সমৃদ্ধ দত্ত: ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনে অসমের প্রত্যন্ত এলাকার এক ৯০ বছরের বৃদ্ধা ভোট দিতে এসে বলেছিলেন জওহরলাল নেহরুর নামের পাশে আমার ভোট দিয়ে দাও। প্রিসাইডিং অফিসার সেই বৃদ্ধাকে বলেছিলেন, নেহরুজি তো এখানে প্রার্থী নন! আপনি তাঁকে ভোট দিতে পারবেন না। সেকথা শুনে ৯০ বছরের বৃদ্ধা ভোট না দিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনে প্রথম ভোটটাই তিনি দিতে চেয়েছিলেন পণ্ডিতজিকে। সেটাই যখন পারবেন না, তাহলে আর ভোট দিয়ে লাভ কী?
১৯৭৭ সালে বিপুল পরাজয়ের পর গ্রামে গ্রামে সফরে বেরিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। বিহারের বেলচি গ্রামে দলিত হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে ভরা বর্ষায় গাড়িতে, জিপে, হাতিতে এবং পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁর পায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামবাসী মহিলারা বলেছিলেন, আমরা ভুল করেছি তোর বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে। আমরা তোর সঙ্গে বেইমানি করেছি। গুজরাতের সুরাত এলাকায় আদিবাসী গ্রামগুলিতে ঘুরছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। রাতের অন্ধকারে সারাদিনের সভা সমাবেশের পর গাড়ির মধ্যে
তিনি ব্যাকরেস্টে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আচমকা জেগে উঠে চকিতে বললেন, গাড়ি থামাও। কেন? কেউ বুঝতে পারেনি। ইন্দিরার কানে গিয়েছে ঘনঘোর অন্ধকার রাস্তায় কেউ যেন গান গাইছে। চারদিকে জঙ্গল। এখানে কে গান গাইবে? কিন্তু গাড়ি থামার পর জঙ্গল থেকে দেখা গেল এক আদিবাসী বেরিয়ে আসছে। তার হাতে ফুল। সেই ফুল ইন্দিরা গান্ধীর হাতে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলেছিল, ১০ বছর অপেক্ষা করছিলাম কবে তোমার সঙ্গে একবার দেখা হবে।
বোফর্স নামক একটি দুর্নীতির ইস্যুতে যাঁকে পরাজিত হতে হয়েছিল বিপুল কলঙ্কের অভিযোগ মাথায় নিয়ে, মাত্র ২ বছরের মধ্যে হওয়া নির্বাচনের সময় সেই রাজীব গান্ধীকে যে পরিশ্রম করতে হচ্ছিল তা একজন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কেন? কারণ প্রতিটি রাজ্যের কংগ্রেস প্রার্থী তাঁকেই চাইছেন প্রচারে। রাজীব গান্ধী সকালে হরিদ্বার, দুপুরে ওড়িশা, রাতে তামিলনাড়ুতে গিয়েছেন। তাঁর মুখ ভরসা করেই কংগ্রেস আবার সরকার গড়তে চলেছে এরকম একটি ধারণা ১৯৯১ সালের মে মাসে হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু সেই বোমা বিস্ফোরণ এসে সব ছিন্নভিন্ন করে দিল। কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত রাজীব ছিলেন কংগ্রেসের সবথেকে জনপ্রিয় সেনাপতি। ক্রাউড পুলার।
এই যে পুরাতন কাহিনিগুলির পুনরাবৃত্তি করা হল, তার কারণ একটাই। ঠিক যে সময়ে কংগ্রেস নামক একটি শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যশালী দলের একজন প্রবল জনপ্রিয় মুখের দরকার ছিল গান্ধী পরিবার থেকে, সেই সময়ই গান্ধী পরিবারের সবথেকে কম জনপ্রিয় এক প্রতিনিধি কংগ্রেসের ভাগ্যনিয়ন্তায় পরিণত হয়েছেন। কংগ্রেসের সবথেকে বড় দুর্ভাগ্য ও সঙ্কট হল, রাহুল গান্ধীর নামে ভোট হয় না। তাঁকে সামনে রেখে প্রচার করলেই ভোট পাওয়া যাবে এই জনপ্রিয়তা তাঁর নেই। যা তাঁর পরিবার ও দলের পূর্ব নায়ক নায়িকাদের ছিল। কংগ্রেসের মুখ ছিলেন নেহরু। ইন্দিরা গান্ধী নিজের নামেই দল গড়ে গোটা কংগ্রেসকেই হাইজ্যাক করে নিয়েছেন।
পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর কাছে আদর্শ একটি স্বপ্ন হল, এমন একটি অবস্থান অর্জন করা, যেখানে সে সম্পূর্ণ মানসিকভাবে স্বাধীন। পুরুষকে পাশে নিয়ে সে চলবে। কিন্তু সারাক্ষণ কোনও পুরুষকে তুষ্ট করে চলার দায় নেই। কোনও পুরুষের অঙ্গুলিহেলনে যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না হয়। পুরুষ তাকে দমিয়ে রাখবে কিংবা পুরুষের কাছে সর্বদাই জবাবদিহি করতে হবে এরকম যেন না হয়। সে সিদ্ধান্ত নেবে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো। পুরুষ তার উপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। বরং সে এমনই ক্ষমতাসম্পন্ন হবে যে, পুরুষতন্ত্র তার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। এমনকী পুরুষতন্ত্রই সেই নারীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং প্রতিনিয়ত তাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। তাকে কীভাবে খুশি করা যায় সেই প্রতিযোগিতায় নিরত ব্যস্ত থাকবে পুরুষতন্ত্র। যে নারী কারও অধীনস্থ নয়, তার কোনও নীতিগত কিংবা পেশাগত উপরওয়ালা নেই। সে নিজেই সর্বময়ী কর্ত্রী। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ঠিক এই অবস্থানই অর্জন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের একমাত্র নারী রাজনীতিবিদ, যাঁর কোনও চালিকাশক্তি নেই। তাঁর কোনও হাইকমান্ড নেই। পুরুষতন্ত্র তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে না। পুরুষতন্ত্র তাঁকে বাধ্য করে না কোনও সিদ্ধান্ত নিতে অথবা সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে। ৪১ বছরের সংসদীয় রাজনীতির জীবনে তিনি বহু সঠিক কাজ করেছেন। বহু ভুলও করেছেন। কিন্তু এই ৪১ বছর ধরে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক গ্রাফ। তৃণমূল কোনও দল নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৃণমূল। তাঁকে দেখে তৃণমূলের ভোটাররা ভোট দেয়।
বিজেপি কোনও কালেকটিভ লিডারশিপের দল আর নেই। বিজেপি এখন মোদির দল। বিজেপির বিপুল ভোটব্যাঙ্ক আসলে মোদির ভোটব্যাঙ্ক। বাংলায় ছন্নছাড়া এবং বহুধাবিভক্ত বিজেপি এরকম ৩৮ শতাংশ ভোটশেয়ার পায় কেন? বঙ্গনেতাদের জন্য নয়। মোদির জন্য এবং ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য। বিজেপি এবং সরকার এখন প্রায় সবটাই পরিচালনা করেন অমিত শাহ। কিন্তু তাঁর মুখের পোস্টার সামনে রেখে ভোট আসবে না। ভোটের জন্য এখনও দরকার মোদিকে। মোদি আজও স্টার ক্যাম্পেনার। মোদির কথায় এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের মোহজাল তৈরি হয়। তাঁকে ডেমিগড হিসেবে বিবেচনা করা মানুষ অসংখ্য। বিজেপির ভোটাররা মোদিকে দেখে ভোট দেয়।
ভারতীয় রাজনীতিতে দল দেখে ভোট হয় না এখন। নেতানেত্রীর জনপ্রিয় হতে হবে। দলের প্রধান নেতানেত্রীকে জনপ্রিয়তম হতে হবে। তাঁকে দেখে, তাঁর নামে, তাঁকে জয়ী করার জন্যই যেন ওই দলের ভোটারকুল ভোট দেয়। এই প্রবণতা ভারতে বহু দলের আছে।
সমাজবাদী পার্টির ভোটব্যাঙ্ক আসলে অখিলেশ যাদবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সমাজবাদী পার্টির ভোটের ভিত্তি মুলায়ম সিং যাদব। যেহেতু তাঁর পুত্র অখিলেশ যোগ্য এবং পিতার ঘোষণা করে যাওয়া উত্তরসূরি, তাই এখন তাঁর নামেই ভোট হয়।
তেজস্বী যাদব নতুন যুগের লালুপ্রসাদ যাদব। তিনি রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নতুন সেনাপতি। এবং তিনিই ভোটের মুখ। গোটা বিহারে তাঁর দলের প্রতিটি প্রার্থী চাইবে একবার অন্তত তেজস্বী যাদব তাঁর হয়ে প্রচার করুন। তেজস্বীর ছবিতে পূর্ণ বিহার। আম আদমি পার্টিই হোক কিংবা ডিএমকে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং এম কে স্ট্যালিন। দলের নেতানেত্রীরা যদি দলের প্রধান ক্রাউড পুলার হতে না পারেন, তাহলে সেই দলের ভবিষ্যৎ তেমন উজ্জ্বল নয়। জয়ললিতার রেখে যাওয়া এআইএডিএমকের অবস্থা দেখলেই এই তত্ত্বের প্রমাণ পাওয়া যাবে। এই দলের কোনও নেতা নেত্রী নেই, যাঁর মুখ সামনে রেখে ভোট চাওয়া যায়।
রাহুল গান্ধী কি তাহলে অযোগ্য? মোটেই নয়।
তাঁর সবথেকে বড় শক্তি ও সাফল্য হল, তিনি কিন্তু ময়দান থেকে পালাননি। দাঁতে দাঁত চেপে রয়ে গিয়েছেন। এবং বহু ইস্যুতে তাঁর তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী নরেন্দ্র মোদিকে তিনি বাধ্য করেছেন ব্যাকফুটে যেতে। কৃষি বিল থেকে কাস্ট সেন্সাস। রাহুলের জেদ ও দাবি মেনে মোদিকে পিছিয়ে যেতে হয়েছে।
সমস্যা হল, শুধু এই সততা ও জেদ যথেষ্ট নয়। রাহুলের মধ্যে জননায়কোচিত স্পার্ক সেভাবে দেখা যায় না এখনও। কোনও রাজ্যে তাঁকে সামনে রেখে, তাঁর ছবি দেখিয়ে ভোট হয় না। সেই জনপ্রিয়তা এবং ক্যারিশমা তাঁর নেই। এটাই কংগ্রেসের সবথেকে বড় প্রতিবন্ধকতা। কংগ্রেসের রাজনীতির ইতিহাসে গান্ধী পরিবার ছাড়া চলবে না। আবার সেই পরিবারের সদস্যকে জনমনে প্রতিষ্ঠিত এক উজ্জ্বল নায়ক অথবা নায়িকা হওয়াও দরকার। যা রাহুল গান্ধী নন।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ওই বিপুল সাফল্য তাই ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে কংগ্রেস। এত কিছু হয়ে যাচ্ছে ভারতে, ইন্ডিয়া জোট কোথায়? রাহুল কিংবা কংগ্রেসের সেই উদ্যোগ কোথায়? বিজেপি ১১ বছর ধরে ক্ষমতাসীন। অথচ রাস্তাঘাটে, প্রচারে, সমাবেশে, মিছিলে, কর্মসূচিতে, প্রোপাগান্ডায় সর্বত্র বিজেপি। থাকার কথা তো কংগ্রেস অথবা ইন্ডিয়া জোটের! ইন্ডিয়া জোটের যৌথ কর্মসূচি একটাও হয় আজকাল? হয় না। কোথায় তারা? এরকম হালকা মনোভাব নিয়ে মোদির বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুদ্ধ করা যায় নাকি? ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে যাদের সবথেকে বেশি সক্রিয় এবং শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল, সেই কংগ্রেস সবথেকে দুর্বল ও নিষ্ক্রিয়! প্রত্যেকটি আঞ্চলিক দলের রাজ্যস্তরে একজন করে প্রবল জনপ্রিয় নেতানেত্রী আছেন। কংগ্রেসের শুধু একজন জনপ্রিয়তম জাতীয় নেতার দরকার ছিল! মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারবেন যিনি! রাহুল সেই ব্যক্তি নয়! তাই কংগ্রেস যা সাফল্য পাচ্ছে সব রাজ্যস্তরে। কিন্তু মোদিকে টেক্কা দিতে পারছে না। কারণ ওই যে, জনতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করার ম্যাজিক উপস্থিতি রাহুলের নেই।