নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: বিশ্বাসকে পুঁজি করে সুখের দাম্পত্য খুঁজতে আজও জামাইষষ্ঠীতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুগলরা আসেন ৩০০ বছরের প্রাচীন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত মন্দিরে। আড়ংঘাটার যুগলকিশোর মন্দির যেন এক চলমান ইতিহাস। সেই সঙ্গে নদীয়ার এক অবিচ্ছেদ্য স্থানীয় সংস্কৃতির অঙ্গও বটে।
কী সেই ইতিহাস? অভিজ্ঞদের স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে বট, অশ্বত্থ এবং বকুলের গাছের নীচে বসে গঙ্গারামদাস মোহন্ত মহারাজ নিজের কিশোর মূর্তির সঙ্গে মিলন ঘটিয়েছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ির কিশোরী মূর্তির। তৎকালীন বর্ধমান রাজ্য থেকে বৃন্দাবনে গিয়ে সেই কিশোরের মূর্তি নিয়ে এসেছিলেন তিনি। মূর্তি নিয়ে তিনি প্রথমে ওঠেন সমুদ্রগড়ে। কিছুদিন বাদে তিনি চলে আসেন আড়ংঘাটায়। চূর্ণী নদী হয়ে নৌকোয় আসতে গিয়ে খুঁজে পান আজকের বট, অশ্বত্থ এবং বকুলের একত্রে সহাবস্থান। ঠিক করেন, সেখানেই তিনি ঈশ্বর সাধনা করবেন। যেহেতু তিনি আগে বৃন্দাবনে গোবিন্দের আরাধনা করতেন তাই মোহন্ত মহারাজের বাসনা জাগে, কিশোরী পাওয়া গেলে তিনি তাঁর কিশোরের সঙ্গে যুগল মিলন ঘটাবেন। এভাবে আচমকাই স্বপ্নাদেশ পান গঙ্গারামদাস। দেখেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে রয়েছে এক কিশোরী মূর্তি। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে কিশোরী মূর্তি দাবি করেন। যদিও সেই সময়ে কৃষ্ণচন্দ্র জানান, এরকম কোনও মূর্তি তাঁর কাছে নেই। পরে কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পান, তাঁর প্রাসাদেই একটি দেওয়ালের পিছনে রয়েছে কিশোরী মূর্তি। এরপরই সেই মূর্তি বের করে রাজ উপঢৌকন সমেত পৌঁছন আড়ংঘাটা। সেখানে গঙ্গারামদাসের কিশোরের সঙ্গে যুগলমিলন ঘটান। শুধু তাই নয়, প্রায় একশো বিঘা জমি দান করেন তিনি। তৈরি করে দেন আজকের মন্দির। সেই থেকেই সূচনা এই উৎসবের। যুগলকিশোরের চরণ দর্শন দিয়ে শুরু হয় জামাইষষ্ঠীর মেলা।
এরপর প্রায় তিন শতাধিক বছর ধরে সুখী দাম্পত্যের কামনায় প্রতিবছর এই বিশেষ দিনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মন্দিরে আসেন লক্ষ লক্ষ দম্পতি। গোটা জ্যৈষ্ঠ মাস ধরে চলে এই উৎসব। এক সময়ে পার্শ্ববর্তী গেদে লাইনে এত ট্রেন চলত না। তখন মেলার ভিড় সামাল দিতে রেল কোম্পানিকে আলাদা ট্রেন দিতে হতো। প্রতিবছরের মত রবিবারও জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে আড়ংঘাটার যুগলকিশোর মন্দিরে উপচে পড়ে ভিড়। আজও তাঁর জৌলুস কমেনি একরত্তি। মেলা কমিটির সম্পাদক মধুসূদন ধর বলেন, যুগলকিশোর মেলা শুধু আড়ংঘাটার নয়, নদীয়ার জেলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এক চলমান ইতিহাস। আমরা চেষ্টা করি সেই ঐতিহ্যকে অটুট রাখার। এক সময়ে গঙ্গারামদাস মোহন্ত মহারাজ এবং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে যে মন্দির যুগলের প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তার প্রাচীনত্ব এবং প্রাচীন রীতিকে অটুট রাখার চেষ্টা করছি।