রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার ও পার্টিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে তোলাবাজি-কাটমানির ভূত। বাংলাজুড়ে পদ্ম শিবিরের ছোটো-বড়ো-মেজো নেতারা দু’হাতে লুটপাট চালাচ্ছে বলে আম জনতার অভিযোগ। এমনকি বিজেপি বিধায়কদের একাংশ চমকে-ধমকে কোটি কোটি টাকা তুলছে—এই দাবিতে ক্ষোভ দানা বাঁধছে পাড়ায় পাড়ায়। স্বয়ং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পার্টির অভ্যন্তরে এ নিয়ে বোমা ফাটিয়েছেন। এই আবহে এক নয়া আঙ্গিকে ‘গেরুয়া তোলাবাজি’র এক অনন্য নজির তৈরি করেছেন প্রশাসন ও দলের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা-নেত্রী। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, প্রোমোটার—কারও থেকেই তাঁরা তোলা চাইছেন না। পাছে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়! তাঁদের শিকার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক-মন্ত্রী-নেতারা। যাঁরা জনমানসে আগে থেকেই ‘রোজগেরে’ তথা পরীক্ষিত তোলাবাজ হিসাবে পরিচিত। গত ১৫ বছরে পাড়ার রিকশ স্ট্যান্ড থেকে শিল্পপতিদের থেকে আদায় করা টাকার একটা বড়ো অংশ দাবি করছে সংশ্লিষ্ট বিজেপি নেতৃত্ব। বিনিময়ে কারও জেলযাত্রা ‘আটকে’ গিয়েছে। কেউ ডিম থেরাপি থেকে বেঁচে গিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আদি বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘এই ফরমুলায় লাভই লাভ। একদিকে, সংশ্লিষ্ট তৃণমূল নেতারা পুলিশে অভিযোগ করছে না। অন্যদিকে, তোলাবাজির এই নয়া কুচির কাজ সমাজের বৃহত্তর অংশকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করছে না।’
বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন বঙ্গ বিজেপির রাজ্য কমিটির এক সদস্যও। তাঁর মন্তব্য, ‘তোলাবাজির এই সুচারু কার্যকলাপের কথা আমাদের কানে এসেছে। কিন্তু কোনো অভিযোগকারী লিখিতভাবে এখনও বক্তব্য জানাননি।’ তাঁর কথায়, ‘বাইপাস লাগোয়া এক প্রাক্তন জনপ্রতিনিধির স্বামী গত দেড় দশকে ওই এলাকা থেকে শত শত কোটি টাকা তুলেছিলেন। স্থানীয়রা আশায় বুক বেঁধেছিল, পালাবদলের পর তৃণমূলের ওই নেতার স্থান হবে গারদে। কিন্তু এলাকার নির্বাচিত বিজেপির জনপ্রতিনিধির সঙ্গে ‘সেটিং’ করে ফেলেছেন ওই দম্পতি। মোটা টাকার পাশাপাশি কয়েকটি ফ্ল্যাটের সফল ডিলও হয়েছে। ফলস্বরূপ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি পদক্ষেপ হচ্ছে না।’ উত্তরবঙ্গের এক বিজেপি নেতার দাবি, ‘জোড়াফুল অক্ষের হাতেগোনা কয়েকজনের মাধ্যমে কালীঘাটে প্রতি মাসে টাকা যেত। গত তিন মাসে আমাদের কিছু বিধায়কের সঙ্গে ওই গোষ্ঠীর সখ্য বেড়েছে। বিগত আমলের তোলাবাজির বখরার একটা অংশ সরাসরি আমাদের কয়েকজন নেতার পকেটে ঢুকেছে। তাতেই ওদের পাপ মাফ হয়ে গিয়েছে।’
একই অভিজ্ঞতা জঙ্গলমহলের দায়িত্বে থাকা আরও এক বিজেপি নেতার। তাঁর বক্তব্য, ‘জেলা সফরে গিয়ে পার্টির নীচুতলা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে যা শুনেছি, তা রীতিমতো ভয়ংকর। গোরু-বালি-পাথর সহ একাধিক ক্ষেত্র থেকে গত ১৫ বছরে কোটি কোটি টাকা তুলেছে এলাকার পরিচিত তৃণমূলের নেতারা। আড়ালে ছিলেন বিগত সরকারের মন্ত্রী-বিধায়ক কিংবা জেলা সভাপতি। আসল পরিবর্তন-এর পর পর্দার পিছনে থাকা মাতব্বর সেই নেতারাই এখন বেড়াল হয়ে গিয়েছেন। নয়া বিধায়কের চ্যালাদের এক ফোনেই বড় ভেট পৌঁছে যাচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী সরকার গত ১০০ দিনে তৃণমূলের গুচ্ছ জনপ্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু জেলের বাইরে থাকা আশপাশের একাধিক নেতাকে একই ঘটনায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েও টাকা তুলছে বিজেপির মোড়লরা। সেদিকে নজর পড়ছে না!’