পশ্চিমবঙ্গে ভোটে দলবাজি, কারচুপির অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব বিজেপি। একুশে মোদি-শাহের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার পর ওই অভিযোগের পালে জোরদার হাওয়া লাগে। অনুমান হয় যে, তাই ছাব্বিশের ভোটে ইসপার-উসপার খেলারই সংকল্প নিয়েছে কেন্দ্রের শাসক দল। নবান্ন দখলের জন্য আসল যে কাজটি দরকার, তা হল মানুষের মন জয় করা। তার জন্য একদিকে যেমন মজবুত সংগঠন গড়া দরকার, তেমনি চাই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ইতিবাচক ব্যবহার, যা দিয়ে বাংলার দিকে দিকে সকলেরই জন্য কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্প কর্মসূচি রূপায়িত হতে পারে। এসব বেশি করে দরকার এজন্য যে, বাংলায় তাদের প্রধান প্রতিপক্ষের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার রাজনীতির উৎস এবং লক্ষ্য—দুটোই মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এবং প্রশাসনের সর্বময় কর্ত্রী হিসাবে জননেত্রী যা করেছেন সবটাই মানুষের স্বার্থে। অন্যদিকে, নিতান্তই দিল্লির আজ্ঞাবহ দাস বঙ্গ বিজেপি এসব প্রশ্নে হয় অসহায় দর্শকমাত্র কিংবা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ। তাই ভোট সামনে আসতেই বিজেপির পক্ষে ফার্স্ট হওয়া দূর, পাশ নম্বর তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব, ভরসা রাখতে হয় ঝেঁপে টোকাটুকি আর লাস্ট মিনিট সাজেশনে।
মমতার সরকারের প্রকল্প টোকাটুকি আজ আর নতুন কিছু নয়, সারা দেশ তা করছে কুণ্ঠা ছাড়াই। তার সঙ্গে লাস্ট মিনিট সাজেশনের মতো এবার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এসআইআর। সিএএ প্রকল্প ফেল করার পর এসআইআরেই বেশি জোর দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু পাইকারি হারে মতুয়া ভোট বাদ পড়তেই প্রমাদ গুনতে শুরু করেছে গেরুয়া বাহিনী। অতএব তারা আবদার জুড়েছে মমতার ‘বশংবদ’ আমলাদের নবান্ন, লালবাজার থেকে দূরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের পাঠিয়ে দিতে হবে ভিন রাজ্যে পর্যবেক্ষক হিসাবে। স্বচ্ছ এবং হিংসাশূন্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার নামে কমিশন যে বঙ্গ বিজেপির অনেক আবদারই রাখছে তার একের পর এক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবকে অন্য রাজ্যে পর্যবেক্ষক হিসাবে পাঠানো নিয়ে শুরু হয়েছিল সংঘাত। রাজ্য তাতে কোনোভাবেই সম্মত হয়নি। বরং এসআইআর ইস্যুতে সংঘাত বৃদ্ধি করে সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত চলে যায়। সুপ্রিম কোর্ট সেটি গ্রহণ করলেও নিষ্পত্তি এখনো বিশ বাঁও জলে। অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা হাতে নিয়েই ভোট ঘোষণা করেছে ইসিআই। এই জিনিস সারা দেশেই বেনজির। কমিশন হয়তো বলতে চেয়েছে, যেটা রাজ্য প্রশাসনের বোধগম্য হয়নি, বেনজির পদক্ষেপের সবে তো শুরু! সত্যিই তাই, ভোট ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, গভীর রাতে জ্ঞানেশ কুমার একসঙ্গে সরিয়ে দেন রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে। পরবর্তী সূর্যোদয়ের পর পরই সরানো হয়েছে কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশের একের পর এক শীর্ষকর্তাকে। আমলা অপসারণের পদক্ষেপে এখনো ইতি পড়েনি। বরং তা অব্যাহত অধিক গতিতে! মঙ্গলবার একধাক্কায় রাজ্যের ১২ জন পুলিশ সুপারকেও বদল করা হয়েছে। সরানো হয়েছে কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) এবং চার পুলিশ কমিশনার ও এডিজি পদমর্যাদার দুই কর্তাকেও। ব্যাপারটা বস্তুত ‘বদলি-বোমা’র চেহারা নিয়েছে।
স্বভাবতই, কমিশনকে সরাসরি নিশানা করে সাংবিধানিক রীতিভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়াই এসব বদলি করা হচ্ছে। অতীতে নির্বাচন পর্বে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কোনো অফিসারকে সরাবার আগে কমিশন সাধারণত রাজ্যের কাছে প্যানেল চেয়ে নিত। এবার সেই পুরানো রীতি ভাঙল ইসিআই। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, গেরুয়া নির্দেশ কার্যকর করতেই মাঠে নেমেছে কমিশন। রাজ্য-কমিশন এই সংঘাত মেটার কোনো লক্ষণ নেই। বরং এই অনুমানই দৃঢ় হচ্ছে যে, বেনজির সংঘাত জিইয়ে রেখেই বদলির পালা জারি রাখবেন জ্ঞানেশ কুমাররা। রাজ্যের অপসারিত স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশ প্রসাদ মীনাকে ভিন রাজ্যের ভোট পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করছে কমিশন। তাঁকে তামিলনাড়ুর একটি বিধানসভা কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে বলেই খবর। যে ইস্যুতে রাজ্যের সঙ্গে কমিশনের সংঘাত শুরু, জ্ঞানেশ কুমাররা সেই জেদ বজায় রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি বিশেষ কোনো বার্তা দিচ্ছেন? হতে পারে বুথে নজরদারিসহ আরো কিছু বিষয়ে দেওয়া একের পর এক হুঁশিয়ারি কার্যকর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কমিশন। কিন্তু কমিশন এটাই ভুলে যাচ্ছে, এইভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে জব্দ করা যাবে না। কারণ তারা একমাত্র মানুষের ভরসাতেই ভোট লড়তে নেমেছে। ভোট কোনো আমলা, পুলিশ, পর্যবেক্ষক কিংবা অন্য কোনো কড়া ব্যবস্থা এসে দেবে না। ভোট দেবে মানুষ। তারা মমতার সরকারের কাছে বারোমাস নানাভাবে উপকৃত। ভোটযন্ত্রে বোতম টিপে প্রতিদান দিতে তারা কোনো ভুল করবে না।