নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ‘চোর ধরেছে আম জনতা! এবার ভোট-চোরকে উচিত শিক্ষা দেবে সাধারণ মানুষই।’ সোমবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে ঠিক এই ভাষাতেই তোপ দেগেছে ‘ককরোচ’রা। সাফ বুঝিয়ে দিয়েছে, নিট কেলেঙ্কারিতে যেভাবে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে টেনে নামানো হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই জ্ঞানেশ কুমারকেও ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হবে। ক্ষোভ এবং অসন্তোষের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় সোমবার জ্ঞানেশ কুমারের আগ্রার বাড়িতে প্রধান ফটকে কালি দিয়ে ‘জ্ঞানেশ গদ্দার’ এবং ‘ভোট-চোর’ লিখে দিয়েছে যুব কংগ্রেস কর্মীরা। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে হাত শিবিরের পক্ষ থেকে লেখা হয়েছে, ‘জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোদি, শাহ গত কয়েক বছরে একাধিক নির্বাচনে ভোট লুঠ করেছেন। যা দেশদ্রোহের সামিল। আমরা নিশ্চিত করব জ্ঞানেশ যেন শাস্তি পান।’ কংগ্রেসের তরফে এদিন পশ্চিমবঙ্গ সহ মোট ১৫টি রাজ্যে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছে। বিহারের পাটনায় বাম ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভে চলেছে জলকামান। এসব নিয়ে ডামাডোলের মধ্যেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রধান অভিজিৎ দিপকে ফের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। আর নিছক কোনো সাধারণ ধরনা অবস্থান করা হবে না। আগামী ২ অক্টোবর, গান্ধীজয়ন্তীতে মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে জেল ভরো আন্দোলনই হবে।’ এমনকি ‘জ্ঞানু’ নাম দিয়ে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে জ্ঞানেশকে।
এসআইআর বিতর্কে নাম জড়িয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের। তাঁর বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগই হল, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি এবং মতামতের তোয়াক্কা না করে একতরফা বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধাম্ত নিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মও মানা হয়নি। এরপরেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ‘ভোট চুরি’তে সাহায্য করার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। প্রতিবাদে যোগ দিয়েছে নাগরিক সমাজের বড়ো অংশও। বিতর্কের রেশ কমে যাওয়ার লক্ষণমাত্র দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অধিকাংশ অভিযোগ নিয়ে সাফাই দেওয়া হয়েছে ঠিকই। জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের বৈঠকের ছবি দিয়েও জারি করা হয়েছে প্রেস বিবৃতি। কিন্তু সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত এব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি জ্ঞানেশ কুমার স্বয়ং। তাঁর এহেন আচরণ ক্ষোভের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে যথেষ্টই। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এদিন দিল্লিতে এসআইআরের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া বস্তিবাসীদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে এক্স হ্যান্ডলে তিনি সাফ লিখেছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার তো সরবেনই, কিন্তু যে সিস্টেম ওঁকে দিয়ে এসব করিয়েছে, তারও হিসাব হবে!’
সব মিলিয়ে ক্রমেই অস্বস্তি বাড়ছে মোদি প্রশাসনের। নিট ইস্যুতে দিল্লির যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ’দের যে আন্দোলন হয়েছিল, তা শুরু থেকে শান্তিপূর্ণই ছিল। পরে আন্দোলনকারীদের সংসদ ভবন অভিযানকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এবং মোদি সরকার ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আওতাধীন দিল্লি পুলিশের ‘দমনপীড়নমূলক’ আচরণের জন্য কাঠগড়ায় উঠতে হয় কেন্দ্রকেই। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। আগামী ২ অক্টোবর ‘ককরোচ’দের জেল ভরো আন্দোলন গোড়া থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। গান্ধীজয়ন্তীতে বিকাল ৪টের সময় মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে মূলত আইন অমান্য করতেই মাঠে নামবে জেন জি। ফলে তা শান্তিপূর্ণ থাকবে এমন ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই—এমনই মনে করছে পুলিশ-প্রশাসন। তবে শুধু মুম্বই নয়, ওইদিন দিল্লি সহ দেশের অন্যত্রও জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে পথে নামবে ‘ককরোচ’রা। সর্বত্র পরিস্থিতি ব্যাপক উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। মুখ পুড়তে পারে ডবল ইঞ্জিন সরকারের। তাই কোণঠাসা বিজেপি মরিয়া হয়ে মুখরক্ষার উপায় খুঁজছে। গেরুয়া শিবিরের তরফে তীব্র আক্রমণ করা হচ্ছে ‘ককরোচ’দের। সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কার অবশ্য সাফ জবাব, ‘জ্ঞানেশ কুমারকে কেন বাঁচাতে চাইছে বিজেপি? সেরকম হলে ওঁকে রাজ্যসভার টিকিট দিয়ে দিন!’