Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ক্ষতিপূরণ প্রহসন

ক্ষতিপূরণ প্রহসন
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। অর্ধেকের বেশি ভারতবাসীর জীবিকা কৃষি কিংবা কৃষিনির্ভর কাজকর্ম। কৃষিই ভারতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। করোনা বিপর্যয়ের তিনবছরেই এর অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। যখন উৎপাদন এবং পরিষেবার বেশিরভাগ ক্ষেত্র মুখ থুবড়ে পড়েছিল তখন একমাত্র কৃষিই ছিল মাজা সোজা করে। কৃষির ঋজু মেরুদণ্ডই ওই দুঃসময়ে ভারতীয় অর্থনীতির গতি ও বৃদ্ধি মোটামুটি ধরে রেখেছিল। এজন্যই স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কৃষকদের ‘অন্নদাতা’ আখ্যা দেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গিয়েছে, এটা নিছকই স্তোক। কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকার কোনও বদলই ঘটেনি। তাই তো প্রতিবছর বহু কৃষক নতুন করে ঋণের ফাঁদে পড়েন এবং আত্মহত্যা করেন। এনসিআরবির সর্বশেষ রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে ১০,৭৮৬ জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছিলেন। সে-বছর মোট যত মানুষ আত্মহত্যা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কৃষকের শতাংশ হার ৬.৩। কৃষকের আত্মহত্যার নিরিখে সবচেয়ে খারাপ রাজ্যগুলি হল—মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু প্রভৃতি। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে একাধিক রাজ্য বিজেপি/এনডিএ শাসিত। এই ভয়াবহ ছবির দায় মোদি সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। 

Advertisement

এজন্যই মান্য অর্থনীতিবিদরা কৃষিক্ষেত্রে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ এবং শস্যবিমার পরিধি বৃদ্ধির উপর জোর দেন। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী শস্যবিমা যোজনাও (পিএমএফবিওয়াই) চালু হয় দেশজুড়ে। কিন্তু তার দরুন কৃষকের বাস্তবে কতটা উপকার বা লাভ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন বারবার উঠছে। গত সেপ্টেম্বরে মহারাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান জেলা আকোলা অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে। তাতে ব্যাপক ক্ষতি হয় মুগডাল, তুলো এবং সয়াবিন চাষের। জমিতে জল জমে নষ্ট হয় বহু টাকার ফসল। এই খবর চাউর হতেই মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকার থেকে আশ্বস্ত করা হয় যে, পিএমএফবিওয়াই মারফত দীপাবলির আগেই কৃষকরা ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে যাবেন। সেই গালভরা আশ্বাসে প্রভাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আবেদনও করেন। কিন্তু দীপাবলির আগে দেখা যায়, কারও ব্যাংক অ্যকাউন্টে ঢুকেছে মাত্র ৩ টাকা আবার কেউ পেয়েছেন ২১ টাকা ৮৫ পয়সা। এমন ক্ষতিপূরণ নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ দিনোদা, কুতাসা ও কুবাসা গ্রামের কৃষকরা। ওই অর্থ দিয়ে তাঁদের সঙ্গে ‘রসিকতা’ করা হয়েছে বলে তোপ দেগেছেন কৃষকরা। ডিএম অফিসে গিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক ফেরতও দিয়ে এসেছেন তাঁরা। পাশাপাশি, এই ইশ্যুতে বৃহত্তর আন্দোলন শুরু করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এক কৃষকের কথায়, সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদানে শস্যবিমার ওই অর্থ দিয়ে সরকার অপমানই করেছে আমাদের। আমরা অর্থ ফেরত দিয়ে বড়োসড়ো আন্দোলন শুরু করেছি। বিরোধী দল কংগ্রেসের বক্তব্য, কৃষকদের অপমান করার অধিকার কারও নেই। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের সঙ্গে রীতিমতো ‘রসিকতা’ করেছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। 
কৃষকদের এমন আজব ক্ষতিপূরণ কেন? এই প্রশ্নে ডিএমের আশ্বাস, কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ওই কাণ্ড ফিকে হওয়ার আগেই সামনে এল আর এক ‘কেলেঙ্কারি’। দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় প্রচারের ঢক্কানিনাদই সার। মধ্যপ্রদেশেও মারাত্মক কাণ্ড। স্বয়ং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের নিজের এলাকা, মধ্যপ্রদেশের সিহোর জেলার কৃষকদের একাংশই মোদি সরকারের বিমা যোজনায় ফসলের ক্ষতিপূরণের ‘ক্লেম’ চেয়ে পেয়েছেন ১ থেকে ৩ টাকা মাত্র! কেউ বড়োজোর ২১ টাকা। ফলে প্রবল অস্বস্তিতে কৃষিমন্ত্রক। আর এই ঘটনা জানতে পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিবরাজ স্বয়ং। দিল্লির কৃষিভবনে ১০টি বিমা কোম্পানির প্রতিনিধিদের ডেকে তিনি প্রবল ভর্ৎসনা করেছেন। এমনকি কোনও রাখঢাক না করেই তিনি বলেছেন, ‘এটা তো প্রহসন! এ আমি চলতে দেব না। কীসের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ ঠিক করা হয়েছে?’ বৈঠকে মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশের ভুক্তভোগী কৃষকদেরও অনলাইনে যুক্ত করেছিলেন মন্ত্রী। সরাসরি তাঁদের মুখ থেকেই অভিযোগ শোনানো হয় বিমা কোম্পানিগুলির প্রতিনিধিদের। কৃষিমন্ত্রীর ধমক খেয়ে তখন আমতা আমতা করা ছাড়া উপায় ছিল না তাঁদের। ‘রাজ্য সময়মতো প্রিমিয়াম দেয় না’—এই অভিযোগ পুরোনো। সরকার এবং বিমা কোম্পানির মধ্যেকার বিবাদের দাম কৃষককে মেটাতে হবে কেন? ভারতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষি এবং অন্নদাতাদের বাঁচানোর দায়িত্ব সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। সরকারকে সময়মতো প্রিমিয়াম মেটাতে হবে। তারপরেও যদি বিমা সংস্থাগুলি ক্ষতিপূরণ-প্রহসন চালিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা দেখায় তবে তাদের থেকে পর্যাপ্ত পেনাল্টি আদায় করাই দস্তুর। অন্য আইনানুগ ব্যবস্থাও নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। কারও স্বার্থ কৃষকের স্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়, কৃষকের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সরকার যেন বিমা সংস্থার সঙ্গে কোনোরকম আপসের পথে না হাঁটে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ