Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্কুলেই সিপিআর শিক্ষা

স্কুলেই সিপিআর শিক্ষা
  • ২৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সব মানুষকে নানা ধরনের বিপদের মোকাবিলা করেই বেঁচে থাকতে হয়। জীবনসংগ্রামের সূচনা জন্মমুহূর্ত থেকেই। এই লড়াই জারি থাকে শেষনিশ্বাসটি পর্যন্ত। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের সংস্থানের জন্য লড়াই জীবনের একটি দিক। আর একটি দিক হল মানুষের শারীরিক মানসিক সুরক্ষা। পথ চলার প্রতিটি পর্বে ঘটনা দুর্ঘটনার সাক্ষাৎ আমাদের জীবনে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর পাশাপাশি থাকে শরীর অভ্যন্তরের যন্ত্রাদির আকস্মিক অস্বাভাবিক আচরণ। যেমন হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র প্রভৃতি হঠাৎ দুর্বল, এমনকি বিকলও হয়ে যেতে পারে। বাইরের আঘাতজনিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য কিছুটা সময় মেলে। রোগীকে হাসপাতালে বা ডাক্তার-নার্সের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। সার্বিক তৎপরতায় ওইসব রোগীকে বাঁচানোর সুযোগ বেশি। এর পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক এবং ব্রেন স্ট্রোকের দুর্ভাগ্যও মানুষকে তাড়া করে। এই দুই ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সময় সুযোগ তুলনায় কম পাওয়া যায়। চূড়ান্ত বিপদ ঘটে যাওয়ার আগে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় সবার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তার ফলে অল্পসময়ের ভিতরেই অনেক রোগী শারীরিক বিকৃতির শিকার হয়ে পড়েন, এমনকি তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যায়। বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাক কোনও বয়স মানে না। সামান্য বালক-বালিকা থেকে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক প্রভৃতি যে-কেউই হৃদযন্ত্রের আকস্মিক সমস্যায় মারাত্মক বিপদে পড়ে যেতে পারেন। এই ব্যাপারে প্রাথমিক চিকিৎসা বিশেষ কার্যকরী। তারপর রোগীকে নিয়ে ডাক্তার-নার্স বা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর সময় পাওয়া যায়। তাতে রোগীকে বাঁচানোর সুযোগ সম্ভাবনা মেলে অনেকটাই। 

Advertisement

কিন্তু তৎক্ষণাৎ ধারেকাছে প্রাথমিক চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দুর্লভ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ একটু সচেতন এবং উদ্যোগী হলে এই সংকট বহুলাংশে দূর হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তারই প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। হৃদরোগের চিকিৎসার প্রাথমিক পাঠ এবার বাংলার স্কুলেই দেওয়া হবে। সিপিআর কীভাবে দিতে হবে, শেখানো হবে সেখানে। বিষয়টি রীতিমতো উচ্চ মাধ্যমিক সিলেবাসের অন্তর্গত হতে চলেছে। জন্মদিনের পার্টিতে নাচেগানে মশগুল অনেকে। আনন্দমুহূর্তে আচমকা বুকে হাত রেখে গড়িয়ে পড়লেন একজন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ! হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি কলকাতার একটি বেসরকারি স্কুলে শারীরশিক্ষার ক্লাসেই লুটিয়ে পড়ে একটি ছোটো ছেলে। এমনকি ডাক্তারের কাছে পৌঁছানোর আগে সে মারাও যায়। ওটির মধ্যে চিকিৎসারত কমবয়সি এক ডাক্তারেরও মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে কিছুদিন আগে। এসব মন খারাপ করা খবর মিডিয়ার দৌলতে অনেকেরই জানা। এরকম পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর)। 

তবে সমস্যা হল, সিপিআর সম্বন্ধে জানা এবং তার প্রয়োগের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তাই উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাসে বিষয়টি বিস্তারিতই রাখা হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর অন্যান্য তাৎক্ষণিক পদ্ধতি—যেমন শ্বাসনালীতে খাবার আটকে গেলে বা কেউ জলে ডুবে গেলে কীভাবে সেই খাবার বা জল বের করে হৃদ্‌যন্ত্র চালু রাখতে হবে—স্কুলে তাও শিখবে কিশোর-কিশোরীরা। কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে গলার পাশে ক্যারোটিড ধমনি চেপে ধরে দেখতে হবে, হৃদ্‌যন্ত্র সচল রয়েছে কি না। সচল থাকলে অল্প ধাক্কা দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। তাতে কাজ না-হলে রোগীকে কাত করে শুইয়ে শক্ত কিছু দিয়ে মুখ খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। মুখে কিছু আটকে থাকলে সেটি বের করে দিতে হবে তাড়াতাড়ি। এরপর দুটি পাঁজরের সংযোগস্থলের দুই আঙুল নীচে চাপ দিয়ে যেতে হবে হাতের তালুর শক্ত জায়গাটি দিয়ে। তার জন্য দুটি হাতই ব্যবহার করতে হবে একসঙ্গে। যতক্ষণ না জ্ঞান ফিরছে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ মিনিটে ১০০ বার এভাবে চাপ দিয়ে যেতে হয়। রোগীর নাক চেপে মুখে মুখ দিয়ে জোরে জোরে ফুঁ দেওয়াও যায়। তবে এই পদ্ধতি শিশুদের জন্য বেশি কার্যকরী। রোগীর কৃত্রিম দাঁত থাকলে সেটি আগেই খুলে ফেলতে হবে। সিপিআরের পাশাপাশি রয়েছে হেইমলিচ পদ্ধতির ব্যাখ্যাও। শ্বাসনালীতে খাবার আটকে গেলে কথা বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বুড়ো আঙুল দিয়ে হেইমলিচ সাইনের মাধ্যমে সমস্যাটি বোঝাতে পারেন আক্রান্ত ব্যক্তি। সেই ইঙ্গিত সঠিকভাবে বুঝে পদক্ষেপ করার জন্যও বিষয়টি জানা প্রয়োজন। রোগীকে পিছন থেকে জড়িয়ে তাঁর পেটে পাঁচবার জোরে চাপ দিলে কাশির সঙ্গে খাবারটি বেরিয়ে আসতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্য পিঠে জোরে চাপড় দিয়েও খাবার বের করার পদ্ধতি রয়েছে। বইয়ের পাশাপাশি হাতেকলমে শিক্ষাই যে এক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তা পরিষ্কার। তাই দুই ধরনের শিক্ষাই ছেলেমেয়েরা পাবে। তাতে স্কুল থেকে পরিবার—দুই ক্ষেত্রেই আকস্মিক বিপদে জীবন বাঁচাতে ছেলেমেয়েরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারবে। বস্তুত প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাকেই সহজ করে তুলবে এই ব্যবস্থা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ