সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতা দিবস। ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে লেখা তারিখটার অন্য একটা গুরুত্বও আছে। বিশেষ করে আমাদের মতো অর্বাচীনদের কাছে। আমাদের কাছে এই ছুটি পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো দামি। ফি বছরের মতো এবারও নিয়ম করে বন্ধুদের আড্ডা জমেছিল যাদবপুরে। এক অধ্যাপক বন্ধু শোনাচ্ছিল তাঁর কলেজের ছাত্রছাত্রীদের হোম অ্যাসাইনমেন্টের গল্প। এক সময় এই অ্যাসাইনমেন্টে প্লেজারিজম চেক করতে করতে নাজেহাল হতে হতো। এখন কালঘাম ছুটছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) দৌলতে। আর সেই লেখা এতটাই নিখুঁত যে তা ধরা রীতিমতো কষ্টসাধ্য। এমনকী বহু পড়ুয়া গাঁটের কড়ি খরচা করে এআই অ্যাপের পেইড ভার্সনও কিনে ফেলেছে।
এক কোণে বসে লিকার চায়ে চুমুক দিতে দিতে মিটিমিটি হাসছিল ইংরেজি বিভাগের এক প্রাক্তন সিনিয়র। বর্তমানে এক নামজাদা প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। বলল, শুধু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বলে নয়, ক্রিয়েটিভ ফিল্ডেও একই অবস্থা। আগে একজন লেখক মাসে একটি লেখা পাঠাতেন। আর এখন অনেকেই সপ্তাহে তিন-চারটি লেখা পাঠাচ্ছেন। বেশিরভাগ লেখা পড়লেই বোঝা যায়, লেখাটির ‘প্রকৃত লেখক’ আসলে এআই। তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই এক ফচকে প্রাক্তন সহপাঠী বলল, কালিদাস যদি এই সময়ে জন্মাতেন, তাহলে তিনিও হয়তো এই লেখকদের ভিড়ে হারিয়ে যেতেন। নাহলে কেউ না কেউ নির্ঘাৎ নতুন ‘শকুন্তলা’ (এআই ভার্সন) প্রকাশ করে দিতেন।
কথাগুলো শুনে ভাবছিলাম কবিরাজ কালিদাসের কথা। তাঁর অমর সব সৃষ্টির কথা। কালিদাস ছিলেন সরস্বতীর বরপুত্র। তাঁকে বলা হতো ভারতের শেক্সপিয়র। অবশ্য সময়ের বিচারে (প্রায় ১১০০ বছর, চাট্টিখানি কথা নয়) শেক্সপিয়রকেই আসলে ‘পশ্চিমের কালিদাস’ বলা উচিত। ‘শকুন্তলা’, ‘মেঘদূত’ বা ‘কুমারসম্ভব’—কালিদাসের সৃষ্টিগুলি আজও ভারতীয় সাহিত্যের মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করে। প্রেম, বিচ্ছেদ, প্রকৃতির সঙ্গে মিলন বা একাকীত্ব—সবকিছুকে তিনি শব্দের মাধ্যমে এমন রূপ দিয়েছিলেন, যে হাজার বছর পরেও তা পাঠকের হৃদয়ে একই রকম আলোড়ন তোলে। তাঁর কোনও লেখা কিন্তু ‘কনটেন্ট’ ছিল না। বরং তা ছিল শিল্প, সৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতার মিশেলে সৃষ্ট শব্দের এক অনন্য রূপ। কালির ছোঁয়ায় কাগজে আত্মার অনুভবের প্রকাশ। কিন্তু দু’হাজার বছর পর এসে সেই ‘সৃষ্টি’ শব্দের জায়গায় বসেছে অন্য একটি শব্দ—‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’। ইউ টিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক বা ব্লগ—সর্বত্রই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ লেখা, ভিডিও, ছবি। আর এই সৃষ্টির বড় অংশেই ক্রমশ ঢুকে পড়ছে (বলা ভালো, পড়েছে) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো টেক্সট জেনারেটর, মিডজার্নি বা স্টেবল ডিফিউসনের মতো ইমেজ ক্রিয়েটর, শুনো বা ইউডিওর মতো মিউজিক টুল—এগুলি এখন এমন এক মাধ্যম, যা এক মুহূর্তে কবিতা, গান, গল্প থেকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে দিতে পারে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভূমিকা আর সৃষ্টিশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গোটা বিষয়টি হয়ে উঠেছে একটি অ্যালগরিদম-চালিত শিল্পসৃষ্টির এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। আর সবকিছুই হয়ে যাচ্ছে আঙুলের ছোঁয়ায় বা মাউসের এক ক্লিকে।
এআই দিয়ে বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট বা জিঙ্গল তৈরি করাটা এতদিনে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। একাধিক সংস্থা এসবের পাশাপাশি অ্যাপ দিয়ে তৈরি করছে বিজ্ঞাপনী ছবিও। কিন্তু সেই ছবি যে কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা একটু ভালো করে দেখলেই বিলক্ষণ বোঝা যেত। চলতি বছরের জুলাই মাসে সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বিশ্ববিখ্যাত লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ‘ভোগ’। ম্যাগাজিনের কভার পেজে সুন্দরী মডেলদের ছবি। ঝাঁ চকচকে সেই ফটোশ্যুট দেখলে তাতে যে কিছু অস্বাভাবিক রয়েছে, এমনটা মনেই হবে না। বরং রূপের ছটায় চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ম্যাগাজিন বাজারে আসতেই শুরু হল মডেলদের পরিচয়ের খোঁজ। তার পরেই চমক। জানা গেল, মডেলরা কেউই বাস্তবে নেই। সবাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। এআই মডেলে যদি সৌন্দর্য ও গ্ল্যামারের এমন মিশেল ফুটে উঠতে পারে, তাহলে বাস্তবে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে মডেলের ভূমিকা কতটা নিরাপদ? কারণ এটা যেমন প্রযুক্তিগত সাফল্যের এক বিশাল উদাহরণ, তেমনই এক ধরনের সতর্কবার্তাও বটে। এই সৃষ্টি বুঝিয়ে দিচ্ছে শিল্পের দুনিয়ায় এসেছে ‘খোলা হাওয়া’। অর্থাৎ নিখুঁতভাবে প্রম্পট লিখতে দক্ষ যে কেউ এখন ‘চোখধাঁধানো মডেল’ বানাতে পারেন। অন্যদিকে, এই পালে হাওয়া লাগলে তৈরি হবে কর্মসংস্থানের সংকট। কারণ বাস্তব দুনিয়ায় বিজ্ঞাপনী লেখক, মডেল, ফটোগ্রাফার ছাড়াই যখন পুরো প্রোডাকশন সম্ভব, তখন আগামীতে কি আর মানুষের প্রয়োজন থাকবে?
এই প্রশ্নটা আরও উস্কে দিয়েছে ‘দ্য ভেলভেট সানডাউন’ নামের একটি ব্যান্ড। ২০২৫ সালের জুন মাসের কথা। গান শোনার জন্য অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাপ স্পটিফাইতে হঠাৎই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই অপরিচিত ব্যান্ডটি। তাদের ‘ডাস্ট অন দ্য উইন্ড’ গানটি শোনার পর অনেক সঙ্গীতবোদ্ধারই মনে হয়েছিল, পরবর্তী পিঙ্ক ফ্লয়েড বা বিটলস বুঝি চলে এসেছে। শুরু হল খোঁজ। কারা কারা যুক্ত রয়েছেন এই ব্যান্ডের সঙ্গে? তাঁদের নেপথ্য কাহিনিই বা কী? ফের চমক। কারণ, বাস্তবে ব্যান্ডটির কোনও অস্তিত্ব নেই। নেই কোনও গায়ক বা সুরকার। গানের লিরিক্স, সুর, কণ্ঠ, এমনকী ব্যান্ড মেম্বারদের ছবি—সবই এআই দিয়ে তৈরি। আর যাঁরা এই প্রজেক্টের নেপথ্যে ছিলেন, তাঁদের কথায় গোটা বিষয়টি ‘আর্টিস্টিক প্রোভোকেশন’। এর পরেই প্রশ্ন ওঠে, যদি গান ভালো লাগে, তাহলে একজন শিল্পীর অস্তিত্ব কতটা জরুরি? আমরা কি কণ্ঠের পিছনের মানুষটাকে খুঁজি, নাকি শুধুই সুরের মাদকতায় ভেসে যাই? এনিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তির মধ্যেই বর্তমানে স্পটিফাইতে একমাসে ‘দ্য ভেলভেট সানডাউন’ ব্যান্ডের শ্রোতার সংখ্যা ৯ লক্ষ ছাড়িয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় একটাই—পরিবর্তন এসেছে ব্যান্ডের বায়োতে। লেখা হয়েছে, ‘দ্য ভেলভেট সানডাউন মানুষ দ্বারা পরিচালিত একটি কৃত্রিম মিউজিক প্রজেক্ট। ক্রিয়েটিভ ডিরেকশন, কম্পোজ, গানের গলা বা ভিডিওতে ব্যবহৃত দৃশ্যকল্প—সব কিছুর নেপথ্যেই রয়েছে মানুষের ছোঁয়া। এটা কোনও কৌশল (ট্রিক) নয়। বরং একটা আয়না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে স্রষ্টার সীমাবদ্ধতা, পরিচয় ও সংগীতের ভবিষ্যতকে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার লক্ষ্যে এটা একটা আর্টিস্টিক প্রোভোকেশন।’
পেশাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোপ যে পড়বেই, সে বিষয়ে সর্বপ্রথম প্রমাদ গুনেছিল তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টর। বছরখানেক ধরেই অল্পবিস্তর কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর শোনা যাচ্ছিল। আতঙ্কের সেই মাত্রাকে এক ধাক্কায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে আইটি জায়ান্ট টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের (টিসিএস) সাম্প্রতিক এক পদক্ষেপ। তারা জানিয়েছে, ১২ হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হবে। কারণ এআই দিয়েই তাদের কাজ করা সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কোড লেখা, টেস্টিং, রিপোর্ট তৈরি, এমনকী গ্রাহক পরিষেবা—সব ক্ষেত্রেই এআই অনেক দ্রুত ও কম খরচে কাজ করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা যে ট্রেন্ডকে বলছেন, ‘ক্যানারি ইন দ্য মাইন’। অর্থাৎ, সামনে আরও বড় পরিবর্তন আসছে। তারই পূর্বাভাস মিলছে টিসিএসের মতো সংস্থার কর্মী সংকোচনের পদক্ষেপে। আসলে এই ঘটনাটিকে নিছক একটি কর্পোরেট সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আইটি সেক্টরে ছাঁটাই না করার জন্য যে সংস্থার সুনাম রয়েছে, তারা যদি এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য ছোট-বড়-মাঝারি মাপের বহু কোম্পানিও যে এই পথেই হাঁটবে, তা বলাই বাহুল্য।
আতঙ্কের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে চলতি বছরের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট’। জানা যাচ্ছে, প্রযুক্তির সৌজন্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯ কোটি ২০ লক্ষ চাকরির সুযোগ কমবে। এ পর্যন্ত পড়ে আপনার বাম আমলের ‘কম্পিউটার আতঙ্ক’-এর স্মৃতি মনে পড়তে পারে। ভয় নেই। এই রিপোর্টের পরবর্তী অংশে রয়েছে আশার রুপোলি রেখা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই পর্বেই তৈরি হবে নতুন ১৭ কোটি কাজের সুযোগ। আর এই নতুন চাকরির ক্ষেত্রে ডিগ্রি নয়, বড় হয়ে দেখা দেবে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্বে স্কিল বেসড হায়ারিং বাড়বে ১৯ শতাংশ। তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য এআই, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি ও রোবোটিক্সের মতো বিষয়গুলি। অর্থাৎ এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করাই হয়ে উঠবে কাজের বাজারে টিকে থাকার মূল মন্ত্র।
কালিদাস যদি প্রবাস যন্ত্রণা ভোগ না করতেন, হয়তো ‘মেঘদূত’-এর জন্ম হতো না। নিজের জীবনে বারংবার বেদনা, নিঃসঙ্গতা আর আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা অনুভব না করলে হয়তো ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ লিখে উঠতে পারতেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অর্থাৎ শিল্পের পূর্ণতা শুধুমাত্র ‘ফাইনাল প্রোডাক্ট’-এর মধ্যে লুকিয়ে নেই। বরং তা ছড়িয়ে রয়েছে সৃষ্টির কষ্টমুখর যাত্রাপথের মধ্যেই।
বর্তমান সময়ে এআইকে অস্বীকার করা কার্যত গাছের ডালে বসে সেই ডালই কাটার শামিল। প্রযুক্তির এই নব অধ্যায়কে তাই ব্যবহার করতে হবে নিজের কাজের প্রয়োজনমাফিক। এআইয়ের সাহায্যে লেখকরা তথ্য সংগ্রহ, ঢাউস প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ বা ভাষাগত কাঠামো তৈরি করতে পারেন। কিন্তু এআই তরফে দেওয়া তথ্যগুলি যথাযথ কি না, সেই ফ্যাক্ট চেক করে লেখাটিকে নিজস্বতায় বাঁধার কাজ করতে হবে তাঁকেই। একইভাবে ডিজাইনাররা এআই দিয়ে ভিস্যুয়াল বা ইলাস্ট্রেশনের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু চূড়ান্ত রূপ দিতে হবে নিজের কল্পনা-সৃষ্টিশীলতা থেকেই। প্রোগ্রামাররা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক কোড লেখালেও জটিল সমস্যার সমাধান করতে হবে তাঁকেই।
কালিদাস থেকে ভেলভেট সানডাউন—এই গোটা পর্বটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শিখিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি বদলে বদলে যায়, কিন্তু মানবিক ছোঁয়া ছাড়া তা কখনও পূর্ণতা পায় না।