নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: ‘এই দেখুন পচা ডিম!’ বলে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা থানার গেটের সামনে পজিশন নিচ্ছেন। আর এক কর্মী কচু পাতায় মুড়িয়ে নিয়ে এসেছেন এক তাল গোবর! ‘শুদ্ধিকরণ করব আজ,’ বললেন তিনি। কয়েকজন সমর্থকের হাতে পথিথিন প্যাকেটে পচা টম্যাটো! যাঁর জন্য তাঁরা এই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি হলেন তৃণমূলের সল্টলেকের দাপুটে নেতা সব্যসাচী দত্ত। তিনি বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র, প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং রাজারহাট-নিউটাউনের দু’বারের প্রাক্তন বিধায়ক। আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য থানা থেকে তাঁকে বের করতেই শুরু বিক্ষোভ। শিলাবৃষ্টির মতো শুরু হয় পচা ডিম-টম্যাটো বৃষ্টি। ঢাল দিয়ে পুলিশ আড়াল করার চেষ্টা করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপি কর্মী গোবর ছুড়ে দেন সব্যসাচীর গায়ে! ততক্ষণে গাড়িতে উঠেছেন সব্যসাচী। সবুজ কচু পাতা ও খবরের কাগজ আড়াল করে কোনওক্রমে গাড়ির ভিতর তাঁকে আড়াল করে পুলিশ। মঙ্গলবার এমনই বিক্ষোভের সাক্ষী থাকল সল্টলেক। ধৃত নেতাকে ৮ দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
পালাবদলের পর ইতিমধ্যেই বিধাননগর পুরসভার বরো চেয়ারম্যান সহ চারজন কাউন্সিলার গ্রেপ্তার পুলিশের হাতে। তার মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধেই তোলাবাজির অভিযোগ। সব্যসাচী দত্ত পুরসভার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার। ফলে এ নিয়ে পাঁচজন তৃণমূল কাউন্সিলার গ্রেপ্তার হলেন। আরও কয়েকজনের উপর ‘খাঁড়া ঝুলছে’ বলে খবর। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার রাতে বিধাননগর উত্তর থানায় এক ব্যবসায়ী সব্যসাচীর বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ দায়ের করেন। ফোন করে সব্যসাচী নাকি ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। আরও এক কোটি টাকার দাবি করেছিলেন। ২০১৮ সালে ওই ব্যবসায়ী এ সংক্রান্ত অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগের পর হয়রানি বেড়েছিল। ফের তিনি অভিযোগ করেন। পুলিশ তোলাবাজি ও যৌথ অপরাধের ধারায় এফআইআর রুজু করে। রাতে রাজারহাটের ফ্ল্যাট থেকে সব্যসাচীকে গ্রেপ্তার করে বিধাননগর উত্তর থানা।
সকালে সব্যসাচীকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগেই বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হন। সঙ্গে স্থানীয় কিছু মানুষও ছিলেন। থানার সামনে ডিম-টম্যাটো-গোবর ছোড়ার পর আদালতে ঢোকার মুখেও একই বিক্ষোভে পড়তে হয় সব্যসাচীকে। এমনকী সন্ধ্যায় আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও পচা ডিম পড়ে তাঁর পিঠে। অনেকে দূর থেকে মোবাইলে ভিডিও করেন। প্রতিবার পুলিশ তাঁকে রক্ষা করেছে। পুলিশের সাদা পোশাকেও লাগে হলুদ কুসুম!
সব্যসাচীর আইনজীবীদের দাবি, ‘২০১৮ সালে যে অভিযোগ হয়েছিল, সেই মামলা চলছে। অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ পর্যন্ত বিধাননগর উত্তর থানা, দক্ষিণ থানা এবং পূর্ব থানায় ছ’টি প্রতারণার এফআইআর রয়েছে!’ এদিন সকালে সব্যসাচীকে প্রথমে বিধাননগর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে সব্যসাচী বলেন, ‘মিথ্যা অভিযোগ। যিনি অভিযোগ করেছেন তিনিই ২০১৮ সালে প্রতারণার মামলায় জেল খেটেছেন। আমার কাছে তাঁর আত্মীয়রা বেলের জন্য এসেছিলেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি হচ্ছে।’
২০১১ এবং ২০১৬, পরপর দু’বার রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভা থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন সব্যসাচী দত্ত। ২০১৫ সালে বিধাননগরের প্রথম মেয়রও হন। পরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে চলে যান। ২০২১ সালে তিনি তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসুর বিরুদ্ধে বিজেপির টিকিটে বিধাননগরেই প্রার্থী হয়েছিলেন। তারপর হেরে গিয়েছিলেন। পরে আবার তৃণমূলে ফিরে আসেন। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বারাসত কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী হন সব্যসাচী। তবে পালাবদলের ঝড়ে বিজেপির কাছে হেরে যান। সব্যসাচীর গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বিধাননগরের বিজেপি বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, বিধাননগরের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্যের স্তম্ভ। খবরটা আকস্মিক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কবে যাবে, কবে যাবে। যাক হয়ে গেল। বিধাননগরের পুলিশকে সাধুবাদ। পুলিশের তৎপরতায় তৃণমূলের একের পর এক তোলাবাজ গ্রেপ্তার হচ্ছে। তৃণমূল তো এখন দু’টো। তবে ইনি কোন তৃণমূল জানি না।