে বালি কারবারিদের স্টক ইয়ার্ডের বালি যেন মধুসুদন দাদার দেওয়া দুধের ঘটি! যতই বালি তোলা হোক, স্টক আর শেষ হয় না। সেই স্টকের বালির আর এক আজব কারবার প্রকাশ্যে এসেছে। রানিগঞ্জের তিরাট থেকে একটি সরকারি বালির চালান ইস্যু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকে ট্রাক্টরে করে বালি যাবে পুরুলিয়া থানা এলাকায়। একশো কিউবিক মিটার (সিএফটি) বালির জন্য এতদূরে আসা! দুর্গাপুর, আসানসোলে একশো সিফটি বালির দাম সাড়ে চার হাজার টাকা। পুরুলিয়ায় দাম আরও কম হওয়া কথা। ট্রাক্টরের তেল খরচ দিয়ে সেই বালি পরিবহণ করা সম্ভব! লাভের গুড় তো পিপড়ে খাওয়ার জোগাড়! তা সত্ত্বেও বালি যাচ্ছে পুরুলিয়ায়। আসলে, এখানেই লুকিয়ে রয়েছে বর্ষায় বালি লুটের রহস্যজনক খেলা।
যদিও বৈধ বালি ব্লকের কর্তা মলয় পাঁজা বলেন, ‘ক্রেতা যেখানে বালি নিয়ে যেতে চাইবে আমাদের সেখানেই বালির চালান ইস্যু করতে হবে। আমার ম্যানেজারও সেই কাজ করেছেন। এবার ক্রেতার দায়িত্ব আমার স্টক ইয়ার্ড থেকে বালি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া।’ অতিরিক্ত জেলাশাসক অরণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বেনিয়মের নির্দিষ্ট অভিযোগ এলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা এখন ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালাচ্ছি।’
টানা দেড় মাস বৃষ্টিপাতের জেরে দু’কূল ছাপিয়ে বইছে দামোদর ও অজয়। প্রশাসনিকভাবে নদী থেকে বালি তোলার নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়েছে। নিয়ম মেনে বৈধ বালি ব্লকের মালিকরা প্রশাসনের কাছ থেকে স্টক চালান সংগ্রহ করে বিপুল বালি মজুত করে রেখেছে। এই অবস্থাতেও বালি লুট অব্যাহত বলে অভিযোগ। ভরা নদীতে বোট নামিয়ে পাম্পের সাহায্যে জল ছেঁকে বালি তোলা হচ্ছে। ট্রাক্টরে লোড করে ছড়িয়ে পড়ছে জেলাজুড়ে। ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের চাপে আসানসোল দক্ষিণ থানার পুলিস ডামরা থেকে ১১টি বালির ট্রাক্টর বাজেয়াপ্ত করেছে। যাদের কোনও চালান ছিল না।
এবার বালি লুটের নতুন পন্থা শুরু হয়েছে। ট্রাক্টরেও বালি চালানের নথি তৈরি হচ্ছে। এবং তা করা হচ্ছে অনেক দূরত্বের। এটি করার পিছনে কারণ, যত বেশি দূরত্ব মাল পরিবহণ করতে হবে চালানের বৈধতা ততবেশি সময় পর্যন্ত থাকে। এখন রানিগঞ্জ থেকে পুরুলিয়ার দূরত্ব একশো কিলোমিটারের বেশি হলে ট্রাক্টরের গতি অনুযায়ী প্রায় দশ ঘণ্টা চালানের বৈধতা থাকার কথা। এবার সেই চালান ট্রাক্টরে রেখে স্থানীয় এলাকায় বহু টিপ বালি ফেলে দেওয়া সম্ভব। কেউ চালান দেখতে চাইলে শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মতো ওই একই চালান বার বার সামনে আনে। এতে পুলিসের কেস খেতে হয় না। আবার বালি কারবারের রমরমাও বজায় থাকে। অভিযোগ, শুধু পশ্চিম বর্ধমান জেলা নয়। পূর্ব বর্ধমান থেকে বাঁকুড়া, বীরভূম সর্বত্র এই খেলা চলছে। লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব ফাঁকি যাচ্ছে সরকারের। আবার বর্ষার বালি বলে বেশি করে পকেট কাটা হচ্ছে সাধারণ মানুষের। আর বালির জোগান দিয়ে চলেছে ‘মধুসুদন দাদার ঘটি’ বালির স্টক ইয়ার্ড।-নিজস্ব চিত্র