পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: লোবায় কয়লা খনি প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ কুড়ি বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন দেখেছে দুবরাজপুর। এবার সেই সংগঠিত আন্দোলনকে সুকৌশলে ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠল। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে ক’দিন আগেই নিজেদের দাবিদাওয়া লিখিত আকারে জেলাশাসককে জমা দিয়েছিল ‘লোবা কৃষি জমি রক্ষা কমিটি’। কিন্তু, মঙ্গলবার আচমকাই জেলাশাসকের কাছে পালটা দাবিদাওয়া নিয়ে হাজির হলেন চাষিদেরই একটি গোষ্ঠী। এমন ছবি দীর্ঘ দু’দশকের আন্দোলনের ইতিহাসে কার্যত বিরল। প্রশ্ন উঠছে, এই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা গোষ্ঠীর নেপথ্যে কি তবে প্রকল্প রূপায়ণকারী সংস্থা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মদত রয়েছে? জমি আন্দোলনকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়ে কি ঘুরপথে কোম্পানিকেই সুবিধা করে দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হচ্ছে?
গত ৬ আগস্ট এই খনি-জট কাটাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছিল। সেখানে জেলা প্রশাসনের তরফে মূল দুই পক্ষ—অর্থাৎ জমিদাতাদের সংগঠন ‘লোবা কৃষি জমি রক্ষা কমিটি’ এবং প্রকল্প রূপায়ণকারী বেসরকারি সংস্থাকে এক সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের যাবতীয় শর্ত ও দাবিদাওয়া লিখিত আকারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ মেনেই গত ২৫ আগস্ট কমিটির তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, জমি অধিগ্রহণের জন্য একর প্রতি ৬০ লক্ষ টাকা, প্রতিটি জমিদাতা পরিবারের অন্তত একজনকে স্থায়ী চাকরি এবং উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের জন্য একই জায়গায় পুনর্বাসন দিতে হবে। শুধু তাই নয়, সেই পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, খেলার মাঠ থেকে শুরু করে মন্দির, মসজিদ, শ্মশান ও কবরস্থানের মতো সমস্ত পরিকাঠামো সুনিশ্চিত করার দাবিও রাখা হয়েছিল।
কিন্তু এই দাবি জমা পড়ার কয়েকদিনের মাথাতেই মঙ্গলবার হীরালাল রানা, আনন্দময় ঘোষদের নেতৃত্বে জনা তিরিশেক চাষির একটি পাল্টা গোষ্ঠী হাজির হয় জেলাশাসকের দপ্তরে। তাঁদের দাবি, তাঁরা শিল্পের পক্ষে এবং ন্যায্য মূল্য পেলে জমি ছেড়ে দিতেও রাজি। আনন্দময় ঘোষ বলেন, ‘আগের মিটিংয়ের ব্যাপারে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। তাই আমরা এসেছি। আমরা চাইছি জেলাশাসক আমাদের সঙ্গে বসে দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করুন।’ সুর সপ্তমে তুলে হীরালাল রানার সংযোজন, ‘আমরা জেলাশাসকের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে চাই।’ এখানেই শেষ নয়, আনন্দময়, হীরালালদের তরফে একটি গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে। তাঁদের দাবি, জমিরক্ষা কমিটির নেতারা নাকি আগেই জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন সেই জমি নিজেদের কব্জায় রাখতেই আন্দোলনের নাটক করছেন!
সূত্রের খবর, মঙ্গলবার নতুন গোষ্ঠীর হয়ে যাঁরা জেলা শাসকের দপ্তরে দরবার করতে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যেই এমন কয়েকজন রয়েছেন যাঁরা আগের প্রশাসনের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন এবং কমিটির চিঠিতে সইও করেছিলেন! আর এখানেই দানা বেঁধেছে আসল রহস্য। অনেকেই মনে করছেন, আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভাঙন ধরাতেই এই ছক কষা হয়েছে। কিন্তু নেপথ্যে কার কারসাজি? পুরো বিষয়টিকে ‘চক্রান্ত’ বলে আখ্যা দিয়ে কৃষি জমি রক্ষা কমিটির সম্পাদক জয়দীপ মজুমদার বলেন, ‘প্রশাসনের নির্দেশেই আমরা সমস্ত চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করে গণতান্ত্রিকভাবে দাবিদাওয়া জানিয়েছি। নতুন করে কারা এইভাবে শিল্প নিয়ে উলটোপালটা রটাচ্ছে, বুঝতে পারছি না। আমরা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আন্দোলন করছি। আর এরা বলছে আমরা নাকি জমি দিয়ে দিয়েছি! একটু প্রমাণ করে দেখাতে পারবে তো? আসলে এরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানুষকে খেপিয়ে তুলে আন্দোলনে ফাটল ধরাতে চাইছে।’ সব মিলিয়ে, লোবার কয়লা প্রকল্প নিয়ে এখন দড়ি টানাটানি চরমে। প্রশ্ন উঠছে, এই ফাটল কি কোম্পানিরই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির ফসল? উত্তর খুঁজছে সব মহলই।