তন্ময় মল্লিক: ইচ্ছাকৃত গাড়িচাপা, নাকি শিক্ষামন্ত্রীকে বাধা দিতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে যাওয়ায় ইন্দ্রানুজ রায় জখম হয়েছেন, তা নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে গাড়িচাপা দিয়ে ছাত্রকে মারার চেষ্টা হয়েছিল। তাই তাঁর পদত্যাগ চাই। অপরপক্ষের বক্তব্য, মন্ত্রীকে আটকাতে গিয়েই ইন্দ্রানুজ জখম হয়েছেন। গাড়িচাপা দেওয়ার কোনও ঘটনাই ঘটেনি। উভয়পক্ষ ছবি এবং ভিডিও ক্লিপিংস দিয়ে নিজেদের দাবি সঠিক প্রমাণে মরিয়া। তবে জখমের কারণ যাই হোক, ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আরও বড় বিপদ ঘটতে পারত। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, আন্দোলনকারী ছাত্ররা মন্ত্রীর গাড়ি আটকানোর জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন কেন? বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ট্র্যাডিশন রক্ষা, নাকি পিছনে ছিল অন্য কোনও গেমপ্ল্যান?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিবহাল তাঁদের বক্তব্য, এই ঘটনা বছর খানেক আগে ঘটলে একে অতিবিপ্লবী মানসিকতার ফসল বলে ভাবা যেত। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব নয়। কারণ আর জি করের ঘটনার পর ছাত্ররাজনীতির ধারায় কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। আগে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি সহ কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলিতে মূল লড়াইটা ছিল বামপন্থীদের মধ্যেই। ডিএসও, ডিএসএফ, এসএফআই প্রভৃতি ছাত্র সংগঠন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করত। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কটা ছিল ‘প্রতিপক্ষে’র। আর জি করের ঘটনা সেই দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
অভয়া ইস্যুতে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানের আড়ালে বাম এবং অতিবামেরা এককাট্টা হয়েছিল। ছাত্রঐক্য বজায় রাখার জন্যই আন্দোলনকে দেওয়া হয়েছিল ‘অরাজনৈতিক’ তকমা। তাতে অনেকেই এটা সাধারণ মানুষের আন্দোলন মনে করেছিলেন। ফলে কলকাতা এবং শহরতলিতে একটা ‘গণআন্দোলনে’র আবহ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন কিছুদিন চলার পর ডিএসও তাদের অবস্থান বদলালেও সিপিএমের এবং অতিবামেদের বোঝাপড়া ছিল অটুট। একথা ঠিক, উভয়ের মধ্যে মতপার্থক্য বিস্তর। কিন্তু সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলায় তারা এককাট্টা। যাদবপুরের ঘটনায় সেটা ফের স্পষ্ট হল।
যাদবপুরে সেদিন কী ঘটেছিল? সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস প্রভাবিত অধ্যাপক সংগঠনের সম্মেলন ছিল। সংগঠনের নেতা হিসেবে ব্রাত্য বসু সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীও বটে। তাই তাঁকে কাছে পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা দাবিদাওয়া জানাতেই পারেন। তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তাঁকে আটকানোর নামে যেভাবে তাণ্ডব চালানো হল, তা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী পড়ুয়াদের কাছে মোটেই কাম্য নয়। একেবারেই অনভিপ্রেত। একে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস বলে চালাতে যাওয়া সমীচীন হবে না। বরং বলা ভালো, অতীত ঐতিহ্য মেনে সেদিনও হয়েছিল পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা পাকানোর চেষ্টা। তবে, ব্রাত্য বসুর গাড়ি ক্যাম্পাসে আটকে গেলে জল অনেক দূর গড়াত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রশ্নটি হল, শিক্ষামন্ত্রীকে ছাত্ররা সেদিন জঙ্গি কায়দায় আটকাতে চেয়েছিলেন কেন? অনেকে মনে করছেন, ‘বাংলাদেশের ভূত’ তাদের ঘাড় থেকে এখনও নামেনি। বিরোধীরা মনে করছে, পরিষেবার মজবুত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা অসম্ভব। তাই বাংলাদেশের স্টাইলে ছাত্র আন্দোলন করতে চাইছে। আর জি কর ফেল করেছে। এবার যাদবপুরকে ধরে প্রাসঙ্গিক হতে চাইছে। এটা ফেল করলে হয়তো প্রেসিডেন্সি! ছাব্বিশ পর্যন্ত এভাবেই ভেসে থাকতে চাইছে।
একথা ঠিক, আর জি কর আন্দোলনে সরকার কিছুটা হলেও চাপে পড়ে গিয়েছিল। অভয়ার উপর নারকীয় অত্যাচার ও তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তামাম দেশবাসী অভয়ার খুনির চরম শাস্তি দাবি করেছিল। সেই সুযোগে জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ একের পর এক দাবি বাড়িয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসা পরিষেবা স্বাভাবিক করতে বেশকিছু দাবি সরকার মেনে নিয়েছিল। অনেকে মনে করছেন, যাদবপুরে ব্রাত্য বসুকে আটকানোর চেষ্টার পিছনেও ছিল সেই একই পরিকল্পনা। নানান দাবির সমর্থনে চলত ঘেরাও। দাবি মানলেই ঘেরাও উঠত, এমনটা নয়। বসত জিবি মিটিং। চাপানো হতো পদত্যাগের শর্ত। আর জি করের ঘটনার ‘রিমেক’ হতো যাদবপুরে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ায় বানচাল হয়ে যায় সেই প্ল্যান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আর জি করের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে রাজ্যের শাসক দল। অভয়ার জাস্টিস রাজ্যের শাসক দল, এমনকী খোদ মুখ্যমন্ত্রীও দাবি করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের নিয়ন্ত্রকের আসনে ছিল বিরোধীরা। কলেজে কলেজে আস্ফালন দেখানো তৃণমূল ছাত্র পরিষদের মাতব্বররা নিয়েছিল ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতি। তাতে বিরোধীরা ফাঁকা মাঠ পেয়ে গিয়েছিল। যাদবপুর ইস্যুতে সেই ভুল রাজ্যের শাসক দল করেনি। প্রথম থেকেই ময়দানে নেমেছে। বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব তো দিয়েছেই, পাল্টা চাপ সৃষ্টিও করেছে। তাতে যাদবপুরে জঙ্গি আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটা জনমতও তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, বাম এবং অতিবামেরা যাদবপুরকে দশকের পর দশক ‘এসইজেড’এর
মতো স্বাভাবিক নিয়মকানুনের বাইরে রাখতে
চাইছে। শুধু শাসক দল নয়, বিজেপি সেখানে সংগঠন করতে গেলেও বাধা দিচ্ছে। আবার তাদের মুখেই গণতন্ত্রের বুলি!
ইন্দ্রানুজের জখম হওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখে সিপিএম জলঘোলা করার চেষ্টা করলেও হালে পানি পাবে না। কারণ আর জি কর কাণ্ডে অভয়ার বাবা, মায়ের প্রতিটি বিবৃতিই ছিল সরকার বিরোধী। সন্তানকে হারানোয় তাঁদের প্রতি রাজ্যবাসীর সহানুভূতি এতটাই তীব্র ছিল যে আবেগের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল যুক্তি। প্রতিটি অভিভাবক অভয়াকে তাঁদের সন্তানের জায়গায় বসিয়েছিলেন। কিন্তু যাদবপুরের প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে দাবি পেশের নামে কিছু ছাত্র শিক্ষামন্ত্রীর উপর চড়াও হয়েছেন। তিনি শুধু মন্ত্রীই নন, একজন অধ্যাপকও। তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ফলে সহানুভূতি পাওয়া তো দূরের কথা, তাঁরা সমালোচিত হচ্ছেন।
তবে, আন্দোলনের সলতে পাকানোর মুহূর্তে তাতে জল ঢেলে দিয়েছেন ব্রাত্য বসু। তিনি ইন্দ্রানুজের বাবাকে ফোন করে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষক সুলভ আচরণ। তাতে ইন্দ্রানুজের বাবা, মা শিক্ষামন্ত্রীর দিকে আঙুল না তুলে দিয়েছেন দরাজ সার্টিফিকেট। ঘুরিয়ে ছেলের দিকেই আঙুল তুলেছেন। ইন্দ্রানুজের মা খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘গাড়িটা
ইচ্ছে করে ওর উপর দিয়ে চলেনি। এটাকে আমরা একটা অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবেই দেখছি।’ অথচ বাম ও অতিবামেরা ‘হিট অ্যান্ড রান’ এর কেস দেওয়ার
দাবি করছেন। এই জন্যই বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!
জখম ইন্দ্রানুজের বাবা-মা চান শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ ফিরুক। তারজন্য শিক্ষামন্ত্রীর উপর হামলার যে কেস হয়েছে, তা প্রত্যাহারের দাবি তাঁরা জানিয়েছেন। তাতে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বেশ চটেছেন। তাঁরা বোধহয় ইন্দ্রানুজের বাবা-মায়ের কাছ থেকেও ‘যুদ্ধং দেহি’ প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলেন। সেটা না পাওয়ায় ভীষণ হতাশ। কারণ ঘোলাজলে মাছ ধরার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
তবে যাদবপুরের গেমপ্ল্যান ভেস্তে যাওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে এসএফআই তথা সিপিএম। তারা ভেবেছিল, শিক্ষামন্ত্রীকে ঘেরাও করলে পুলিস আসবে। লাঠিচার্জ করবে। তাতে শুধু যাদবপুর নয়, উত্তাল হবে গোটা রাজ্য। ফের আর একটা ‘আর জি কর’ হবে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ায় ভেস্তে যায় পরিকল্পনা। তবে রক্তাক্ত ইন্দ্রানুজকে সামনে রেখে আশায় বুক বেঁধেছিল বামেরা। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করেই ছুটেছিলেন হাসপাতালে। কিন্তু তাতে সিপিএমের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা আরও প্রকট হয়েছে।
ইন্দ্রানুজ এসএফআইয়ের সদস্য নন। উল্টে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর চোখা চোখা পোস্ট নানান সময় সিপিএম এবং এসএফআইকে লজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট। তা সত্ত্বেও সেলিমসাহেব তাঁকে দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটেছেন। তাতেই উঠেছে প্রশ্ন, যে ছাত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণের পরেও তাঁকে কুৎসিত আক্রমণ করেছিল, তার জন্য সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের এত দরদ উথলে উঠল কেন? সেটা কি মানবতার টানে, নাকি যিনিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী তিনিই সিপিএমের বন্ধু, এই ফর্মুলায়?
এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সেলিম সাহেবই দিতে পারবেন। কীসের টানে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন তা নিয়ে ধন্দ থাকলেও উদ্দেশ্য ঘোলাজলে মাছ ধরা। অনেকেই বলছেন, জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় সেলিমসাহেব মাছ ধরতে পারলেন না, কিন্তু পাঁকটা মেখে ফেললেন।