Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দোস্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ ভূমিকা

দোস্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ ভূমিকা
  • ২৪ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: প্রধানমন্ত্রী মোদি শেক্সপিয়ার পড়ে থাকতে পারেন আবার নাও পড়তে পারেন, কিন্তু তিনি অবশ্যই শেক্সপিয়ারের কথার সত্যতা আত্মস্থ করেছেন যে, ‘বন্ধুত্বের মধ্যে তোষামোদ থাকে’ (ষষ্ঠ হেনরি)। নরেন্দ্র মোদি আশা করেন যে, অভিবাসন ও বহিষ্কার, ভিসা, বাণিজ্য ভারসাম্য, শুল্ক, পারমাণবিক শক্তি, দক্ষিণ চীন সাগর, ব্রিকস, কোয়াড এবং এফটিএ’র মতো বিষয়গুলি তাঁর বন্ধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তোষামোদ পূর্বক আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করে ফেলবেন। 

Advertisement

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে চার বছর আছে, তার বেশি নয়। হাতে চার বছর আছে প্রধানমন্ত্রী মোদিরও। তবে তিনি আরও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে চান বলেই মনে করা হয়। এটা পরিষ্কার যে, দু’জনের আগামী চারটি বছরে সমস্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আমেরিকার পরবর্তী সরকার, সেটি রিপাবলিকান অথবা ডেমোক্র্যাট যাদেরই হোক না কেন—তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথের পথিক নাও হতে পারে।
ভারতের জন্য প্রথম শিক্ষা নিহিত এখানেই। অতএব দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত ‘বন্ধুত্বের’ বাইরেই তাকানো দরকার। তাছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলতে গেলে, তাঁর কাছে কখন বন্ধু যে শত্রু হয়ে যাবেন আর শত্রু হয়ে উঠবেন বন্ধু, তা কেউ হাত গুনে বলতে পারবেন না।
ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
পডকাস্টার লেক্স ফ্রিডম্যানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নরেন্দ্র মোদি প্রশংসা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নম্রতা এবং বিরূপ পরিস্থিতিকেও অনুকূলে আনার ক্ষমতার। তিনি উল্লেখ করেছেন যে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত’ এবং ‘তাঁর মনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে। প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপগুলিও ঠিক করা আছে সুনির্দিষ্টভাবে।’ নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, ‘আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে তিনি একটি শক্তিশালী এবং উপযুক্ত টিম গড়ে নিয়েছেন। আমি মনে করি, ওই শক্তিশালী টিম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিন্তাধারা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।’ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই ভূয়সী প্রশংসা সম্পর্কে সকল আমেরিকাবাসীও একমত হবেন না। সকল সেনেটর এবং প্রতিনিধি মনে করেন না যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব সেক্রেটারি বেছে নিয়েছেন তাঁদের সকলেই যোগ্য কিংবা শক্তিশালী। আমেরিকার সব মানুষ এই ব্যাপারেও একমত হবেন না যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভিশন’ বিশ্বের পক্ষে, এমনকী আমেরিকা পক্ষেও কল্যাণকর। 
যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ভাবনার বাস্তবায়ন 
করেন, তবে তা ভারতের জন্য মোটেই ভালো খবর হবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর লক্ষ্য অর্জনে সফল হন, —
• এর অর্থ হবে, উপযুক্ত নথি ছাড়াই আমেরিকায় বসবাসকারী বেশিরভাগ ভারতীয়কে (মোটামুটি সাত লাখ) ভারতেই ফেরত পাঠানো হবে; 
• এর অর্থ হবে, গ্রিন কার্ডধারী বেশকিছু ভারতীয়ের মার্কিন নাগরিকত্ব খারিজ করা হবে; 
• এর অর্থ হবে, বেশিরভাগ ভারতীয়-মার্কিন নাগরিক তাঁদের পরিবারকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে পারবেন না; 
• এর অর্থ হবে, উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের জন্য ইস্যু করা এইচ-১বি ভিসার সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে; 
• এর অর্থ হবে, হার্লে-ডেভিডসন বাইক, বোর্বন হুইস্কি, জিন্স এবং অন্যান্য মার্কিন পণ্যের উপর প্রযোজ্য শুল্ক কমাতে ভারতকে বাধ্য করা হবে; 
• এর অর্থ হবে—নতুন, কঠোর আমেরিকান শুল্ক অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত পণ্য এবং সম্ভবত অন্যান্য ভারতীয় পণ্য রপ্তানির সামনেও একটি সুরক্ষামূলক প্রাচীর হিসেবে খাড়া হবে; 
• এর অর্থ হবে—ভারতে ব্যাপক সংখ্যায় কর্মসংস্থান হতে পারে এমন শিল্প-ব্যবসা স্থাপনে আগ্রহী মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করা হবে; এবং 
• এর অর্থ হবে যে, যেসব মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এখনও আলোচনাসাপেক্ষ তা আমেরিকার দিকে ঝুঁকে অথবা সেসব দিনের আলো দেখবে না। বর্তমান ইঙ্গিত এটাই যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অবস্থান বদল করবেন না কিংবা তিনি লক্ষ্য থেকে সরবেন না। কোনোরকম বন্ধুত্ব বা তোষামোদের সৌজন্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ম্যাগা’ সমর্থকদের স্বার্থ কিংবা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাইরে তাকাবেন, সেই সম্ভাবনা কম।
ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এবং রক্তপাতহীন অভিযানে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়! এমন বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুগুলির প্রেক্ষিতে নরেন্দ্র মোদির প্রতিক্রিয়া কী হবে? তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত খালটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারত কিংবা অন্যকোনও দেশের প্রতিবাদ করার সম্ভাবনা কম। তবে তা হবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনও অঞ্চল দখল করে নেওয়ার মতোই ব্যাপার। এরপর, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘যেকোনোভাবে’ গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তাহলে নরেন্দ্র মোদির প্রতিক্রিয়া কী হবে? ভারত কি বলতে পারে যে গ্রিনল্যান্ড খুব দূরে এবং আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়? কিছু ‘বিজয়’ মেনে নিলে—যদি ইউক্রেনের আরও কিছু অঞ্চল রাশিয়া দখল করে এবং যদি চীন দখল করে তাইওয়ান—তাহলে আমাদের কী যায় আসে? এবং, আকসাই চীন বা অরুণাচল প্রদেশ দখলের চেষ্টা থেকে চীনকে তখন কে বাধা দেবে? একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধবে, তবে ভারতকে তখন কোন দেশ সমর্থন করবে?
আধুনিক কূটনীতি ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের চেয়েও বেশিকিছু। নরেন্দ্র মোদি বা ভারত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে কেবলমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরিহর আত্মা হতে পারেন না। যাই হোক, ২০২৯ সালের ১৯ জানুয়ারির পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ক্ষমতায় থাকবেন না। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে পারেন একজন ডেমোক্র্যাট নেতা। তাহলে ভারত ইতিমধ্যেই, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ‘লক্ষ্য’-এর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে একমত হয়ে কানাডা এবং ইউরোপীয় দেশগুলি, বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ডেনমার্কের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক চুকেবুকে ফেলতে পারত। 
শুল্ক যুদ্ধ
গত এক দশকে, নরেন্দ্র মোদি প্রোটেকশনিজম 
বা সুরক্ষাবাদের সমর্থক ছিলেন। তাঁর ভাষায় এটি 
ছিল ‘আত্মনির্ভরতা’। তাঁর বন্ধু ডঃ অরবিন্দ পানাগড়িয়া-সহ বিজ্ঞজনদের পরামর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে, মোদি সরকার পাঁচ শতাধিক পণ্য আমদানির উপর শুল্ক এবং নিঃশুল্ক ব্যবস্থা আরোপ করেছিল। নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতীয় পণ্যের উপর 
প্রস্তাবিত চড়া শুল্কের প্রতিবাদ করেছিলেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই আপত্তি। আগামী ২ এপ্রিল একটি পূর্ণাঙ্গ শুল্কযুদ্ধ শুরু করার জন্য তিনি তৈরি হচ্ছেন। দোস্তি এবং তোষামোদ সত্ত্বেও, যদি ভারতকে ছাড় না দেওয়া হয়, তাহলে ভারত কি পারস্পরিক শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপসহ প্রতিশোধ নেবে?
এখনকার কূটনীতির কেন্দ্রে নীতিভিত্তিক ‘এনগেজমেন্ট অ্যান্ড নেগোশিয়েশন’, সেখানে তোষামোদের কোনও ঠাঁই নেই। আমরা জানি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন, 
রীতি এবং চুক্তিগুলিকে পদদলিত করেই এগতে তৎপর। সম্ভবত ফ্রিডরিখ মের্জ (জার্মানির সম্ভাব্য নেতা) তাঁর বাস্তব ঘেঁষা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, মার্ক 
কার্নি (কানাডার প্রধানমন্ত্রী) তাঁর মাপা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এবং উরসুলা ভন ডের লেইন (ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট) ২৭টি 
দেশের সফল সমাবেশ থেকে ট্রাম্প সাহেবের ‘ওয়াইল্ড রান’ থামাতে সফলই হবেন বলে আশা 
করা যায়।
ভারতকে অবশ্যই বিচক্ষণ কণ্ঠস্বর নিয়ে দাঁড়াতে হবে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ