পি চিদম্বরম: প্রথমেই বলে নিতে চাই যে, এই নিবন্ধের শিরোনাম অস্পষ্ট হলেও এর পিছনে বাগধারা সম্পর্কে আমার জ্ঞান জাহির করার কোনও অভিপ্রায় নেই। কিছু সংগত প্রশ্ন এড়াতেই আমি এমন একটি শিরোনামের আশ্রয় নিয়েছি। গত ২ এপ্রিল শুরু হয়েছে নয়া শুল্ক-যুদ্ধ। এতে ভারত মূলত দুটি প্রধান দেশের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে চীন। অর্থাৎ একটি হল রহস্যময় ‘বাঘ’ তো অন্যটি রহস্যময় ‘কুমির’। আজেকর প্রেক্ষাপটে দুটিই অস্বস্তিকর বিকল্প।
সমস্যার একদিক
২০২৪-২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে ভারতের পণ্য বাণিজ্য চিত্রটি ছিল একরকম—
অতএব, বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে মোকাবিলা করার সময় ভারত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের ট্রেড অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের প্রধান রপ্তানিগুলি হল—রত্ন ও অলঙ্কার, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং কিছু কৃষিপণ্য। প্রতিযোগিতামূলক দামে ভালো গুণমানের ওষুধ ছাড়া, অন্যান্য জিনিসপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তৈরি করতে পারে অথবা আমদানি করতে পারে অন্য অনেক দেশ থেকে। কিন্তু রপ্তানিযোগ্য এই প্রতিটি জিনিসই ভারতের হাজার হাজার পুরুষ ও মহিলার জীবিকার উৎস। বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারত যে উদ্বৃত্তের সুবিধা পায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক চাপানোর কথা বলায় এবার তার সামনে মস্ত চ্যালেঞ্জই উপস্থিত হয়েছে। পাল্টা শুল্ক চাপানোর উপর যদিও আপাতত ‘বিরতি’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ওষুধপত্রকে, তবুও মানতে হবে যে, শুল্কের খাঁড়া ভারতের মাথার উপর ঝুলেই আছে। শুল্ক শেষমেশ চাপানো হলে রপ্তানিকারকরা সমস্যায় পড়বেন। একইসঙ্গে মারাত্মক প্রভাব পড়বে চাকরি, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ভারসাম্যের উপর। ভারতের নিজের স্বার্থেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে চড়া শুল্কের আঘাত এড়ানো জরুরি।
ভারতীয় পণ্য বন্ধ করে আমেরিকাও লাভবান হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা বিলক্ষণ জানেন। তাই আমদানির অনুমতি দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করবেন ট্রাম্প, তবে তার জন্য তিনি একটি দামও ঠিক করবেন। তিনি দুটি জিনিসের উপর জোর দেবেন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতকে আরও বেশি পণ্য কিনতে হবে এবং দুই দেশের বাণিজ্যে যেন ‘ভারসাম্য’ বজায় থাকে। আমার ধারণা, তিনি ভারতকে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম এবং বিমান কেনার জন্য বলবেন। বলা বাহুল্য, এই দুটি জিনিসেরই দাম ভীষণ বেশি। ভারত তার প্রয়োজনের লোহা ও ইস্পাত, জৈব রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক, খনিজ জ্বালানি এবং তেল ও পেট্রপণ্য বিশ্বের নানা দেশ থেকে আমদানি করতেই পারে। তবে এই ব্যাপারে বিচক্ষণতার সঙ্গে বেছে নিতে পারে আমেরিকার পণ্যও। এখন বড় প্রশ্ন হল—আমেরিকার চড়া দামের সামরিক সরঞ্জাম এবং বিমান (এবং এখন পারমাণবিক চুল্লিও) কেনার জন্য ভারত আর কত খরচ করতে পারবে? নরেন্দ্র মোদি বিনা প্রতিবাদে আমেরিকার উস্কানি এবং বাড়াবাড়ি সহ্য করেছেন। আগামীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করতেও বাধ্য হতে পারেন তিনি।
এবং অন্যদিক
চীনের সঙ্গে ভারতের সমস্যাটি উল্টো। চীনের সঙ্গে ভারতের পণ্য বাণিজ্য খাতে যে ঘাটতি তা বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান। পরিমাণটা ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, এবং ঘাটতিটা সত্যিই বিশাল। ভারতীয় শিল্প বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, জৈব রাসায়নিক, প্লাস্টিক এবং লোহা ও ইস্পাতের জন্য ভীষণভাবে চীন-নির্ভর হয়ে উঠেছে। তার মূল কারণ চীনা পণ্য বেশ সস্তা। কখনও কখনও ব্যাপারটা ‘ডাম্পিং’-এর পর্যায়ে পড়ে। চীনা পণ্যের মতো কম দাম এবং ডেলিভারির ক্ষেত্রে তাদের যে অনন্য সময়জ্ঞান, ভারতের সামনে তার বিকল্প বিশেষ একটা নেই। যতক্ষণ না ভারত তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষেত্রকে বাড়াতে পারছে এবং উন্নত করছে, আমাদের চীন-নির্ভরতা থেকে যাবে। উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষেত্রটি জিডিপির ১৩-১৪ শতাংশের মধ্যেই আটকে আছে।
চীনে ভারত রপ্তানি করে মূলত কিছু ভোগ্যপণ্য এবং খনিজ দ্রব্য। তার মধ্যে আছে পেট্রলিয়াম-ভিত্তিক জ্বালানি, সামুদ্রিক খাদ্য, তুলো, সুতো এবং কিছু কৃষিপণ্য। বস্তুত, চীনে খুব কমই ‘ভ্যালু-অ্যাডেড’ পণ্য ভারত রপ্তানি করতে পারে, যেগুলি চীন তাদের দেশে তৈরি করতে পারে না কিংবা সেগুলি তারা আমদানি করতে পারবে না অন্য কোনও দেশ থেকে। ভারতের এই দুর্দশার কারণ ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের প্রতি মোদি সরকারের মারাত্মক অবহেলা। ভারত থেকে আরও জিনিসপত্র আমদানি করতে ইচ্ছুক চীন। তারা এই ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ভারত এই প্রস্তাবের সদ্ব্যবহার করতে পারবে কি না তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েই যায়। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি সাক্ষাৎ একটি ‘টাইম বোমা’—এই ব্যাপারে এখনই সাবধান হওয়া জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে যেটুকু উদ্বৃত্ত আমাদের, তা চীনের সঙ্গে ঘাটতিতেই কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ‘ভ্যানিশ’ হয়ে যায় এবং উল্টো দিকে আরও বেড়ে যায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি? তাতে ভারতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাবে।
কোয়াড কোথায়?
‘কোয়াড’ কিংবা ‘কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ’ নামে একটি ‘গেম-স্পয়লার’ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত অগ্রাধিকার ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবেই আলাদা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইবে—চীনের সম্প্রসারণবাদ রুখে দেওয়ার একটি ব্যবস্থা হয়ে উঠুক কোয়াড। অন্যদিকে, ভারত কোয়াডকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল কানেকটিভিটি, উদীয়মান প্রযুক্তি প্রভৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। কোয়াডকে চীন-বিরোধী গ্রুপে পরিণত করার ব্যাপারেই সতর্ক আমরা। তাছাড়া, চীন সারা দুনিয়াকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছে যে, যেকোনও দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের স্বার্থ-বিরোধী চুক্তি করলে তাকে মূল্য চোকাতে হবে। ভারতকে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (মূলধন ও প্রযুক্তির প্রধান উৎস তারা) এবং চীনের (মধ্যবর্তী ও মূলধনী পণ্যের প্রধান উৎস তারা) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে। তাছাড়া চীন হল ভারতীয় ভূখণ্ড দখলকারী একটি শত্রু প্রতিবেশী। কোয়াডে ভারতের অংশগ্রহণ এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মতই। তবে ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপন্থী প্রভাবশালীরা ভারতকে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই আশঙ্কা রয়েছে।
আর একটি মজার ব্যাপার এই যে, ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিদায় নেবেন। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং যতদিন খুশি ততদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে পারবেন। সবটাই তাঁর ইচ্ছা এবং নিয়ন্ত্রণে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সুকৌশলী বা চতুর নন। অন্যদিকে জিনপিং হলেন নিজের কাজ হাসিল করে নেওয়ার মতোই ধূর্ত এক নেতা। ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন মুখের উপর বলে দেওয়ার লোক। তার জন্য নরেন্দ্র মোদির ‘মিসগাইডেড প্রোটেকশনিস্ট পলিসি’ সবার সামনে চলে এসেছে। নরেন্দ্র মোদিকে অবশ্যই পিছু হটতে হবে। সুপরামর্শ নিয়ে তাঁকে হতে হবে আরও খোলামেলা। বিরোধী দলগুলিকে শত্রুজ্ঞানে এড়িয়ে চলার অভ্যাসও ছাড়তে হবে প্রধানমন্ত্রীকে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত