প্রীতম দাশগুপ্ত: সময় পাল্টেছে। নীতি বদলায়নি। বিভাজনের সেই নীতি আজও বহমান। ভাগাভাগি আর ভাঙাভাঙির খেলায় আজও মেতে রয়েছে দেশ। ব্রিটিশরা নিয়েছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি। বিদায়লগ্নে তারা মরণ কামড়ও দিয়ে গেল। অখণ্ড দেশকে খণ্ডিত করে ধৰ্ম ও সম্প্রদায়ের নামে এঁকে গেল এক সুদূরপ্রসারী বিভেদের ক্ষতচিহ্ন। রবীন্দ্র প্রয়াণের ছ’বছরের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বপন হয়েছিল, তা আজ বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আজকের শাসকেরও প্রধান হাতিয়ার ওই বিষবৃক্ষই। আর এখন তো কাছেই রয়েছে হাতেগরম ইস্যু। পহেলগাঁওয়ের হামলা। যার বিরুদ্ধে ফুঁসছে গোটা দেশ।
আমরা ও তোমরা। এই বিভাজন রাজনীতি আজ
সর্বত্র ছড়িয়ে গিয়েছে। বিপদটা বহু আগেই বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম এবং তার সূত্র ধরে যে অসহিষ্ণুতার আবহ আজ গোটা দেশজুড়ে দেখা যাচ্ছে, তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’ শীর্ষক রচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘...বহুর মধ্যে আপনাকে বিক্ষিপ্ত করিয়া ফেলা ভারতবর্ষের স্বভাব নহে, সে এক কে পাইতে চায় বলিয়া বাহুল্যকে একের মধ্যে সংযত করাই ভারতের সাধনা।’
স্বাধীনতার আগেও এই দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি হয়েছে। পরেও হয়েছে। এবং হয়েছে দু’পক্ষেরই প্রত্যক্ষ মদতে। কিন্তু রামরথের চাকা গড়ানো ও ৪০০ বছরের পুরনো সৌধ ভেঙে দেওয়ার পরে যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ ছেয়ে গিয়েছে, তা থেকে আজও বেরতে পারেনি বহু দেশবাসী। সম্প্রতি জঙ্গি হামলা হয়েছে পহেলগাঁওয়ে। এরপরই যেন চেষ্টা চলছে একটি সম্প্রদায়ের সব মানুষকেই জঙ্গি তকমা সাঁটিয়ে দেওয়ার। কোথাও বা সেই সম্প্রদায়কে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট করা হচ্ছে। জঙ্গি হামলায় নিহত নৌসেনা আধিকারিকের স্ত্রী পর্যন্ত বলেছেন, ‘দয়া করে কাশ্মীরি বা মুসলিমদের টার্গেট করবেন না।’ অবিশ্বাসের বাতাবরণ এমনই জায়গায়, এই কথা বলার কারণে নিহতের স্ত্রীকেও ট্রোল করা হচ্ছে! রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এই সমস্যা বহু আগেই ধরেছিলেন। তাই ভারতের অন্তর্নিহিত সত্য যে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য—সেকথা তিনি তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, গান, নাটকে বারেবারে উল্লেখ করেছেন।
১৩১৭ বঙ্গাব্দে ভারত তীর্থ কবিতায় সাম্প্রাদয়িক সম্প্রীতির মূল ভাবনা ফুটিয়ে তুলেছিলেন কবি। লিখেছিলেন, ‘...এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান/ এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ,এসো এসো খৃস্টান/ এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মনধর হাত সবাকার/ এসো হে পতিত, হোক অপনীতসব অপমানভার/...আজি ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।’
একথা মোটেও ভুল নয় যে, সাধারণ মানুষকে অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে বহুভাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু ভারতবর্ষেই নয়, এই উপমহাদেশ ও বিশ্বের বহু দেশেই এই মৌলবাদকেই আশ্রয় করেই রক্তক্ষয়ী জাতিদাঙ্গা চলছে। ভাতৃঘাতী দাঙ্গায় মাটির রং হয়েছে লাল। সাম্প্রদায়িকতার জিগির এমনই, হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ইতিহাস শাবল-গাঁইতির আঘাতে মুহূর্তে ধসে গিয়েছে। ধর্ম এমনই এক ‘আফিম’ যার নেশায় অনেকসময় মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। পড়শি দেশ বাংলাদেশের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প কীভাবে তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টির উপর ছেয়ে গিয়েছে।
একটা প্রবাদ আছে, ঘরে আগুন লাগলে, কূপ খুঁড়তে যাওয়ার চেষ্টা বৃথা। রবীন্দ্রনাথ সেকথা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি লিখেছিলেন, বঙ্গভঙ্গের সময় মুসলিমদের কাছে টানতে আমরা সেই কূপ খননেরও চেষ্টা করিনি।
ইতিহাস পাঠের পর এবং অভিজ্ঞতার নিরিখে রবীন্দ্রনাথ সঙ্গতভাবেই বুঝেছিলেন, ভারতের ইতিহাসের মূল সুর, সংঘর্ষ নয়, সামঞ্জস্য। নানা জাতি, ভাষা, ধৰ্ম, মত
মিলে ভারতবর্ষ যে বহুধা সংস্কৃতির দেশ তা উপলব্ধি করেছিলেন কবিগুরু। ১৩২১ বঙ্গাব্দে সবুজপত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল লোকহিত প্রবন্ধ। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী-প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাঁহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই। ...আমরা বিদ্যালয়ে ও আপিসে প্রতিযোগিতার ভিড়ে মুসলমানকে জোরের সঙ্গে ঠেলা দিয়াছি; সেটা সম্পূর্ণ প্রীতিকর নহে তাহা মানি; তবু সেখানকার ঠেলাঠেলিটা গায়ে লাগিতে পারে, হৃদয়ে লাগে না। কিন্তু সমাজের অপমানটা গায়ে লাগে না, হৃদয়ে লাগে।’
তবে একথাও সত্য যে মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে বরাবর সরব ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যথাযথভাবেই ‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, যখন দুই-তিনটি ভিন্ন ধর্ম দাবি করে যে কেবল তাদের নিজস্ব ধর্মই সত্য এবং অন্যান্য সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, তাদের ধর্ম কেবল স্বর্গে যাওয়ার পথ, তখন দ্বন্দ্ব এড়ানো যায় না। এইভাবে, মৌলবাদ অন্য সমস্ত ধর্মকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। …হিন্দুধর্মের দেখানো পথই কেবল এই নীচতা থেকে বিশ্বকে মুক্তি দিতে পারে।’ ধর্মের নামে মুসলিম সমাজের গোঁড়ামি নিয়েও তাঁর লেখনি তীব্র হয়েছিল।
কবিগুরুকে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের পক্ষে বলেছিলেন, আবার মুসলিম মৌলবাদীরা তাঁকে ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়েছিলেন। আসলে কবিগুরু ছিলেন সব ধর্মের ঊর্ধ্বে। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ সবসময়ই ব্যথিত করেছে রবীন্দ্রনাথকে। এই ভাই-ভাই লড়াইয়ের একটি স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, মাটি পরিষ্কার না করলে কাঁটাগাছই জন্মায়। ফল আশা করতে পারেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন হিন্দুদের মতো মুসলমানদেরও নিজস্ব অধিকার আছে। কিন্তু সেটা হোক উভয় সম্প্রদায়ের ঐক্যের বাতাবরণের মধ্যেই।
রবি ঠাকুর শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমান সমস্যা
নিয়েই আলোচনা করেননি, এর সমাধানের কথাও ভেবেছেন। বলেছেন, শিক্ষার দ্বারা, সাধনার দ্বারা এই সমস্যাকে দূর করতে হবে। যে ধর্মমোহ আমাদের মিলতে দেয় না, সেই মোহ থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। তিনি লিখেছিলেন, যে দেশে ধর্মকে দিয়ে বিভেদের সৃষ্টি করা হয়, সেটিই হল সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। হিন্দু-মুসলিম এই বিভেদকে তিনি পাপ বলে বিবেচনা করতেন। তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে সেই বাণী। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় তাঁর বিশ্লেষণ, ‘আমরা এক দেশে এক সুখ দুঃখের মধ্যে একত্রে বাস করি, আমরা মানুষ, যদি এক না হই তবে সে লজ্জা, সে অধর্ম।’
আসলে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করলেও মনের আত্মীয়তা হয়তো সেভাবে তৈরি হয়নি। এমনকী অতীতে মুসলিমদের প্রায় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেও গণ্য করা হতো। সেসব নিজের চোখেই দেখেছিলেন কবিগুরু। কিশোর বয়সের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান প্রবন্ধে নিজের জমিদারির দিনের কথাও উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে তিনি লিখেছেন, হিন্দু-মুসলমানের জন্য কেমন বিভেদের আয়োজন করা হতো। প্রবন্ধে বলেন, ‘...অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে-তক্তপোশের গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে একধারে জাজিম তোলা, সেটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্য; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটা দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল।’
বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনের সময় একটা সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বলা হয়েছিল, হিন্দুরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যেভাবে আন্দোলনে শামিল হয়েছে, মুসলিমরা সেই ডাকে তেমন একটা সাড়া দেননি। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এই সমালোচনা গায়ে মাখেননি। বরং শানিত ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এর দায় হিন্দু সমাজকেই নিতে হবে। লোকহিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘বঙ্গবিচ্ছেদ-ব্যাপারটা আমাদের অন্নবস্ত্রে হাত দেয় নাই, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করিয়াছিল।’
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধেই রাখিবন্ধনের ডাক দিয়েছিলেন কবিগুরু। সেই রাখি বন্ধনে মুসলমান সমাজ সাড়া দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুধু তাঁর ভাবনা কলমেই সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। হাতে-কলমে হিন্দু-মুসলমান সমাজের ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন। ঠিক করেছিলেন চিৎপুরে মসজিদে ঢুকে রাখি পরিয়ে দেবেন। সেদিনের কাহিনি শোনা যায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জবানিতে। সেদিন সকলে যথারীতি ঢুকে গিয়েছিলেন মসজিদের ভিতর। তারপর সামনে মৌলবি এবং অন্যান্য যাঁদের যাঁদের পেলেন তাঁদের প্রত্যেকের হাতে পরিয়ে দিলেন রাখি।
শুধু লেখনিই নয়, পাবনায় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনেও সভাপতির ভাষণে তিনি হিন্দু-মুসলিম বিবাদের কথা তুলে ধরে রাজনীতিকদের সতর্ক করে দেন। ভাষণে তিনি বলেন, ‘কত শত বৎসর হইয়া গেল, আমরা হিন্দু ও মুসলমান একই দেশমাতার দুই জানুর উপর বসিয়া স্নেহ ভোগ করিতেছি। তথাপি আজও আমাদের মিলনে বিঘ্ন ঘটিতেছে।’ আক্ষেপ করে তিনি বললেন, ‘আমরা কথায় কথায় শাস্ত্রের দোহাই দিই। অথচ শাস্ত্রে হিন্দু-মুসলমান সম্পন্ধে পরস্পরকে এমন করিয়া ঘৃণা করিবার কোনও বিধান দেখি না’। আজও রাজনীতির কারবারিরা নিজেদের স্বার্থে সেই বিভেদের অস্ত্রে শান দিয়ে যাচ্ছে।
আসলে রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানব ধর্ম। তিনি বিশ্বাস করতেন মনুষ্যত্বে। গোরা উপন্যাসে তাই তিনি লিখতে পেরেছিলেন ‘আপনি আজ আমাকে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই। যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে কোনো দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নয়, গোটা ভারতবর্ষের দেবতা’। তিনি বলেই দিয়েছিলেন, ‘কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, আমার ধর্ম নয়’। তাঁর কথায়, ‘ধর্মের সরল আদর্শ একদিন আমাদের ভারতবর্ষেরই ছিল। উপনিষদের মধ্যে তাহার পরিচয় পাই। তাহার মধ্যে যে ব্রহ্মের প্রকাশ আছে, তাহা পরিপূর্ণ, তাহা অখণ্ড, তাহা আমাদের কল্পনা-জালদ্বারা বিজড়িত নহে’। তিনি আসলে মনে প্রাণে যেটা বিশ্বাস করতেন, সেটা হল, বিশ্ব মানবের কোনও ধর্মীয় বা স্বতন্ত্র সাম্প্রদায়িক পরিচিতি নেই। মানুষ অমৃতের পুত্র।
‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো/ এঅভাগা দেশে জ্ঞানোর আলোক আনো।’